Home / উপ-সম্পাদকীয় / আধুনিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে

আধুনিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে

সাকিবুল ইসলাম ফারহান

ঢাকা হচ্ছে বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল শহরগুলোয় একটি, যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৩,২৩৪ জন লোক বাস করে। দিন দিন বিভিন্ন কারণে এই জনসংখ্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন প্রক্রিয়ায় বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা। তার সাথে সাথে বর্জ্যের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের মোট বর্জ্যর শতকরা ৩৭ ভাগই উৎপাদিত হয় রাজধানী ঢাকায়। বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বর্জ্য নিষ্কাশনের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। ফলে বিপুল মানুষের গৃহস্থালির বর্জ্য প্রতিদিন এখানে সেখানে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। বর্জ্য পদার্থকে এখানে সেখানে স্তূপ করে রাখা হয় এবং তা পচে-গলে চারপাশকে মারাত্মক দূষিত করে। বর্ষা মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ডাস্টবিন উপছে কঠিন বর্জ্য রাস্তার পাশে ড্রেনে পড়ে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা কে সম্পূর্ণ অচল করে দেয়। বর্ষাকালে খালে যেখানে পানিতে টইটুম্বুর থাকার কথা কিন্তু সেখানে পানির পরিবর্তে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা রাজধানী ঢাকার নিত্যনৈতিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই শহরের ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠানোর পরিবর্তে প্রয়োজন পরিকল্পিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

বর্তমানে বাংলদেশে বর্জ্য সৃষ্টির পরিমাণ প্রতি বছর প্রায় ২২.৪ মিলিয়ন টন, অর্থাৎ মাথাপিছু ১৫০ কিলোগ্রাম। এ হার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে, ২০২৫ সালে দৈনিক প্রায় ৪৭ হাজার ৬৪ টন বর্জ্য উৎপন্ন হবে। এতে করে মাথাপিছু হার বেড়ে দাঁড়াবে ২২০ কিলোগ্রাম। সম্প্রতি এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম প্রধান দূষণ নগরী। করোনাকালীন সময়ে এই দূষণের মাত্রা আরও প্রকট আকার করে। এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডোর) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার একমাস পর উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় প্রায় ৩ হাজার ৭৬ টন যেখানে সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং স্যানিটাইজারের বোতল, ত্রাণ বিতরণে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগের বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে পলিথিন ব্যাগের বর্জ্য ৫ হাজার ৭৯৬ টন, পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস ৩ হাজার ৩৯ টন, সার্জিক্যাল হ্যান্ডগ্লাভস ২ হাজার ৮৩৮ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক এক হাজার ৫৯২ টন এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ৯০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেছে। ঢাকায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩১৪ টন সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভসের বর্জ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ঢাকায় পলিথিন হ্যান্ডগ্লাভস ৬০২ টন, সার্জিক্যাল মাস্ক ৪৪৭ টন, পলিথিন ব্যাগ ৪৪৩ টন ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল থেকে ২৭০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে। এসব নতুন দূষকের হাত থেকে পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন সঠিক ও সুপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশভেদে, শহর বা গ্রাম্য এলাকাভেদে, আবাসিক বা শিল্প এলাকাভেদে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ধরন আলাদা হয়। কোনো একটি এলাকার জনস্বাস্থ্য, কারিগরি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সফল কার্যকারিতা নির্ভর করে। আঞ্চলিক পরিবেশ এবং এলাকার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনযাপন পদ্ধতিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করে তোলার বিকল্প নেই। সাধারণত স্থানীয় বা পৌরকর্তৃপক্ষ আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা থেকে উৎপন্ন অবিষাক্ত ময়লাসমূহের জন্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে। অপরপক্ষে বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকার অবিষাক্ত ময়লাগুলো ঐ ময়লা উৎপন্নকারীদেরকেই ব্যবস্থাপনা করতে হয়।বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি কাঠামো গড়ে উঠেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের উপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত নানাবিধ পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যেসকল বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে সেগুলো হলো: (১) চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮, (২) বিপদজনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙ্গার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১, (৩) ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক পণ্য হইতে সৃষ্ট বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৭ (খসড়া)।

বাংলাদেশে বর্জ্য উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল্ড পদ্ধতিতে চূড়ান্ত ডিসপোজ করা হয়। এই উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল্ড মোটেও পরিবেশসম্মত নয়। বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা)’র যৌথ উদ্যোগে ঢাকার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ক্লিন ঢাকা মাস্টার প্ল্যান নামে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সোশ্যাল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ ওয়েস্ট কনসার্ন, বাসাবাড়ি পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। ইউনিসেফ সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে। তারপরও বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নানাদিক থেকে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ থেকে পিছিয়ে আছে। আইনের যথাযথ ও সুষ্ঠু ব্যবহার যদি নিশ্চিত করা না হয় তবে দেশবাসী আইনের সুফল লাভ করতে পারবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও আদেশ যথাযথভাবে পালনের মাধমেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুফল লাভ করা যাবে। বাংলাদেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামের প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিতকরণে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলোতে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারযোগ্য লাভজনক ভিন্ন বস্তুতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। এজন্য তারা অন্য দেশ থেকেও বর্জ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশেরও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে বর্জ্য সংরক্ষণ, নিরপেক্ষায়ণ, নিষ্ক্রীয়করণ অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ব্যবহার উপযোগী বিভিন্ন নতুন জিনিস বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এতে পরিবেশের সাথে সাথে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ ও দেশের মানুষ। ঢাকায় উৎপাদিত বর্জ্যের ৭৬ ভাগই রিসাইকেল যোগ্য। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুরোটাই আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া হয়। ১০ বছর আগে দৈনিক ৩,২০০ টন বর্জ্য উৎপাদনের বিপরীতে ৪৩ শতাংশ হারে অপসারিত হতো ১,৩৭৬ টন। আর এখন দৈনিক ৬,১১০ টন বর্জ্য উৎপাদনের বিপরীতে অপসারিত হয় ৪,৫৮২ টন বর্জ্য। বৃষ্টিতে পানি জমলে কঠিন এবং তরল বর্জ্য একাকার হয়ে যায়। গত ১০ বছরে ঢাকায় বর্জ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এসব বর্জ্যকে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রিসাইকেল করা যায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৩জ, ৪জ নীতি প্রয়োগ করা হয়। ৩জ নীতি হলো, Reduce (কমানো), Reuse (পুনর্ব্যবহার) এবং Recycle (পুনশ্চক্রীকরণ)। ৪জ নীতি হলো, Reduce (কামানো), Recycle (পুনব্যবহার), Recycle (পুনশ্চক্রীকরণ), Recover (পুনরুদ্ধার)। ভবিষ্যত বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৩জ এর পাশাপাশি ৪জ এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য উৎপাদনের উৎস থেকে বর্জ্যের ধরন বুঝে আলাদা করে ফেলতে হবে। তারপর বর্জ্যের ধরন অনুসারে তা আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে ডাম্পিং করতে হবে। বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইনসিনারেশন (বর্জ্য পোড়ানো) পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু তার পূর্বে অবশ্যই এর পরিবেশগত দিক নিয়ে ভাবতে হবে। গৃহস্থালি বর্জ্য ও মনুষ্য বর্জ্য একত্রে ব্যবহার করে সার উৎপাদন করা যেতে পারে। এতে করে বর্জ্যর সঠিক ব্যবহার যেমন নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি বর্জ্যর পুনর্ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। সিটি করপোরেশন এলাকার জৈব বর্জ্যকে বায়োগ্যাস ও জৈব সারে রূপান্তর করতে পারলে তা দিয়ে জ্বালানির জোগানসহ জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করা সম্ভব। যেকোনোমূল্যেই হোক বর্জ্যের ভলিউম কমিয়ে আনতে হবে। সেটা করা যায় ইনসিনারেটর পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে। তাতে বর্জ্যের ভলিউম কমবে এবং সাথে সাথে বিদ্যুৎও তৈরি হবে। বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ দহনে গ্যাস উৎপাদন এবং গ্যাস থেকে টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি নিরাপদ পদ্ধতি। সরকারি হিসেব মতে, ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণে বর্জ্য উৎপাদিত হয় তা থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সুখবর হলো, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হবে ১৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে পরিবেশ দূষণ একেবারেই হবে না। সাধারণভাবে এই বর্জ্য পদার্থ জমে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এ ছাড়া, ওই গ্যাসে থাকে মিথেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড, যা মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সময়ে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কোনও সম্ভাবনাই নেই। তাই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি বর্তমান সময়োপযোগী বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিকল্প পদ্ধতি।

Check Also

জীবন-জীবিকা দুটোই বড় চ্যালেঞ্জ

রায়হান আহমেদ তপাদার বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগকালে মানুষকে বাঁচানোর পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাও সচল রাখতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x