Wednesday , August 17 2022
Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / রাজনৈতিক, মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্ব

রাজনৈতিক, মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্ব

রায়হান আহমেদ তপাদার

দুই হাজার বিশ সালের প্রথমার্ধে কোভিড-১৯ মহামারীর বিশ্বব্যাপী বিস্তারের ফলে যে শকের সৃষ্টি হয়েছিল, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সেটি বহুলাংশেই স্তিমিত হয়ে আসে। কার্যত দুই হাজার বিশ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন অনেক জটিল অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে, এবং এর ফলে বর্তমান বিশ্ব জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা হয়েছিল ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত, যাকে মহামন্দা বলে। এ ছাড়া তেলের দাম নিয়ে সৃষ্ট মন্দা, এশিয়ার ঋণসংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র প্রভাব ফেলে। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহায়ণ খাতের পতন থেকেই শুরু হয়েছিল ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকট। ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী সেই অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থবাজারে। দেউলিয়া হয় অসংখ্য কোম্পানি। সেই সংকট থেকে উত্তরণ হওয়ার যুগ পার না হতেই আরেকটি বড় সংকটে বিশ্ব।

প্রাণহানির বিষয়টি ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটে প্রাসঙ্গিক ছিল না। সেই সঙ্গে ঘরবন্দী হওয়ার ব্যাপারও ছিল না। তাই বলা যায়, অতীতের সব সংকটের চেয়ে করোনা মহামারির কারণে যে সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে, তা একেবারেই ভিন্ন। সাধারণ সময়ে একটি দেশের অর্থনীতি বাড়তে থাকে। এর নাগরিকের, দেশের উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার মূল্য অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও কিছুটা বাড়ে। তবে কোনো কোনো সময় উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্য কমেও যায়। একটি অর্থবছরের পরপর কয়েকটি প্রান্তিকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সূচক যদি নি¤œমুখী হয়, তবেই মূলত মন্দার লক্ষণ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), শিল্প উৎপাদন, চাকরির বাজারসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক সম্প্রসারণের বদলে সংকোচনের লক্ষণ দেখা দিলেই শঙ্কাটি তৈরি হয়।গত ১২ বছরে সবচেয়ে বড় মন্দায় পড়েছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি। দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে।

বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ২০ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে অর্থনীতি। এছাড়াও দোকান বন্ধ থাকায় গৃহস্থালি ব্যয় হ্রাস পেয়েছে, কারখানা ও নির্মাণকাজও কমে গেছে, যা যুক্তরাজ্যকে ২০০৯ সালের পর প্রথম কৌশলগত মন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কৌশলগত মন্দার অর্থ হচ্ছে, পরপর দুই প্রান্তিকে অর্থনৈতিক সংকোচন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মন্দার সূচনা ফেব্রুয়ারি থেকে। প্রথম প্রান্তিকে মার্কিন জিডিপির পতন হয় ৫ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় প্রান্তিকে পতন হয় ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। সেই সঙ্গে এখনো মার্কিন বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ২ শতাংশ, যা মহামন্দা-পরবর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। করোনার কারণে অর্থনৈতিক দুর্দশা রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে জাপানে। বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গত বছরের তুলনায় বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ এই অর্থনীতির মোট দেশজ উৎপাদন কমেছে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থনৈতিক এই দুর্দশার অন্যতম কারণ হলো ভোক্তা ব্যয় ব্যাপক কমে যাওয়া। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য মহামারির কবলে পড়ায় দেশটির রপ্তানিও অত্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

টানা তিন প্রান্তিকে সংকোচন হয়েছে অর্থনীতিটির, যা কিনা ১৯৫৫ সালের পর থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থান। করোনার কারণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সবশেষ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, যেমনটি ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় যাচ্ছে এই ব্লকের অর্থনৈতিক অবস্থা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফ্রান্সের জিডিপি কমেছে ১৩ দশমিক ৮, ইতালির ১২ দশমিক ৪ এবং জার্মানির ১০ দশমিক ১ শতাংশ। আমাদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কোনটি? এমন প্রশ্নে অনেকে অনেক রকমের জবাব দেয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তব সত্য হচ্ছে-নির্মল বায়ু, বিশুদ্ধ পানি এবং উর্বর মাটি এবং সবুজ ভূমি। তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতাপে এসব অমূল্য-মহামূল্য সম্পদগুলো আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এবারের করোনাভাইরাস মহামারীতে বিশ্বের শতকোটি মানুষ আবারো উপলব্ধি করেছে, প্রতিদিন আমরা বিনামূল্যে নি:শ্বাসের সাথে যে অক্সিজেন গ্রহণ করছি তা কত অমূল্য, বেঁচে থাকার জন্য কত অপরিহার্য! অথচ আমাদেরকে ভোগবাদের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা য় ফেলে বাতাসে অক্সিজেনের মধ্যে নানা রকম বিষাক্ত অপদ্রব্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

এ কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণ, মাটি ও পরিবেশ দূষণের শিকার সমগ্র মানব সম্প্রদায়। ভূমির উর্বরা শক্তি কমে যাওয়ায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য বাড়তি খাদ্যের চাহিদা মেটাতে বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থাকে নতুন নতুন জৈব প্রযুক্তি, রাসায়নিক যৌগ, পেট্টোকেমি- ক্যাল এবং যান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বান্ধব কৃষি পদ্ধতি ও কৃষিবীজগুলোকে কৃষকের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে কর্পোরেট এগ্রো কোম্পানির জিএমও বীজ এবং পেট্টোকেমিক্যালের উপর নির্ভরশীল করে তোলার মধ্য দিয়ে বিশ্বের কৃষিব্যবস্থা ও খাদ্য নিরাপত্তার উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ছক সক্রিয় আছে গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই। পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে দেশে ফসলহানি ও খাদ্যাভাবের সংকটকে কাজে লাগিয়ে তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের শ্লোগান তুলে এশিয়া ও আফ্রিকার অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ছত্রাক নাশক, আগাছানাশক, ভূ-গর্ভস্থ পানি নির্ভর যান্ত্রিক সেচব্যবস্থায় প্রচুর ফসিল জ্বালানি খরচ করে অতিরিক্ত যে ফসল উৎপাদিত হয়, তাতে কৃষকের খরচ উঠেনা। বাম্পার ফলনের পরও কৃষকের মুখে সেই হাসি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

বায়ুতে ছেড়ে দেয়া ফসিল জ্বালানির দূষিত ধোঁয়া, মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়া নানা রকম বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে জনস্বাস্থ্যে বিপর্যয় সৃষ্টির পাশাপাশি কৃষিজমি স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা হারিয়েছে। খাদ্যের সাধারণ স্বাদ, পুষ্টি ও গুণাগুণের মধ্যেও ভেজাল ঢুকে গেছে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার পরিবেশবান্ধব সম্ভাব্য বিকল্প উদ্যোগগুলোকে পাশকাটিয়ে রাতারাতি কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর নামে গত ৫-৬ দশকে মনসান্টো, সিনজেন্টা, কারগিল, বায়ারের মত পেট্টোকেমিক্যাল কোম্পানী এখন বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থার বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি হচ্ছে ফসিল জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, কৃষিব্যবস্থা, শিল্পায়ণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বনভূমি, পাহাড়, নদী সংরক্ষণ ও নগরায়ণের পরিবেশগত বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করা।

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বিশ্বের উষ্ণায়ন ও ক্লাইমেট চেঞ্জের বিপদ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সতর্ক সঙ্কেত দিলেও ধনী দেশগুলোর বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতার কারণে জাতিসংঘের মত বিশ্ব সংস্থা তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে কপ-২৬ বা বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ২৬তম আসর বসেছিল। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্টের কারণগুলো নিয়ন্ত্রণসহ বিশেষত ফসিল জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমিয়ে আনতে ছাব্বিশ বছর ধরে পরিচালিত প্রয়াসের নাম কপ(সিওপি- কনফারেন্স অব পার্টিজ)। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ১৯৯২ সালে রিওডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত আর্থ সামিটের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে ১৯৯৫ সালে জার্মানীর বার্লিনে প্রথম পূর্নাঙ্গ জলবায়ু সম্মেলন কপ-১ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯৭ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত কিউটো সম্মেলনে গৃহীত কিউটো প্রটোকল থেকে এ পর্যন্ত ২৬টি কপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।

এর জন্য মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের মত অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোই দায়ী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কপ-২১ বা ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে এ ক্ষেত্রে একটি বড় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াশিংটনের ক্ষমতায় থাকায় কপ-২৫ পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর কিছুদিন আগে স্পেনের মাদ্রিদে কপ ২৫ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে প্রত্যাবর্তনে জো বাইডেনের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষাপটে এবারের কপ-২৬ সম্মেলন নিয়ে কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল বিশ্ব। তবে ভারতের মত দেশের একগুঁয়েমির কারণে কয়লা ভিত্তিক জ্বালানি দূষণের সাথে আপস করতে বাধ্য হয়েছেন বিশ্ব নেতারা। ভারতের আবহাওয়া বিষয়ক মন্ত্রী ভুপেন্দার যাদবের বিরোধিতার কারণে গ্লাসগো চুক্তি থেকে সবচে ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহার থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার প্রতিশ্রুতি আটকে গেছে। ভুপেন্দার যাদব যখন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে কয়লার অমিত ব্যবহারের পক্ষে তার যুক্তি তুলে ধরছেন, তখন দিল্লীর আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা।

ফসিল জ্বালানি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার ধুলিতে বাতাসে মানুষের দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। গত শতাব্দীতে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার, যুদ্ধবিমান-মারনাস্ত্রের অভাবনীয় অগ্রগতির মধ্য দিয়ে দুইটি মহাযুদ্ধ এবং দেশে দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বল্গাহীন প্রতিযোগিতা বিশ্বের মানুষকে মানবিক-আধ্যাত্মিক চেতনা থেকে বিচ্যুত করেছে। ভূ-পৃষ্ঠের গঠন প্রক্রিয়ায় ভূ-অভ্যন্তরে কোটি কোটি বছরে সঞ্চিত জীবাশ্ম জ্বালানি মানুষের সভ্যতা, প্রযুক্তি ও ভোগ বিলাসের প্রধান জ্বালানি হলেও এর অমিতব্যয়ী ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বেখবর-বেপরোয়া হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে সমগ্র মানব সভ্যতা ও প্রাণী জগৎকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় সৌর-কীরণের ওজনস্তর ক্ষয়ে গিয়ে প্রাণী-দেহের জন্য ক্ষতিকর অতি বেগুনী রশ্মি সরাসরি ভূ-পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হওয়ার কারণে মানবদেহে ক্যান্সারের মত নানাবিধ রোগব্যাধির প্রকোপ বেড়ে মানুষের মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছে। গত এক শতাব্দীতে পৃথিবীর বনজঙ্গল কমেছে অস্বাভাবিক হারে। সেই সাথে প্রাণীজগৎ থেকে হাজার হাজার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

দেশে দেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যবাহী কৃষিব্যবস্থায় যেসব ফসল ও উদ্ভিদের চাষাবাদ চলছে, সেসব বীজ নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর এক্সপেরিমেন্ট ও বাণিজ্যিকিকরণের ধারায় বিলীন হতে চলেছে। যাইহোক আগামী বছর মিশরের শার্ম আল শেখে অনুষ্ঠেয় ২৭ তম কপ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তরফে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রত্যাশা রাখতে চাই। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়ার আগেই বিশ্বের শতকোটি মানুষ রাজনৈতিক- মানবিক- অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের শিকার হয়েছে।তবে সামাজিক জীবন-যাপনের তাগিদে বা নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সে বিপরীতমুখী আচরণও করে। নিজেকে ক্ষমতাবান হিসেবে প্রকাশ করার লিপ্সায় মত্ত হয়। তখন উপকারের রূপ বদলে গিয়ে তা স্বার্থসিদ্ধির পন্থায় পরিণত হয়ে যায়। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রতিযোগিতার যুগে মানুষ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্বভাবে প্রত্যেক মানুষ বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা, যান্ত্রিকতার যুগে লোকেরা ইসলামের মর্মবাণী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ব্যস্ত নগরের মানুষেরা কেউ যেন কারও নয়, কেউ কাউকে চেনে না, সালাম বিনিময়ের প্রয়োজন মনে করে না। পারস্পরিক শান্তি কামনা তো দূরের কথা, কারও বিপদ-আপদেও কেউ ফিরে তাকায় না, হায় রে মানুষ! আমরা যে সমাজে বাস করি, সে সমাজে মানুষে মানুষে বিশ্বাস, আস্থা, প্রেম-প্রীতি, ত্যাগ- তিতিক্ষা, সৌহাদ্র্য-সম্প্রীতি বুঝিবা মেঘলোকে উধাও হয়ে গেছে! সবাই যেন ভুলতে বসেছে, মানুষ মানুষের জন্য! মানুষ মানুষেরই স্বজন! মানুষে মানুষে সৌহাদ্র্য-সম্প্রীতি আর জাতীয় ঐক্য-মৈত্রীর সেতুবন্ধ গড়ার প্রত্যাশায় যুগ যুগ ধরে শুভবুদ্ধি সম্পন্নদের অব্যাহত প্রচেষ্টার কাক্সিক্ষত সুফল আজও মেলেনি। সভ্যতার বিকশিত সময় ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগেও মনুষ্য সমাজে সহিংসতা, রক্তপাত, হানাহানি, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা আর উন্মাদনার যে চিত্র প্রায় নিত্য ফুটে উঠছে, এতে মানবতা আজ বিপন্ন।

পৃথিবীতে মানুষের যা কিছু উদ্যোগ-উদ্যম, সবকিছুই শান্তিতে বেঁচে থাকার লক্ষ্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পৃথিবী সুখময় না দুঃখময় এ নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত যে বিশ্বে নিরাপদে বেঁচে থাকার সাধনাতেই মানুষ নিজেকে ব্যাপৃত রাখে।জানমালের নিরাপত্তা সহকারে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার দুর্নিবার আকাক্সক্ষা মানুষের মধ্যে থাকাটাই স্বাভাবিক। শান্তির পূর্বশর্ত সৌহাদ্র্য-সম্প্রীতি ও ঐক্য-মৈত্রী মানবতার সৌন্দর্য। অথচ শান্তি শব্দটি যত সহজে উচ্চারণ করা যায়, বাস্তবে এর প্রতিষ্ঠা শত-সহস্র গুণ কঠিন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

Check Also

নৈতিক অবক্ষয় থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে

রায়হান আহমেদ তপাদার বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির কারণে আজ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যথেষ্ট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x