Home / উপ-সম্পাদকীয় / বঙ্গবন্ধুই কৃষিবিপ্লবের দিকনির্দেশা দিয়েছিলেন

বঙ্গবন্ধুই কৃষিবিপ্লবের দিকনির্দেশা দিয়েছিলেন

ফাইল ফটো

অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসান

বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখা হবে না। নিরলস কাজ করে দেশে কৃষিবিপ্লব সাধন করুন। কথাটি বলেছেন, ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালির প্রাণ পুরুষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। এর মধ্যে তিনি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কৃষি ও শিল্পকে। কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটাতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। দেশকে এগিয়ে নেয়ার অগ্রনায়ক। তিনি বাঙালির আধুনিক পরিচয়কে বহুমাত্রিক পূর্ণতা দিয়েছেন। তাঁর শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের জমিনের বড় অংশ জুড়েই ছিল বাংলাদেশের কৃষক। কৃষকদের চাওয়া-পাওয়াকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। স্বাধীনতার পরই যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশে তাঁরই উদ্যোগ ও চেষ্টায় সবুজবিপ্লবের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন কৃষি ও কৃষকের অতিপ্রিয়জন, আপনজন। ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম সভায় তিনি নিলেন কৃষকদের জন্য যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত। তাদের সমস্ত বকেয়া খাজনা ও সুদ তিনি মওকুফ করে দিলেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরতরে মওকুফ করার ঘোষণা দিলেন। সীমাহীন বাধা উপেক্ষা করে তৎকালীন সরকার পূর্ব জার্মানি থেকে বিমানে করে ৩৮,০০০টি সেচ যন্ত্র এবং ফিলিপাইন থেকে আইআর ৮ জাতের ধানের উন্নত বীজ আমদানি করে বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে সাড়া ফেলেছিলেন। সে সময় তিনি কয়েক লক্ষ কৃষিঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে খাস জমি বিতরণ এবং চাষিদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ দানের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা ছিল সে সময়কার যুগান্তকারী সাহসী পদক্ষেপ। তিনি কৃষিবিপ্লবের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ভূমি সংস্কার কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলেন। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ণের লক্ষ্যে স্বনামধন্য অর্থনীতিনিদদের নিয়ে গঠন করেন প্রথম পরিকল্পনা কমিশন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি হন কমিশনের চেয়ারম্যান। সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়নের তাগিদে তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তা থেকে তিনি গঠন করেন সেন্সাস কমিশন। কৃষি ও কৃষকদের ভালোবেসে তাদের প্রয়োজনের তাগিদে গঙ্গার পানি বণ্টন সমস্যা নিয়ে ভারতের সাথে দেন-দরবার করে তিনি নায্য সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দিল্লিতে বৈঠক করে তিনি ফারাক্কা সমস্যার আশু সমাধানের জন্য জোর চাপ দেন।

১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে এলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতির এই উজ্জ্বল উপস্থিতি সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার চিত্তকে এক অপার আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল। ঐ দিন সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য দানকালে তিনি দেশের কৃষি ব্যবস্থায় গতিময়তা সংস্কারের লক্ষ্যে কৃষিবিদদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধির ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন। এর ফলে কৃষিবিদগণ লাভ করেন সরকারি চাকরিতে গৌরবের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গৃহীত এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের ফলেই দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনসহ কৃষিশিক্ষা ও গবেষণায় ব্যাপক গতিশীলতা সঞ্চারিত হয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতির জনকের সেই ঐতিহাসিক পদচারণা, কৃষিকে নিয়ে তার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য নিঃসন্দেহে কৃষি ও কৃষকদের প্রতি তার সীমাহীন ভালবাসারই বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধু সেদিন ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে সহজ-সরল ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন তার ঐতিহাসিক অভিব্যক্তি। তিনি বলেছিলেন: এ দেশের ৯০ জন কৃষক গ্রামে বাস করে। আমাদের গ্রামের দিকে যেতে হবে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষিত হচ্ছেন আপনাদের সেদিকে বেশি নজর দিতে হবে। এখন ভুলে যান, শহরমুখী রাজনীতির কথা। আমরা এখন গ্রামের দিকে যাচ্ছি, তখন আপনাদের দাম অনেক বেড়ে যাবে। শহরের ভদ্রলোকদের দেখে আপনাদের চিন্তার কোনো কারণ নাই, কারণ আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে। উৎপাদন করতে হবে। তা না হলে বাংলাকে বাঁচাতে পারবেন না।

তিনি আরো বলেন: কৃষি উন্নয়নের জন্য তোমরা গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ো। বস্তুতঃ তিনি গ্রামকেই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখে কৃষকদের সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন তাঁর সবুজবিপ্লবের কর্মসূচিতে। বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে সেদিন আরও বলেছিলেন: খাদ্য শুধু- চাউল, আটা নয়, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ তরকারীও আছে, কৃষিতে অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রী বলেন, প্রোল্টি বলেন, সবদিকে নজর দিতে হবে। পরিকল্পনা মাফিক আমাদের কাজ করতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে তাঁর আদর্শ ও দিক নির্দেশনা। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, এই মূলমন্ত্রের প্রতি অবিচল থেকে বর্তমান সরকারের কৃষি উন্নয়নের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দেশের কৃষি উন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপ ই তোমধ্যেই দেশবাসীর মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। একই ধারায় প্রণীত হয়েছে নতুন কৃষিশিক্ষা ও গবেষণা নীতি। সোনার বাংলা বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমরা জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবো। তাহলেই তার আত্মা শান্তি পাবে।

Check Also

মিষ্টি পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ কেবল পানি থাকলেই জীবন বাঁচে না। জীবন বাঁচাতে হলে বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *