Tuesday , October 26 2021
Home / উপ-সম্পাদকীয় / আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে হবে

আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ

করোনা শুধু আমাদের জীবনের উপর আঘাত হানেনি, নীতি-নৈতিকতা পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতায়ও আঘাত হেনেছে। অর্থনৈতিকভাবেও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠা গেলেও মানুষের নৈতিক চরিত্রের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠা অত্যন্ত কঠিন। একজন মানুষের যখন নৈতিক ও মূল্যবোধের স্খলন ঘটে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থার উপর পড়ে। এটি পরিবার ও সমাজে উদাহরণ হয়ে থাকে এবং অনেকের মধ্যে এ পথে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এতে সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। করোনার আগে থেকেই আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে। করোনা তা যেন আরও বেগবান করেছে। ঘরবন্দি মানুষকে খাচায় বন্দী থাকা বাঘের মতো অসহিষ্ণু করে তুলেছে। অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং জীবন-জীবিকা চালানোর দুশ্চিন্তায় অনেকে মেজাজ হারিয়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে। উন্নত বিশ্বের মানুষের মধ্যেও এ প্রবণতা দেখা গেছে। সাধারণভাবে মানুষের মানসিক প্রশান্তির অন্যতম উপকরণ অর্থ। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা মানুষকে স্থির থাকতে সহায়তা করে। যখন একজন মানুষের জীবন-জীবিকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়ে, কাজ হারিয়ে বেকারত্বের শিকার হয়, তখন তার মনোজগত এলোমেলো হয়ে যায়। কি করবে, কিভাবে জীবন চালাবে, এ চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠে। এই অস্থিরতা অনেক সময় তাকে বিপথে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। এতে পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে। গত দেড় বছরে এই সহিংসতার হার দেড় গুণ বেড়েছে। সাংসারিক ঝামেলায় বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচ্ছেদের ৭০ শতাংশ ঘটেছে নারীদের পক্ষ থেকে। এ চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ, পরিবারই যদি ভেঙ্গে যায়, তবে মানুষের পক্ষে সুস্থ ও সুস্থিরভাবে জীবনযাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। বাবা-মায়ের বিচ্ছিন্নতায় তারা অসহায় হয়ে পড়ে। কাকে ছেড়ে কার কাছে থাকবে, এমন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এর কুপ্রভাবে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের সামাজিক অবজ্ঞা ও অসম্মানজনক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। যে বাবা-মায়ের সান্নিধ্যে থেকে সন্তান শাসন-বারণ ও নীতি-নৈতিকতার মধ্যে থেকে বেড়ে উঠবে, সে পরিবারই যদি না থাকে, তাহলে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া তাদের মধ্যে পড়া স্বাভাবিক। অনেক সময় এ কারণে তারা বিপথে ধাবিত হয়।

দুই.
পরিবার ও সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রাতারাতি ঘটে না। আবার সামাজিক নীতি-নৈতিকতা ধরে রেখে সময়কে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়াও হঠাৎ করে হয় না। দশক ধরে এর পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট রেখে হচ্ছে কিনা, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। মানুষের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, সভ্যতার দিকে ধাবিত হওয়া। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের সভ্যতার যে বিবর্তন, তা সুচিন্তা এবং তার বাস্তব প্রয়োগেরই ধারাবাহিকতা। এই সভ্য হতে গিয়ে মানুষ ভাল-মন্দ দুটো পথের দিকেই এগিয়ে চলেছে। দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ ভাল পথের পথিক হয়েছে। পরিবার ও সমাজ গঠনে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন মানবিক গুণাবলি প্রতিষ্ঠা করেছে। যুথবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলেছে এবং তাদেরই আধিপত্য স্থাপিত হয়েছে। তারাই সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং দিয়ে আসছে। বলা হচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগ মানুষের আবেগ কেড়ে নিয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের মধ্যেই স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হওয়ার প্রবল ইচ্ছা শক্তি কাজ করছে। তাদের গতি এতটাই বেড়েছে যে, পারিবারিক ও সামাজিক রীতি-নীতি, মূল্যবোধ এমনকি ধর্মীয় অনুশাসন এই গতির কাছে হার মানছে। অন্যদিকে, বিগত দেড় বছরের অধিক সময় ধরে করোনায় জীবন-জীবিকা কঠিন হয়ে পড়ায় মানুষ এখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। পারিবারিক ব্যয় সংকুলান করতে না পারায় সন্তানের দিকে ঠিক মতো খেয়াল রাখতে পারছে না। অনেকের পক্ষে সন্তানকে পুনরায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও দেখা যাবে, অসংখ্য শিক্ষার্থী স্কুলে অনুপস্থিত থেকে যাবে। শুধু রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসছে না। ইতোমধ্যে, নিম্নবিত্ত অনেক পরিবার গ্রামে চলে গেছে। ফলে এসব পরিবারের সন্তানদের অনেককে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যাবে না। গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যে তারা পড়াশোনা করবে এমন নিশ্চয়তা নেই। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা এবং সন্তানকে পড়াশোনা করাতে না পারার হতাশা যে তাদের কুড়েকুড়ে খাবে, তাতে সন্দেহ নেই। এতে সংসারে অশান্তি যেমন বাড়বে, তেমনি সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনাও ঘটবে। হতাশা থেকে সন্তানরাও বিপথগামী হয়ে উঠবে। এমন আলামত ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে বিত্তবান পরিবারের বিষয়টি আলাদা। করোনায় তাদের তেমন কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি। অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়তে হয়নি। তারপরও এসব পরিবারে অশান্তি ও বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক হিসেবে দেখা যায়, গুলশান-বনানী-উত্তরার মতো অভিজাত এলাকা থেকে মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজারের মতো ডিভোর্সের আবেদনপত্র জামা পড়ে। একটু কম অভিজাত এলাকায় এই হার গড়ে এক হাজার। পুরুষের চেয়ে নারীরাই ডিভোর্সের আবেদন করছে বেশি। অভিজাত এলাকায় ডিভোর্সের হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, নারীদের মধ্যে অধিকমাত্রায় স্বনির্ভর হওয়ার প্রবণতা। এছাড়া নীতি-নৈতিকতার স্থান দুর্বল হয়ে যাওয়া, পুরুষদের মধ্যে চরিত্রহীনতা বৃদ্ধি এবং ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নারী-পুরুষের যোগাযোগ স্থাপন, বিয়ে ও অবশেষে প্রতারণার শিকার হওয়া। বলাবাহুল্য, এসবের নেপথ্যের কারণ সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়। শুধু অভিজাত এলাকাই নয়, দেশের সামগ্রিক পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থায়ও মূল্যবোধের অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। সমাজবিদরা বলছেন, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর কুপ্রভাব পড়ছে সন্তানের ওপর। সন্তান বিপথে চলে যাচ্ছে। মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলা ও বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ায় অভাবনীয় অপরাধের ঘটনা ঘটছে।

একটি শিশুর জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে বেড়ে উঠার মূল সুতিকাগার তার পরিবার। শুধু শারিরীকভাবে বেড়ে উঠাকে প্রকৃত মানুষ হওয়া বোঝায় না। দৈহিক শক্তি-সামর্থ্য বা পালোয়ান হলেই সে মানুষ হয় না। শারিরীকবৃদ্ধির সাথে ভাল-মন্দ বোঝা এবং নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠার মধ্যেই মানুষ হওয়ার সার্থকতা নিহিত। একটি শিশুকে মানুষের মত মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে তার পিতা-মাতা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য। তাদের কথা-বার্তা, আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ কাদামাটিসম শিশুর মন ও মননে স্থায়ীভাবে ছাপ ফেলে। তারা যা করে শিশুটিও তা দেখে এবং শিখে। পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যে পথে গমন করে শিশুটিও সেই পথ ধরে। আধুনিক যুগে অনেক বাবা-মাকে দেখা যায়, শিশুকে সময় না দিয়ে তাদের সঙ্গী করে দেয় মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার। এসব ডিজিটাল ডিভাইস এবং এর মধ্যকার বিভিন্ন গেম ও কনটেন্ট তাদের নিত্যসঙ্গী হয় এবং এর সাথেই তারা বেড়ে উঠে। করোনাকালের বন্ধীজীবনে সন্তানকে শান্ত রাখার একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছে এসব ডিজিটাল ডিভাইস। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও সন্তানের যে মানসিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা পূরণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তারা ডিজিটাল শিক্ষা পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশই এভাবে বেড়ে উঠছে। ডিজিটাল শিক্ষার মাধ্যমে তারা মূলত পশ্চিমা ও বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে উঠছে। এর কুফল এখন সমাজের সর্বত্র দৃশ্যমান। এই যে কিশোররা গ্যাং সৃষ্টি করে পাড়া-মহল্লায় ‘হিরোইজম’ দেখানোর নামে ভয়ংকর সব অপরাধ করে বেড়াচ্ছে, তা ঐ ডিজিটাল শিক্ষারই কুফল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই বিপথে চলে যাওয়া আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের দেয়াল ধসে পড়ার একটি খন্ডচিত্র মাত্র।

তিন.
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের এবং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব সম্পর্কিত নীতিকথাগুলো নিয়ে এখন আলোচনা হয় না বললেই চলে। অনেকে কথাগুলো স্মরণ করেন কিনা, সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পারস্পরিক এই দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণে থাকলে সন্তানের হাতে পিতা-মাতা এবং পিতা-মাতার হাতে সন্তানের খুন হওয়ার মতো অকল্পনীয় ঘটনা ঘটত না। হ্যাঁ, পিতা-মাতাকে হত্যাকারী সন্তান বা সন্তানকে হত্যাকারী পিতা-মাতার বিচার হবে। জেল-ফাঁসি হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জেল বা ফাঁসি হলেই কি এসব ঘটনার শেষ হবে? এসব তো স্বাভাবিক কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নয় যে, হিংসা-প্রতিহিংসা বা শত্রুতামূলকভাবে ঘটানো হয়েছে এবং জেল-ফাঁসি হলে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিকার করা যাবে। এসব ঘটনা মনস্তাত্ত্বিক এবং পিতা-মাতা বা সন্তানের মানসিক বিকৃতির ফল। পারিবারিক নীতি-নৈতিকতার চরম অবক্ষয় না হলে এমন ঘটনা কোনোভাবেই ঘটানো সম্ভব নয়। এই অবক্ষয় এতটাই ঘটেছে যে, পিতা-মাতাকে সন্তানের এবং সন্তানকে পিতা-মাতার শত্রুতে পরিণত করছে। এর দায় পিতা-মাতাকেই নিতে হবে। কারণ, সন্তান জন্মের পর তাকে সঠিকভাবে পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে তোলা পিতা-মাতারই দায়িত্ব। এক্ষেত্রে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালিত হচ্ছে না বলেই সন্তান বিপথে যাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্য এবং সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের উদাসীনতা, নীতি-নৈতিকতার চর্চার অভাব এবং অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্রয় তাদের উচ্ছৃঙ্খল ও অবাধ্য করে তুলে। এছাড়া সামাজিক রীতি-নীতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের শৈথিল্য এবং অভিভাকের ভূমিকা পালনকারীদের নিষ্ক্রিয়তাও বাড়ন্ত শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। বলা বাহুল্য, বাড়ন্ত শিশু শ্রেণী অনেকটা কাদা মাটির মতো। যে পরিবেশে এবং যে সংস্কৃতিতে তাদের গড়ে তোলা হবে, সেভাবেই গড়ে উঠবে। প্রকৃতিগতভাবেই অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমেই শিশুদের মেধা ও মনন বিকশিত হয়। স্বচ্ছ পানির মতো যে পাত্রে রাখা হবে, সে পাত্রেরই আকার ধারণ করবে। এক্ষেত্রে পাত্রটি যথাযথভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আছে কিনা, তা সংরক্ষণকারীর পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে। সমাজে ভাল এবং মন্দ দুই রয়েছে এবং থাকবে। তবে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা এবং নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় রীতি-নীতির সুদৃঢ় ভিত্তির কারণে ভাল’র আধিপত্য চিরকাল ধরেই বিদ্যমান। মন্দ বিষয়টি বরাবরই কোনঠাসা হয়ে থাকে। দুঃখের বিষয়, দিন দিন সমাজের এই বৈশিষ্ট্য ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভাল দিকটি নিষ্ক্রিয় হয়ে মন্দ দিক প্রকট হয়ে উঠছে। সমাজের অভিভাক শ্রেণীর এই অবক্ষয় ঠেকানোর কথা থাকলেও, তাদের উদাসীনতা ও মন্দ’র প্রভাবের কাছে সমাজ তার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এক্ষেত্রে মন্দ কাজে লিপ্তদের পরিবারের অভিভাবকদের চরম ব্যর্থতাও রয়েছে। তারা সন্তানের আচার-আচরণ ও চলাফেরার বিষয়টি খেয়াল করেন না। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাসায় ফিরছে, এ ব্যাপারে কোনো ধরনের খোঁজ-খবর না রাখায় সন্তান বিপথগামী হয়ে পড়ছে। সামাজের সুষ্ঠু রীতি-নীতির চর্চার অভাবে শিশু-কিশোররা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। সামাজের এই নেতিবাচক পরিবর্তন যেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে, তেমনি সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব পালনকারী পরিবারের অভিভাবকদের উদাসীনতাও লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। সন্তানের প্রতি যথাযথ খেয়াল না রাখার প্রবণতার কারণে তারা নিঃসঙ্গ, হতাশ ও উগ্রতার কবলে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা তাদের দ্বারা সংগঠিত হচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজের চরম নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্রটিই উঠে আসছে।

চার.
পারিবারিক, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন-এসব কোন আইনের মাধ্যমে হয়নি। জীবনকে সুশৃঙ্খল ও সঠিকপথে পরিচালিত করার লক্ষ্যেই মানুষ নিজস্বার্থে এসব মানবিক গুণাবলী ধারণ করেছে। তা নাহলে, মানুষ সেই আদিম যুগেই পড়ে থাকত, আজকের সভ্যযুগে বসবাস করত না। আইনের মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে হয়তো দৃষ্টান্ত স্থাপন ও অন্যদের সতর্ক করা সম্ভব। তবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে শোধরানো সম্ভব নয়। এজন্য পরিবার ও সমাজের মহৎ ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত। পরিবার ঠিক থাকলে সমাজে তার প্রতিফলন ঘটে। পরিবারের অভিভাবক শ্রেণীকেই এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবারের নবীণ সদস্যদের আচার-আচরণ ও চলাফেরার দিকে তীক্ষ্ম নজর রাখতে হবে। তাদের সামনে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধের চেতনাগুলো তুলে ধরতে হবে। পাড়া-মহল্লায় প্রভাবশালীদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনে অপকর্মে লিপ্তদের পরিবারের অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে হবে। স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে শিক্ষকদের মোটিভেশনাল ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। করোনায় সন্তানদের মনোজগতে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তা থেকে তাদের বের করে আনার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে। জুম্মার নামাজের সময় মসজিদের ইমামদের এ ব্যাপারে বয়ান দিতে হবে। এখন আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, কেউ ধর্মীয় কথা বললে তাকে বক্রদৃষ্টিতে দেখা হয়। কেউ কথা বলা থামিয়ে দেয়। অথচ সারা বিশ্বেই এখন মানুষ স্ব স্ব ধর্মের প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে। এমনকি উন্নত বিশ্বের সিনেমাগুলোও ধর্মকে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করছে। এর মূল অর্থই হচ্ছে, মানুষকে মানবিক করে তোলা। আমরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও অমাদের চিরায়ত যে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধ, তা উন্নত বিশ্ব থেকে এগিয়ে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও আমাদের এই রীতি-নীতির প্রশংসা করে। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শাসন-বারণের সুসংস্কৃতি আমাদেরই ধরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভিনদেশের সংস্কৃতি সাময়িকভাবে আকর্ষণ করলেও কখনো নিজের হতে পারে না। প্রত্যেক দেশই তার নিজস্ব সংস্কৃতির পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের তরুণ শ্রেণীর মধ্যেও নিজস্ব পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকদের ভূমিকা রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের কাছ থেকে অপরাধীর প্রতি কঠোর ও সাধারণ মানুষের প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ কাম্য। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে এ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু অপরাধ বা অপরাধীদের ধরণ নিয়ে তদন্ত ও গবেষণা করলে চলবে না। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তন কিভাবে হচ্ছে, কোন দিকে ধাবিত, এসব বিষয় নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। অপরাধীর ক্ষমতার উৎসের কথা বিবেচনা না করে অপরাধীর অপরাধকে আমলে নিতে হবে।

Check Also

কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে জোর দিতে হবে

আফতাব চৌধুরী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের ভিত্তি অবশ্যই কৃষি। এর তিন চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকে উপেক্ষা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x