Saturday , August 13 2022
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / জন্ম নিবন্ধনের ভুল সংশোধনে ভোগান্তি চরমে

জন্ম নিবন্ধনের ভুল সংশোধনে ভোগান্তি চরমে

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :    মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর এলাকার বাসিন্দা শাহ আলম। তার ভাতিজা মাহমুদুল হাসানের জন্ম নিবন্ধনের সময় ভুল হয়েছে তারিখে। সেটি সংশোধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, ইউএনও অফিস ঘুরে আসতে হয়েছে ঢাকার রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে। তবে তাতেও কোনো সুরাহা হয়নি। অনেক চেষ্টার পর সংশোধনের পরিবর্তে ভুল জন্ম নিবন্ধন দিয়েই কাজ চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয় তাদের। অবেশেষে নিরাশ হয়েই বাড়ি ফেরেন তিনি।

সংশোধনে জটিলতার কারণে মাহমুদুলের জন্মের তারিখই পরিবর্তন হয়ে গেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহ আলম বলেন, নিবন্ধনে আমার ভাতিজা মাহমুদুল হাসানের জন্ম তারিখ ভুল ছিল। তার জন্ম ছিল ২০১৫ সালের ২৪ জুলাই। কিন্তু নিবন্ধনে হয়ে গেছে ২৮ জুলাই। এই ভুলটি সংশোধন করতে চেয়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সেটি পারিনি। উল্টো তারা জানিয়েছেন, জন্ম নিবন্ধনের সার্ভার পুরোটাই লক, এর সংশোধন হবে না। যা আছে তাতেই চালিয়ে নিতে হবে।

ভোগান্তি নিয়ে শাহ আলম বলেন, প্রথমে আমি ইউনিয়ন পরিষদে গেছি। পরে তারা ইউএনও অফিসে পাঠায়। সেখানেও সমাধান না পেয়ে পরিবহন পুল ভবনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে যাই। সেখানেও সমাধান পাইনি। এ কারণে আমার ভাতিজার জন্ম তারিখই পরিবর্তন হয়ে গেল। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় বললো, ২৪ আর ২৮ তারিখের ব্যবধান খুব বেশি নয়। এখানে তাদের করণীয় কিছু নেই বলেই সান্ত্বনা দিয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষের এখানে কিছু করণীয় নেই। এখানে উপরের যারা আছেন তারা হয়তো একটি প্রক্রিয়া বের করে আনলে মানুষের সুবিধা হবে। আমার ভাতিজাকে ভুল জন্ম তারিখের জন্ম নিবন্ধন দিয়েই স্কুলে ভর্তি করাতে হয়েছে।

জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত এমন সমস্যা এখন প্রতিটি পর্যায়ে। ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন এখন অনেকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানান জটিলতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুরেও সমাধান মিলছে না অনেকের। এর সঙ্গে কর্তাদের গাফিলতি নিয়মিত ঘটনা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, জন্ম নিবন্ধনের মতো প্রয়োজনীয় একটি বিষয়ে এত জটিলতা রাখা বাস্তব সম্মত নয়। সাধারণ মানুষের জন্য সহজ পদ্ধতি হলে এ ধরনের ভোগান্তি হতো না বলে মনে করছেন তারা।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০১ সালের পর যাদের জন্ম, তাদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য বাবা-মায়ের জন্ম সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায় সন্তানের জন্ম সনদ নিতে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অভিভাবকদের। একই সঙ্গে কারো মৃত্যু সনদ নিতে হলেও প্রয়োজন হচ্ছে ডিজিটাল জন্ম সনদের। সব মিলিয়ে চরম জটিলতায় পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নাগরিকদের ১৮টি সেবা পেতে জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং চারটি সেবা পেতে মৃত্যু নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন হয়। ২০০৭ সালে ভোটার তালিকা তৈরির কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০১-২০০৬ সালে ২৮টি জেলায় ও চারটি সিটি করপোরেশনে জন্ম নিবন্ধনের কাজ শুরু হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সনদ দেওয়ার জন্য অফিস ও জনবল সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। নতুন করে কিছু অঞ্চল যুক্ত হওয়ায় এক অঞ্চলের অফিসেই তিন অঞ্চলের সেবাগ্রহীতাদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে এক অঞ্চলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন অঞ্চলের নাগরিকদের সেবা দিতে হচ্ছে, যা খুবই কষ্টসাধ্য।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৮ এর কার্যালয়ে ৬২ থেকে ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের সব এলাকার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্ম নিবন্ধন সনদের জন্য সেখানে এসেছেন ধলপুর বাঁশপট্টির বাসিন্দা মিনারা বেগম। তবে কর্তারা জানালেন, স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা এলাকার চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট ছাড়া জন্ম নিবন্ধন হবে না।

দীর্ঘদিন ঢাকায় বাস করা মিনারা বেগমের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর। ঢাকায় কোনো বাড়িঘর নেই। আবার তিনি গ্রামেও যান না। এ কারণে কোথাও সার্টিফিকেট পাচ্ছেন না তিনি। এরপর নানাভাবে কর্তাদের আকুতি শুরু করেন মিনারা। কিন্তু উল্টো একজন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে নিজের বোনের জন্ম নিবন্ধন তৈরিতে এমন সমস্যা হয়েছে বলে জানান। সংশোধনে ব্যাপক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলেও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা।

মিনারা বেগম বলেন, আমি ভোটার হয়েছি নারকেল বাগান মসজিদ এলাকা থেকে। ভোটার আইডিসহ সবকিছুই সেখান থেকে হয়েছে। আমাদের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈরে। তবে সেখানে বাড়িঘর, সহায় সম্পত্তি কিছু নেই। সেখানে আমরা বসবাসও করি না। আমার সন্তানদের সবার জন্ম ঢাকায়। ভোটার আইডি এই ঠিকানা দিয়ে করেছি। সবকিছু নিয়ে এসেছি। ঢাকায় বলে গ্রামের চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট লাগবে। আমি বললাম আমি তো ওখানে থাকি না, যাই না। সেখানকার চেয়ারম্যানও পরিচিত না। কাউন্সিলর অফিসেও বলছে যে গ্রামের ঠিকানার সার্টিফিকেট আনতে। আমরা এখানকার নাগরিক, আমরা ঢাকার ভোটার। এখন ঢাকায় তো বাড়িও নেই। গ্রামে বা ঢাকায় কোথাও বাড়ি নেই বলে আমার জন্ম নিবন্ধনের কাজটি হচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাঝহারুল ইসলাম কাকন বলেন, আমি আমার এবং আব্বু-আম্মুর জন্ম নিবন্ধন করতে আসছি। কিন্তু আমার মায়ের আবেদন নিয়ে সমস্যা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস থেকে দেওয়া সার্টিফিকেটে আমার মায়ের নামের সঙ্গে নানার নাম যোগ করা, আব্বুর নাম নেই। সেটি আবার লিখে আনতে বলছে। এটা তো সমন্বয়হীনতা। তারা তো জানে যে আম্মুর সার্টিফিকেটে তার স্বামীর নাম উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু তারা সেটা করে দেয়নি। জন্ম নিবন্ধনের কাজটা আরও সহজ করা উচিত। আর কাউন্সিলর অফিসে দেখলাম অনেকের ঢাকায় বাড়ি নেই, আবার গ্রামেও বাড়ি নেই। তাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে জন্ম নিবন্ধনে ব্যর্থ হলে অনেকেই শরণাপন্ন হন রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের। তবে সেখানে লোকবল সঙ্কটসহ নানা কারণে সঠিক সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ অনেকের।

নিবন্ধন অফিসের ভুলক্রমে নুসাইবা জামান দিয়ানাহ’র জন্ম নিবন্ধন দুবার এন্ট্রি হয়েছে সার্ভারে। ফলে তার জন্ম নিবন্ধনের নম্বর দিয়ে সার্ভারে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে দিয়ানাহ’র বাবা মনিরুজ্জামান কাউন্সিলর অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টার পর যোগাযোগ করেন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে।

সেখানকার পরামর্শ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দুটি নিবন্ধনের কোনটি বাদ দিতে চান সেটি সংযুক্ত করে অনুমতিপত্র নিয়ে আসা হলেও সেখানে সমস্যার কথা জানায় রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। এরপর তাদের পরামর্শে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পুনরায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি জন্ম নিবন্ধন বাদ দেওয়ার অনুমতিপত্রসহ জমা দেওয়া হয়। তবে দুই মাস হয়ে গেলেও সমাধান দেননি তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. ফরহাদ হোসেন জানান, আমার কাজ ফাইল উঠিয়ে অ্যাপ্রুভ হলে টেকনিক্যাল টিমের কাছে পাঠানো। কিন্তু ফাইল তুলতে আমার কিছু প্রিপারেশন আছে। সেটা তো ডিসি অফিস থেকে আমাদের কাছে চিঠিতে প্রোপারলি উল্লেখ করে দিতে হবে যে, এই ব্যক্তির এই তথ্য থাকবে এবং এটা বাতিল হবে। কিন্তু ডিসি অফিস একটা জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে বলছে তার একটা থাকবে একটা বাতিল হবে। যেহেতু তার একটিই নিবন্ধন নম্বর, সুতরাং যদি সেটা উল্লেখ করে না দেয় কোনটা থাকবে, তাহলে কিভাবে বুঝবো? তাদের আমরা ছক করে চিঠি দিয়েছি। যাতে সেভাবে উল্লেখ করে দেয়।

নিবন্ধন সংক্রান্ত জটিলতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, যে জন্ম নিবন্ধন যেখানে করেছে সংশোধন যদি করতে হয়, সেখানে আবেদন করে। সেখানে সমস্যা হলে পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে সংশোধনী হয়। এটা অনলাইনে এখানে করতে হবে, তারপর পাঠাতে হবে। যেহেতু ভুল হয়েছে সংশোধনের প্রক্রিয়া তো এভাবেই হবে।

তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধন নতুন করে করতে চাইলে তার বাসস্থান যেখানে হোক, উনি যেখানে বসবাস করছেন সে এলাকায় নিবন্ধনের আবেদন করতে পারেন, সমস্যা নেই।

নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, এখন সব চাপ এক সঙ্গে। ১ লাখ মানুষ যদি আমাদের সফটওয়্যারে ঢোকে তাহলে বুঝুন আমাদের চাপ কেমন আছে। আর সংশোধনের ক্ষেত্রেও এখন আমাদের প্রতিটি জায়গায় প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার আবেদন আসছে। কিন্তু সারাদিন মনোযোগ দিয়ে করলেও ৩শ’র বেশি করা যায় না। আমাদের অন্য কাজও আছে, পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে শেয়ার করেও করা সম্ভব না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের (রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়) লোকবল নাই-ই। এখানে খুব বেশি কাজ নেই। এখানে কাজ হলো যেখানে আমার অনুমোদন লাগে সেখানে কাজ করা এবং সফটওয়্যারটা রেডি রাখা। তবে খুবই খারাপ অবস্থা, এখানে মাত্র দুজন টেকনিক্যাল ম্যান ছিলে। তার মধ্যে সহকারী প্রোগ্রামার চাকরি ছেড়েছে আর প্রোগ্রামার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছে। তবে ছুটিতে থাকার পরও তিনি পুরো কাজটাই করছেন। আমাদের কিছু কনসালটেন্ট আছে তারা ফুল সাপোর্ট দিচ্ছেন, সেকারণে আমরা টিকিয়ে রাখতে পারছি।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, নরমাল জন্ম নিবন্ধন যারা করেন তারা পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হয় যখন তারা আবার কারেকশন করতে যান। আমাদের দেশের ম্যাক্সিমাম জন্ম নিবন্ধন কারেকশন করতে যান জালিয়াতির উদ্দেশ্যে। তখন সেটার ব্যাপারে আমাদের একটা রেস্ট্রিকশন থাকে, সার্ভার সেগুলো অ্যালাও করে না। দেখা যায় এখন বয়স আপনার যেটা আছে সেটা একটু কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিতে চান। তখন এসব সমস্যা দেখা যায়। একজন লোকের বয়স ৮৫ বছর হলেও জন্মনিবন্ধন করতে চায়, দেখা যায় তার এসএসসির সনদ বা কিছুই নেই, তখন সমস্যাগুলো দেখা দেয়।

সমন্বয়হীনতার কারণেও মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নির্বাচন কমিশনে দুই বছর চাকরি করেছি। ওখানে ফর্মে আপনি আপনার নাম লিখছেন, জন্ম তারিখ লিখছেন, মা-বাবার নাম লিখছেন। সেভাবে সেগুলো প্রিন্ট করে দিয়ে দেওয়া হয়। সেটি জমা দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করলেন। দেখা গেলো পাঁচ বছর পর আপনি এসে বলছেন আমার নাম চেঞ্জ করতে হবে, ডেট অব বার্থ চেঞ্জ করতে হবে। কিন্তু এটি করার সময় কিন্তু একটি কারেকশন কপি দেখানোও হয়, সেখানে যিনি জন্ম নিবন্ধন করবেন তিনি নিশ্চিত করলেই প্রিন্ট করে দেয়া হয়। তাহলে দোষ কার?

জালিয়াতির বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনে আমি অসংখ্য পিএইচডি করা মানুষকে দেখেছি যে তিনি এফিডেভিট করে বলছে আমি এসএসসি পাস করিনি, শুধু বয়স বাড়ানো বা কমানোর জন্য। হয়ত সে বিদেশ যাবে বা অন্য কোনো কাজ করবে। এরকম অসংখ্য মানুষকে দেখেছি। নরমালি হলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।

Check Also

ল্যাট্রিন ভাগাভাগি করে ৬১% পরিবার, খোলা মাঠ ব্যবহার ০.২৭%

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :    নগরাঞ্চলের প্রায় ৬১ শতাংশ খানা (পরিবার) অন্য পরিবারের সঙ্গে তাদের ল্যাট্রিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x