Home / বিশেষ প্রতিবেদন / ভিন্ন আঙ্গিকে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পাশে সরকার

ভিন্ন আঙ্গিকে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পাশে সরকার

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     চলমান করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে চলছে কঠোর লকডাউন। এতে দেশব্যাপী অচলাবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গত বছরের লকডাউনে বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের খামারিদের আর্থিক প্রণোদনা দেয় সরকার। তবে এ বছর প্রণোদনার বাইরে ভ্রম্যমাণভাবে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম বিক্রিতে সহায়তার মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে খামারিদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার।

জানা গেছে, গত বছর করোনা বিস্তার রোধে ২৬ মার্চ সরকার সারাদেশে ছুটির ঘোষণা দেয়। এ সময়ে বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত থাকায় মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদন এবং বিপণনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। সে সময় মৎস্য ও পশুখাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়ে। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ জন হাজার খামারিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে ৫৬৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার ২৫০ টাকা নগদ প্রণোদনা দেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন’এবং মৎস্য অধিদফতরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্প দু’টির আওতায় এ প্রণোদনা দেওয়া হয়।

 আমরা সবকিছু বন্ধ করে দিলে মানুষের মাছ, মাংস, দুধ ডিমের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। আবার উৎপাদক, খামারি, বিপণনকারীসহ এ খাত সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত চলমান নিষেধাজ্ঞাকালে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম সরবরাহে কোনো বাধা নেই। 

এর মধ্যে দেশের ৪৬৬টি উপজেলা থেকে যাচাইকৃত প্রাণিসম্পদ খাতের ৪ লাখ ৭ হাজার ৪০২ জন খামারিকে (ডেইরি, লেয়ার মুরগী, পোল্ট্রি মুরগি, সোনালি মুরগি, ব্রয়লার মুরগি ও হাঁস খামারি) ১৫টি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন হারে ৪৬৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ৭৫টি উপজেলা হতে যাচাইকৃত মৎস্য খাতের ৭৮ হাজার ৭৪ জন খামারিকে (মৎস্য চাষি, চিংড়ি চাষি ও কাঁকড়া/কুঁচিয়া সংগ্রাহক) ৭টি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন হারে ১০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিগত বছর করোনায় খামারিরা উৎপাদন এবং বিপণনে প্রতিবন্ধকতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, যেটি এবারের লকডাউনে হচ্ছে না। ফলে এ বছর প্রণোদনার বদলে ভিন্ন আঙ্গিকে খামারিদের পাশে থাকছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে খামারগুলোতে উৎপাদন, পরিবহন, সরবরাহ এবং বিপণন স্বাভাবিক রাখতে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সারাদেশে ন্যায্যমূল্যে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও বিভিন্ন প্রাণিজাত পণ্যের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কার্যক্রম চালু করেছে মন্ত্রণালয়। ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেন, এতে করে খামারিরাও উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে ভোক্তাদের কাছে সরাসরি বিক্রি করছেন। এছাড়াও অনলাইনে এসব পণ্য বিক্রির বিষয়েও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সম্পৃক্ত খামারিদের সমস্যা সমাধান করতে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। আর সার্বিক বিষয় মনিটরিং করতে পৃথক কন্ট্রোল রুম চালু করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর এবং মৎস্য অধিদফতর। এক্ষেত্রে দায়িত্বরত স্থানীয় কর্মকর্তারা খামারিদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছেন, তবে কোনো ক্ষেত্রে তারা সমাধান করতে না পারলে বিষয়টি কন্ট্রোল রুমে জানালে সেটি কেন্দ্রীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সার্বিক বিষয়ে প্রতিদিন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিচ্ছে দুই অধিদফতর।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের প্রণোদনার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, ‘এ বছর লকডাউন পরিস্থিতিতে আমরা খামারিদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা করেছি, তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়ার ব্যবস্থা করছি। তারা উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারলে কোনো সমস্যা থাকার কথা না। তাই এ বছর তাদের পণ্য বিক্রি করে দেয়ার জন্য উপজেলা থেকে শুরু করে ঢাকা শহর পর্যন্ত সব জায়গায় আমাদের অফিসাররা কাজ করছেন। যেখানে যেখানে যারা পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না তাদের মালপত্র আমাদের গাড়ি দিয়ে আমরা শহরে বা বাজারে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছি। সেজন্য এ বছর আমরা প্রণোদনার বিষয়টি চিন্তা করছি না।’

 গত বছর আমরা দেখেছিলাম দুধ, ডিম, মাছ ও মাংস বিক্রি হচ্ছে না, ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু এ বছর এখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি এখনও, আশা করি ঘটবেও না। আর তাদের উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ সবকিছুই নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে, কোথাও কোনো বাধা নেই। 

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই তাদের জিনিসটা যেন তারা ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে পারেন। ভ্রাম্যামাণ বিক্রিতে ব্যাপক সাড়া মিলছে। খামারিদের পণ্যগুলো তাদের মাধ্যমেই আমরা কালেক্ট করাচ্ছি। উপজেলা পর্যায় পর্যন্তও একইভাবে তাদের মাল আমাদের গাড়ির মাধ্যমে এনে বিক্রি করে দিচ্ছি। গত বছর আমরা দেখেছিলাম দুধ, ডিম, মাছ ও মাংস বিক্রি হচ্ছে না, ফেলে দিচ্ছি। কিন্তু এ বছর এখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি এখনও, আশা করি ঘটবেও না। আর তাদের উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ সবকিছুই নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে, কোথাও কোনো বাধা নেই।’

সার্বিক বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, আমরা সবকিছু বন্ধ করে দিলে মানুষের মাছ, মাংস, দুধ ডিমের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। আবার উৎপাদক, খামারি, বিপণনকারীসহ এ খাত সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত চলমান নিষেধাজ্ঞাকালে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম সরবরাহে কোনো বাধা নেই। এ ব্যাপারে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দফতর-সংস্থায় চিঠি দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর ভ্রাম্যমাণভাবে খামারিদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি, এতে ব্যাপক সাড়া মিলেছে। যার ফলে খামারিদের উৎপাদিত পণ্য বিপণনে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না।

এদিকে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে গত ৫ এপ্রিল শুরু হয় ভ্রাম্যমাণভাবে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম বিক্রি। ৬৪ জেলায় ৭০৬টি ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা করা হয়। গত ৫ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ১২৬ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকার মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্য ভ্রাম্যমাণ পদ্ধতিতে বিক্রি করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত বছর করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দেয়া প্রণোদনার মধ্যে প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষতিগ্রস্ত একজন খামারিকে সর্বোচ্চ ২২ হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৩৭৫ টাকা দেয়া হয়। অপরদিকে মৎস্য খাতের ক্ষতিগ্রস্ত একজন খামারিকে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয়। প্রণোদনার অর্থ খামারিদের তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি নগদ, বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়।

Check Also

জীবন সংগ্রামে মধ্য-নিম্নবিত্তের চাপা কান্না

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় গত ৫ এপ্রিল থেকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *