Home / উপ-সম্পাদকীয় / ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গ্লোবাল রিফিউজি ক্রাইসিস

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গ্লোবাল রিফিউজি ক্রাইসিস

ছবি : ইন্টারনেট

রায়হান আহমেদ তপাদার :

বর্তমান সময়ে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের কারণে দেশটি থেকে ১০ লাখ মানুষ পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ এসব তথ্য জানিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। তাঁর এই নির্দেশের পরই ইউক্রেনে তিন দিক থেকে হামলা শুরু করে রুশ বাহিনী।রুশ হামলার মাত্র কয়েক দিনে ইউক্রেন থেকে ১০ লাখ মানুষ পালাতে বাধ্য হলো। এর আগে বিশ্বে ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটে ১৩ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেনে চলমান সংঘাতের মাত্র এক সপ্তাহে দেশটি থেকে শরণার্থী হওয়া মানুষের সংখ্যা ২০১৫ সালের সংকটকে প্রায় ছাড়িয়ে গেছে। ইউক্রেনে রুশ হামলার ফলে সৃষ্ট শরণার্থী সংকট নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি।টুইটারে দেওয়া বিবৃতিতে ফিলিপ্পো গ্রান্ডি ইউক্রেনে থাকা লাখো মানুষকে যাতে জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা প্রদান করা যায়, সে জন্য গোলাগুলি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার আশঙ্কা, এই সংঘাত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে আর তাদের ত্রাণের প্রয়োজন হবে। হামলার সপ্তম দিনে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খারকিভ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মারিওপোল, উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভ শহরে বিমান ও গোলা হামলা বাড়িয়ে দেয় রাশিয়া। রুশ হামলায় ইউক্রেনে দুই হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দেশটির জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে সত্যি কথা হচ্ছে,জন্মভূমি ছেড়ে যেতে চান না কেউই। কিন্তু ইউক্রেনের ছবিটি সেই রকম। যুদ্ধ তাঁদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে। রুশ সেনার হামলার পর কাতারে কাতারে মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন। কেউ হেঁটে আবার কেউ গাড়িতে চেপে সীমান্তের দিকে এগিয়ে চলেছেন। উদ্দেশ্য নিরাপদ আশ্রয়। ইউক্রেনের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে তাঁরা পাড়ি দিচ্ছেন রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলিতে।

গত এক দশক ধরে শরণার্থী সঙ্কটে জর্জরিত গোটা ইউরোপ। ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়া যুদ্ধের সময় শরণার্থীদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ইউরোপের দেশগুলিতে। এখন সেই দূশ্যের পুনারাবৃত্তি দেখতে হচ্ছে ইউরোপকে। এবার ইউক্রেনের নাগরিকদের জন্য দরাজ এই দেশগুলি। কোনওরকম বাধা ছাড়াই সীমান্ত খুলে দিয়েছে তারা। ইতিমধ্যে এক লক্ষের বেশি শরণার্থী ইউক্রেন ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন দেশে। দেশ ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন লক্ষ লক্ষ ইউক্রেনীয়। তাঁদের অধিকাংশই শিশু ও মহিলা। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সংখ্যাটা ৫০ লক্ষ পেরিয়ে যাবে বলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের শরণার্থী শাখার আশঙ্কা। ইউরোপের একাধিক দেশ জানিয়েছে, ইউক্রেনের নাগরিকদের জন্য দেশের সীমান্ত খোলা হলেও, অন্যদের জন্য নয়। অর্থাৎ ইউক্রেন ছাড়া অন্য দেশের শরণার্থীদের জন্য দরজা বন্ধ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের শরণার্থী শাখার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি সীমান্ত খুলে দেওয়ার জন্য দেশগুলির সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রুশ সেনার বন্দুকের নল থেকে বাঁচাতে যাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন তাঁদের স্বাগত জানিয়েছে পোল্যান্ডের সরকার। পোল্যান্ডে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি শরণার্থী পৌঁছে গিয়েছে। হাঙ্গেরিও তাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছে। অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার কার্ল নেহমার বলেন, ইউক্রেনের সঙ্কটে আমরা সেদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দেব। এর আগে আফগানিস্তান সঙ্কটের সময় সেদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে চাননি তিনি। নেহমার বলেন, আফগানিস্তান আর ইউক্রেনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। সাম্প্রতিক ইতিহাস বিবেচনায় নিলে চলমান সংকটের সূত্রপাত ২০১৪ সালে। তবে এ সংকটের মূলে যেতে ফিরে তাকাতে হবে সোভিয়েত আমলে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল ইউক্রেন।

বর্তমান বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ শরণার্থী সংকটে ভুগছে। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে রাজনৈতিক, সামরিক, জাতিগত ও মতাদর্শের নানা সংকট মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে জাতি পরিচয়, বেঁচে থাকার অধিকার। ইতিমধ্যে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছে।শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছে ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ।এসব শরণার্থীর অর্ধেকেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। এখনো ১ কোটি মানুষের কোনো পরিচয় নেই। কোনো দেশই এদের নাগরিক অধিকার ও স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তারা যেন এ গ্রহের কেউ নয়! জাতি পরিচয়হারা এই মানুষরা পায় না শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার। কিন্ত এসব অধিকার আজ ক্ষমতার রাজনীতির ভয়াবহতার বেড়াজালে বন্দি।

বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক অভিযান ঘোষণার পর থেকেই আতঙ্ক বেড়েছে দেশটির নাগরিকদের মধ্যে৷ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন অনেকে৷ দেশটি থেকে আসা সম্ভাব্য শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে ইউরোপীয় কমিশন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর পাশে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে৷১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর থেকেই আফগান অঞ্চলে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে। শরণার্থীর জীবন তখন থেকেই আফগানবাসীর।এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পরই মূলত এ অঞ্চলে মার্কিন আগ্রাসন নতুন রূপ নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় আফগানিস্তানের জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ইউএনের দাবি প্রতিদিন আফগানিস্তান ছাড়ছে ১ হাজার মানুষ। ইতিমধ্যে আফগানিস্তান ছেড়ে শরণার্থীর জীবন বেছে নেওয়া মানুষের সংখ্যা ২৫ লাখ পেরিয়ে গেছে। পাকিস্তান ও ইরান আফগানিস্তানের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে।এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে উদ্বেগজনক শরণার্থী সমস্যা এটি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান চিত্র, দুর্দশা নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে এর সমাধান করা হবে তা বোঝেও যেন না বোঝার পথে হাঁটছেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। ২৫ আগস্ট থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭। জাতিসংঘের হিসাবমতে, এই সময়ের ব্যবধানে অন্তত ৪ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রকৃত চিত্র বলছে এই সংখ্যা আরও বেশি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে উদ্বেগজনক শরণার্থী সমস্যা এটি।জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান চিত্র, দুর্দশা নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশকারী রোহিঙ্গারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারের রাখাইনে বসবাস করে আসছে। কিন্তু তাদের মিলত না কোনো নাগরিক অধিকার ও সেবা। সম্প্রতি কয়েকটি পুলিশ চৌকিতে কিছু দুর্বৃত্তের হামলার ঘটনার পর মিয়ানমার সামরিক জান্তা নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা করে, গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। জাতিগত এই নিধন ও অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করে। কিন্ত তার সমাধান হতে না হতেই ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর পালাতে শুরু করেছে স্থানীয়রা। বেশিরভাগই ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলে গেছে। কেউ কেউ সীমান্তবর্তী পোল্যান্ডসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার এক মুখপাত্র জানান, কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তার নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে লাখ লাখ শরণার্থীর ঢল নামবে পার্শ্ববর্তী ইউরোপীয় দেশগুলোয়। প্রতিবেশী দেশের সরকার ও ত্রাণ সংস্থাগুলোও শরণার্থী ঢল সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ইউক্রেনের  প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করে বলেছিলেন, রুশ আগ্রাসন শুরু হলে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালাতে পারে। মার্কিন সাময়িকী টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি আশঙ্কার কাছাকছি সংখ্যক মানুষও বাস্তুচ্যুত হয় তাও সেটা ২০১৫-১৬ ইউরোপীয় শরণার্থী সঙ্কটের চেয়েও বড় আকার ধারণ করবে।

আধুনিক দুনিয়ার  রাজনীতি, সন্ত্রাসবাদের হুমকি এসব নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। কিন্তু এ সাধারণ, দরিদ্র মানুষগুলোকে বেছে নিতে হয়েছে শরণার্থীর করুণ জীবন। আফ্রিকার লেক চাঁদ বেসিন অঞ্চল থেকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তা ২৬ লাখ ছুঁয়ে যায়। ক্যামেরুন, চাঁদ, নাইজার ও নাইজেরিয়ার এ শরণার্থীদের অবস্থা করুণ। খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার সংকট এখানে মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। অর্ধ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে। ৬০ লাখ মানুষ রয়েছে ভয়াবহ খাদ্য ঝুঁকিতে। বিশ্বের ধনী দেশগুলোর কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েও সমস্যা আশানুরূপ সমাধান ঘটেনি এ অঞ্চলে। বরং শরণার্থীদের সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী সংগঠন বোকো হারামের হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট প্রবল আকার ধারণ করে ২০০৯ সালে। তখন থেকেই আফ্রিকার লেক বেসিন অঞ্চলের মানুষ ঘর ও দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করে। জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়লেও খাদ্য ও পানি সংকটে পড়ে। বোকো হারাম এ অঞ্চলে শরণার্থীদের দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করে। শুধু তাই নয়, অনেককেই তারা সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দিতে বাধ্য করে। সাব-সাহারা আফ্রিকান অঞ্চলের যে পরিমাণ শরণার্থী রয়েছে তা গোটা বিশ্বের শরণার্থীদের ২৬ শতাংশ।ইউএনএইচসিআর-এর মতে এ অঞ্চলের অন্তত ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ শরণার্থী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংকট অত্যন্ত প্রকট হচ্ছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকা, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ সুদানসহ আশেপাশের দেশগুলো এরই মধ্যে শরণার্থী সংকটে নাকাল হয়ে পড়েছে। বুরুন্দি ও ইয়েমেনে শরণার্থী সংকট দেখা দেওয়া, জাতি বিরোধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আফ্রিকায় শরণার্থী সমস্যা নতুন রূপ পেয়েছে। এক লাখ মানুষ না খেয়ে আছে। আরও ৫০ লাখ মানুষ রয়েছে ভয়াবহ খাদ্য সংকটে। এই হলো দক্ষিণ সুদানের শরণার্থীদের চিত্র। তাদের দুর্দশা, কষ্ট দেখে অনেকেই বলেন, দুনিয়া হয়তো তাদের ভুলেই গেছে! গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বন্যা তাদের জীবনে যোগ করেছে চূড়ান্ত সংকট। তাদের স্যানিটেশন, চিকিৎসা, খাবার পানি, বাসস্থান কিছুই নেই। জাতিগত বিরোধ, দরিদ্রতা আর প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেন তাদের নিয়তি। আধুনিক বিশ্বের মানচিত্রে যেন তাদের ঠাঁই নেই।

দুই হাজার তের সালের ডিসেম্বর থেকে দক্ষিণ সুদান ছেড়ে আসে ৪০ লাখ মানুষ। তাদের এখন কোনো ঘর নেই, খাবার নেই। ২০ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। প্রাণে বেঁচে গেলেও চিকিৎসা ও খাদ্য সংকটে তারা মৃত্যুর প্রহর গুনছে।অপরদিকে নাটকীয় ভাবে সিরিয়া সংকটের শুরু হয়। দুই হাজার এগার সালে মার্চ থেকেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে সিরিয়ায় মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। সে বছরই প্রায় ১০ লাখ মানুষ সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যান পার্শ্ববর্তী দেশে। পরের ছয় মাসে আরও ১০ লাখ মানুষ শরণার্থীর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়। এরপর ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। সিরিয়া সংকটের সমাধান হয়নি। এরই মধ্যে সিরিয়া ছেড়েছে ৫৫ লাখ মানুষ। সিরিয়া শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে তুরস্ক। ইতিমধ্যে তুরস্কে ২৫ লাখ সিরিয়ান শরণার্থী আশ্রয় পেয়েছে। সিরিয়ান শরণার্থীরা সারা বিশ্বে আশ্রয় নিয়েছে। নিবন্ধনকৃত সিরিয়ান শরণার্থীরা তুরস্ক, লেবানন, জর্ডান, জার্মানি, সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, ইজিপ্ট, সুইডেন, হাঙ্গেরী, কানাডা, ক্রোয়েশিয়া, গ্রিস, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া, সিঙ্গাপুরসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থী ছড়িয়ে পড়ার এমন ঘটনা ইতিহাসে এত বড় পরিসরে আর ঘটেনি। এছাড়া প্রথম দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এত মানুষকে দেশ ছেড়ে শরণার্থীর জীবন বেছে নিতেও হয়নি। বর্তমান বিশ্বের শরণার্থীর সমস্যার সবচেয়ে দুঃখজনক চিত্র এটি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ফলে এই শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো যে  অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা করছে তা খুব সামান্য। যে কারণে সিরিয়ান শরণার্থীদের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিকভাবেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে সিরিয়ান শরণার্থীরা। সিরিয়ার শরণার্থীদের শিশু ও নারীরা পড়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ সিরিয়া শরণার্থীদের জন্য মানবতার হাত বাড়িয়ে দিলেও আর্থিকভাবে সচ্ছল, উন্নত ও সামরিক শক্তিধর দেশগুলো সিরিয়া শরণার্থীদের ব্যাপারে নিয়েছে কৌশলী ভূমিকা। তাদের আশ্রয় দিতে চাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রসহ মানবতার বুলি আওড়ানো বেশির ভাগ দেশের রাষ্ট্রনেতারা।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট ।

Check Also

স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে জনজীবন সচল রাখতে হবে

ড. মোহা. হাছানাত আলী দেশে এই মুহূর্তে করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা। ঢাকায় আক্রান্ত্রের হার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x