Home / উপ-সম্পাদকীয় / বিশ্বব্যাপী শক্তির বিন্যাসে চীন ও মধ্যপ্রাচ্য

বিশ্বব্যাপী শক্তির বিন্যাসে চীন ও মধ্যপ্রাচ্য

রায়হান আহমেদ তপাদার

বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটে চলেছে। নতুন অবয়ব নিতে শুরু করেছে অনেক কিছু। পুতিনকে খুনি আখ্যা দেয়ার জের কাটতে না কাটতে চীনের সাথে ইরানের ২৫ বছরের কৌশলগত বহুলালোচিত চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার খবর বেরিয়েছে। তাইওয়ান ইস্যুতে চীন-মার্কিন উত্তেজনা বাড়ছে। ভারতের সাথে চীন আর পাকিস্তানের একদিকে দেখা যাচ্ছে বোঝাপড়ার চেষ্টা আবার অন্য দিকে ভারতকে আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার চেষ্টায় নতুন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভাগ্য ঝুলে আছে- তিনি সরকার গঠন করতে পারবেন নাকি প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়ে মুখোমুখি হবেন বিচারের। অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসরেও। সব কিছু অবলোকনে মনে হচ্ছে বিশ্বে নতুন কিছু ঘটা বা ঘটানোর জন্য ভেতর থেকে আয়োজন চলছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বলে বিশ্বের নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করার কাজটা এতটা সহজ নয়, এজন্য দরকার বিশ্বের জাতিগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা, বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জন করা।

চীন এজন্য তার এতোদিনের একঘরে বদ্ধ পররাষ্ট্র নীতি উম্মুক্ত করে ঢেলে সাজিয়ে অন্যান্য জাতিগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে এসেছে কয়েক দশকধরে। প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অসচ্ছল, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল জাতি ও দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছে, গ্রহণ করেছে, ব্ল্যাঙ্ক চেকবুক কূটনীতি।চেকবুক কূটনীতির মাধ্যমে বন্ধু দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। এমনকি আর্থিক বিনিয়োগ করেই চীন তার প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার সূযোগ নিচ্ছে।অর্থাৎ বেইজিং অর্থনীতিকে তার সম্প্রসারণবাদী নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।আর্থিক সহযোগিতাপ্রাপ্ত দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এভাবেই চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে।

সারা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে, বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্প হাতে নিয়েছে। চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বন্ধু রাষ্ট্রের খোঁজে নজর দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তরপূর্ব এশিয়ার ও আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে। আর মধ্যপ্রাচ্যকে তার ভবিষ্যতের শক্তির জন্য অপরিহার্য পিভট হিসেবে বিবেচনা করছে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি.ওয়াং সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সফরকালে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বিশ্বের একটি চৌরাস্তায় অবস্থিত বলে মন্তব্য করেছেন। এর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে চীনাদের আগ্রহের বিষয়টা স্পষ্ট হয়েছে। চীন-ইরান চুক্তির একটা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দিক রয়েছে এমন একসময়ে চুক্তিটা হয়েছে, যখন বিশ্বশক্তি আমেরিকা চীন ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নতুন করে চাপিয়ে দিয়েছে। ইরান আমেরিকার ঘেরাটোপে পড়ে জাতীয়ভাবে বিপর্যস্ত এবং অন্যদিকে উদীয়মান বিশ্বশক্তি চীন বিশ্বব্যাপী শক্তির বিন্যাস তার পক্ষে নিয়ে আসার জন্য মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, যেখানে আমেরিকার রয়েছে একাধিপত্য।

আমেরিকার ওই একাধিপত্য খর্ব করে ওই অঞ্চলে চীন আধিপত্য বিস্তার করতে সচেষ্ট হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক ক্ষমতায় চীনকে অভিষিক্ত করার লক্ষ্যে একবিরাট কর্মসূচির অংশ হিসেবে তুরস্ক থেকে ইরান। এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোতে সফরকালে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং চীন-ইরান ঐতিহাসিক ওই চুক্তিটা স্বাক্ষর করেছিলেন, যা ওই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়ে ওঠেছে। চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে ভবিষ্যত সম্পর্কের জন্য পাঁচটা নীতিনির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং। এগুলো হলো, পরস্পরকে সম্মান করা, ন্যায়বিচারকে সমর্থন করা, পারমাণবিক বিস্তার রোধে যৌথভাবে উৎসাহিত করা, যৌথ নিরাপত্তার সুরক্ষা সহযোগিতা এবং যৌথ উন্নয়ন সহযোগিতা ত্বরান্বিত করা।চীন তার লক্ষ্য অর্জনে একে একে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে চলেছে। এমনকি ইরান ওই অঞ্চলের আমেরিকা বিরোধী একটা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, তার সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে চীন তার আন্তর্জাতিক শক্তি হয়ে ওঠার জন্য অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে অনুমতি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের অধ্যাপক রিচার্ড ফালক মন্তব্য করেছেন যে, চীন-ইরান চুক্তি ওই অঞ্চলে বেইজিংয়ের আরও একটা এজেন্ডা হওয়ার তৎপরতা যা একটা নতুন যুগ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বিশ্বের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মানদ-ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে ইতোমধ্যেই চীন স্থান করে নিয়েছে এবং আমেরিকাকে পেছনে ফেলে শীর্ষ স্থানটা দখলে নিতে চীনারা অব্যাহত চেষ্টা করে চলেছে। এজন্য অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে অর্থনীতির সকল শাখায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। বিশ্বের বাজারগুলো চীনের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটা অর্থনীতিতে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেবার লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন চীনা নেতা শি জিন পিন। শুধু অর্থনীতিই নয়, ক্রমবর্ধমানভাবে সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি, ন্যাভাল ফোর্সের জন্য উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিন ইত্যাদি সংযোজন, নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে সমরাস্ত্রের আধুনিকায়ন, পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন, বিপনন, নিজেদের ভূখ-ের বাইরে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

চীনের মূল লক্ষ্য হলো একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, বিশ্বে রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য দেশকে উপযোগী করে তোলা। অর্থাৎ একুশ শতকের, গেইম অব গ্রেট পাওয়ারস প্রতিযোগিতার জন্য সক্ষমতা অর্জন করে আমেরিকাকে টপকে বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের একদম শীর্ষ নেতৃত্বের স্থানটা অলংকৃত করাই হলো চীনের চুড়ান্ত লক্ষ্য। চীন কোনোও প্রক্সির সন্ধান না করার, নিজেদের স্বার্থের কোনোও ক্ষেত্র অনুসন্ধান না করার এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনোও শক্তির শূন্যতা পূরণের চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, অর্থাৎ এতিনটা নীতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে চীন তার মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণ করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী হয়ে ওঠেছে। তবে তিন না নীতির কারণে ওখানটায় এখনঅবধি চীন কোনোও প্রকারের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা রাখার আগ্রহ যতোই বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্য ততোই চীনাদের নজর টানছে। এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে চীন-ইরানের মধ্যেকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হবে এবং এতে করে উভয় রাষ্ট্রের বিরাজমান বানিজ্যের জটিলতা নিরসন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ। অন্যদিকে, আমেরিকা ও জাতিসংঘের ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে ইরান বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

এমন একটা অবস্থার মধ্যে দেশটার সাথে বিশ্বের উদীয়মান শক্তিধর রাষ্ট্র চীনের ২৫-বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা নিরসনের একটা সূযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষকরে, বিশ্ব থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্য আমেরিকান চাপকে হ্রাস করবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা, চীন ইরানকে তার রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার সুরক্ষার পক্ষে দৃঢ় সমর্থন করে বলে জানিয়েছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং। জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়েছিলো। চীনের সাথে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক ও সুরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির ফলে চীন ইরানের জাতীয় উন্নয়নে পঁচিশ বছরে চার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং ইরান অব্যাহতভাবে চীনের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ করে যাবে।

অন্যদিকে, তেহরানভিত্তিক সাংবাদিক ও ইরান বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাতিমা করিম খান ওই চুক্তিকে গেম চেঞ্জার হিসেবে দেখছেন না। তবে চীনকে মধ্যপ্রাচ্যের আরও স্থিতিশীল পথ খুঁজে পাওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম একটা পথ হিসেবে দেখছেন। এভাবেই চীন আগামী আন্তর্জাতিক বিশ্বের নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কাজটা করে চলেছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র চায়না ডেইলি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, তিনি পঞ্চমুখী একটি পরিকল্পনার সূচনা করেছেন যার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল আলোচনা শুরু, ইরানের পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবন এবং এই এলাকায় একটি সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।এ ধরণের বিষয়গুলো পশ্চিমা কূটনীতিকরাও বলে থাকেন। তবে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের অধিকারে আছে বলেই ধরে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

দেশটি তাই চেক সই করা ছাড়া অন্য ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্রদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরেই রেখেছে। লোহিত সাগরে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এরিমধ্যে তাদের প্রথম বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে, যেটি পড়েছে জিবুতিতে। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জাহাজ চলাচলে অঞ্চলের উপর নজরদারি করে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ড থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।বেইজিং কি ইরান উপসাগরীয় এলাকায় তাদের নৌবাহিনীর পদচিহ্ন আঁকতে চায়, যে এলাকাকে নিজেরে হ্রদ বলে মনে করে আমেরিকা? জো বাইডেন এবং তার প্রশাসন হয়তো ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি বা জেসিপিওএ-তে ফিরে আসার একটা পথ বের করে নেবে। নিজেদের স্বার্থেই তারা এটি করবে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে অস্থিতিশীল এলাকায় চীন যে তাদের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টায় গতি আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটা আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর হবে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Check Also

মিষ্টি পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ কেবল পানি থাকলেই জীবন বাঁচে না। জীবন বাঁচাতে হলে বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *