Tuesday , October 26 2021
Home / উপ-সম্পাদকীয় / কিশোর অপরাধ ও আত্মহত্যা রোধে পরিবারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে

কিশোর অপরাধ ও আত্মহত্যা রোধে পরিবারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে

আর কে চৌধুরী

অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, পশ্চিমা বিশ্বে বেশ অনেক বছর আগে যে গ্যাং কালচারের সূত্রপাত তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে নতুন এ সংস্কৃতির। এ কিশোরেরা সমাজের মধ্যে নিজেদের মতো করে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলছে। এ সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ সবকিছু আলাদা। এ সমাজের যারা সদস্য তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। পেশিশক্তি দেখিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা, দলে-বলে চলা এদের বৈশিষ্ট্য। দেশজুড়ে নগরকেন্দ্রিক গ্যাং কালচার ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। মাদক নেশায় জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা, এমনকি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বা অন্য গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে তুচ্ছ বিরোধকে কেন্দ্র করে খুনখারাবি থেকেও পিছপা হচ্ছে না কিশোর অপরাধীরা।

আরও উদ্বেগের বিষয়, মাদক নেশার টাকা জোগাড়ে ছোটখাটো অপরাধে জড়ানো বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠছে ভয়ংকর অপরাধী, এলাকার ত্রাস। এর পেছনের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক বড় ভাইদের স্বার্থের প্রশ্রয়। পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া এসব কিশোর স্কুল-কলেজের মোড়ে দলবেঁধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা থেকে মাদক সেবন, চুরি, ছিনতাই এবং খুনের মতো অপরাধও করে থাকে নির্দ্বিধায়। ছোট-বড় কাউকেই করে না সমীহ। পারিবারিক অনুশাসন না থাকায় তারা নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। পুলিশসূত্র বলছে, রাজধানীতে প্রতি মাসে হত্যার ঘটনা ঘটে গড়ে ২০টি। এর বেশির ভাগ ঘটনায় কিশোর অপরাধীরা জড়িত। সামাজিক যে অনুশাসনগুলো ছিল এগুলো সমাজে কাজ করছে না। যেমন, সমাজের ভিতর পরিবার, প্রতিবেশী, এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চা, বন্ডিং- এগুলো নষ্ট হয়ে ছন্দপতন ঘটছে। এসব কারণে কিশোর-তরুণরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিশোর অপরাধ রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।

এদিকে, করোনা মহামারীতে হঠাৎ করেই বেড়েছে আত্মহত্যা। করোনায় মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাপিয়ে গেছে আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে উঠে এসেছে এমন চিত্র। দেখা গেছে, শুধু বয়স্ক নারী-পুরুষ নয়, অল্পবয়সী এমনকি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ অতিমাত্রায় হতাশাগ্রস্ত ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ায় আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সব বয়সী মানুষের মধ্যেই বেড়েছে এর প্রবণতা। সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক কলহ, মাদক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা, পারিবারিক বন্ধন ফিকে হয়ে আসার মতো কারণগুলো প্রকট আকার ধারণ করায় মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া নৈতিক স্খলন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, ভ। ব্ল্যাকমেইলিং অনেককে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০১৪ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করে। এর বেশির ভাগ ২১ থেকে ৩০ বছরের নারী। করোনাকালে বাংলাদেশের ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ-তরুণীর মানসিক চাপ আগের চেয়ে অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ধরনের মানসিক অস্থিরতায় ভুগে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী শারীরিকভাবে নিজের ক্ষতি করছে। মানসিক বিভিন্ন চাপের ফলে অনেকের মধ্যেই আত্মহত্যা করার প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময় ৫০ দশমিক ১ শতাংশই আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশনের আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তরুণদের ভাবনা শীর্ষক নতুন এক জরিপে এমনটি উঠে এসেছে। করোনাকালে এত বেশিসংখ্যক তরুণের আত্মহত্যার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের। মূলত তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, আত্মহত্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্যই এ জরিপটি পরিচালিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ১৪ হাজার ৪৩৬ জন আত্মহত্যা করেছে। ৩২২টি আত্মহত্যার কেস স্টাডি করে দেখা যায়, যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৪৯ শতাংশেরই বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আর এদের ৫৭ শতাংশই নারী। জানা যায়, ২০২১ সালে ১ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে মোট ২০২৬ জন মানুষ অংশগ্রহণ করে। জরিপে সবচেয়ে বেশি অংশ নেয় ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী মোট ১৭২০ জন তরুণ-তরুণী, যা মোট জরিপের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। আর জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশই অবিবাহিত।

এদের মধ্যে অধিকাংশই কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও অন্যান্য পেশার মানুষের মধ্যে ৭ দশমিক ১ শতাংশ চাকরিজীবী, শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবসায়ী, বেকার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাসহ অন্য পেশাজীবী ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্যে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশের মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে কিন্তু তারা তা চেষ্টা করেনি। ৮ দশমিক ৩ শতাংশ আত্মহত্যার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম প্রস্তুত করলেও তা করতে পারেনি। ৩ দশমিক ৭ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের মধ্যে অধিকাংশই মানসিক বিষণèতায় ভোগে। যেমন, অধিকাংশ সময় মন খারাপ থাকা, পছন্দের কাজ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অস্বাভাবিক কম বা বেশি ঘুম হওয়া, কাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করা, সবকিছুতে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা। এ সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে তরুণরা। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ১২৩৯ জনই (৬১.২%) বলেছে, তারা বিষণèতায় ভুগছেন। আর ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ জানান, তাদের মানসিক অস্থিরতার বিষয়ে কারও সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারে না। মন খারাপ হলে বা বিষণè হলে তরুণ-তরুণীদের ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ বন্ধুদের সঙ্গে, ২২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে এবং ১ দশমিক ৯ শতাংশ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা শেয়ার করে। তবে জরিপে অংশগ্রহণকারী বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে কেউই তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে বিষণèতার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন না।

সাম্প্রতিক সময়ে যৌথ পারিবারিক কাঠামো ভেঙে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে মানুষ ছোটবেলা থেকেই একটু বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ছে। অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়াও আত্মহত্যার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে শিশুরা বেশি সময় ব্যয় করছে। এ কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে তাদের চোখ, মাথা ও কানের মতো পঞ্চেন্দ্রিয়ের ওপর অতিমাত্রায় চাপ পড়ছে। এতে তারা সংবেদনশীল হতে বাধ্য। তাছাড়া প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণ করতে না পারা মানুষকে বিষণœতার দিকে ঠেলে দেয়। একজন মানুষের জীবনে একের পর এক এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাকে চরম মাত্রায় হতাশ করে তোলে। একপর্যায়ে সে আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে এটাই হয়ে আসছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার ঘটনা নির্মূলে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ ও প্রয়াস থাকলেও এ প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। তবে প্রচেষ্টাগুলো আরও বেশি মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে। পাশাপাশি অবকাশ রাখে নতুন ভাবনা ভাবার। শিল্পায়নের সঙ্গে নগরায়ণ, একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় পাল্লা দিয়ে সমাজ নানা জটিল বাঁক নিচ্ছে। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো দিন দিন হালকা হয়ে যাচ্ছে। সঠিক সামাজিকীকরণ, শক্তিশালী ও কার্যকর সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধসমূহ ধারণ ও লালন, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সংহতি স্থাপন করা সম্ভব হলে তা হবে আত্মহত্যা নিরসনের মূল হাতিয়ার। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে আরও বেশি শক্তিশালী করা প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। মেয়েদের জন্য তৈরি করতে হবে সামাজিক সুরক্ষার বলয়।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ।

Check Also

কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে জোর দিতে হবে

আফতাব চৌধুরী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের ভিত্তি অবশ্যই কৃষি। এর তিন চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকে উপেক্ষা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x