Home / উপ-সম্পাদকীয় / মুজিবনগর সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধ

মুজিবনগর সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধ

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মেহেরপুর জেলায় বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননকে নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা ও সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ^জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ঐ দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার আদেশ। মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। এ সরকারকে উপদেশ এবং পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। মুজিবনগর সরকারের ১২টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ছিল। বিভাগুলি হলো: প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়, সাধারণ প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন এবং যুব ও অভ্যর্থনা শিবির নিয়ন্ত্রণ বোর্ড। মুজিবনগর সরকার বিশে^র বিভিন্ন দেশের গরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক, স্টকহোমে বাংলাদেশ সরকারের মিশন স্থাপন করে। এসব মিশন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচার এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত নিয়োগ দেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার কাজ করেন। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক, বেসামরিক জনগণকে নিয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তখন বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। এছাড়াও বেশ কিছু সাব সেক্টর এবং তিনটি বিগ্রেড ফোর্স গঠন করা হয়। এসব বাহিনীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনা কর্মকর্তা, সেনা সদস্য, পুলিশ, ইপিআর, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যগণ যোগদান করেন। প্রতিটি সেক্টরেই নিয়মিত সেনা, গেরিলা ও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। এসব বাহিনীতে দেশের ছাত্র, যুবক, নারী, পুরুষ, কৃষক, রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। এরা মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তি ফৌজ নামে পরিচিত ছিল। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে যোদ্ধাগণ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সামরিক ছাউনি বা আস্তানায় হামলা চালিয়ে পাক বাহিনীকে নাজেহাল করে তোলে।

১৯৭১ সালে নিরাপত্তার খাতিরে মুজিবনগর সরকারের সকল বিভাগ ও অফিস ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে পুরো নয় মাস পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করা পর্যন্ত মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশকে পরিচালনা করেছে। ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের অমানুষিক অত্যাচারের হাত থেকে বাঙালিদের রক্ষা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা। অপর দিকে নির্বাসিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২৫ মার্চের গণহত্যার পর বাংলাদেশ এখন রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশ এখন স্বাধীন ও সার্বভৌম (আমি বিজয় দেখেছি পৃ: ১২২, এম.আর আক্তার মুকুল) মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্ট সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং সর্বস্তরের বাঙালি অংশগ্রহণ করে। তাই এ যুদ্ধকে গণযুদ্ধ বা জনযুদ্ধও বলা যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবী নারী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন ও স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক দল হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক নেতৃত্বই মুক্তিযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে। আওয়ামী লীগ প্রথমে পূর্ব বাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনে সংগঠিত করে। তারপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় লাভের পর জনগণকে স্বাধীনতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতাযুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাকে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করার পর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট অপরিহার্য এবং ভবিষ্যত রূপরেখা প্রণীত হয়। ২৫ মার্চের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংঘঠিত হয়ে সরকার গঠন, মুক্তিবাহিনী গঠন, বিদেশি জনমত সৃষ্টি ও সমর্থন আদায় যুদ্ধের অস্ত্রসস্ত্র সংগ্রহ এবং জনগণের মনোবল অটুট রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার ক্ষেত্রে সকল শক্তি মেধা ও রাজনৈতিক দুরদর্শিতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান, ভারতে ১ কোটি শরণার্থীর ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল মুজিবনগর সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। নিরাপত্তার খাতিরে এই মন্ত্রিসভার পাঁচ জন সদস্য কোলকাতার তেরো নম্বর লর্ডসিংহ রোডে অবস্থান করেন। কয়েক সপ্তাহ পরে তারা বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে একটা ভাড়া বাড়িতে উঠে আসেন। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রের স্টুডিও স্থাপিত হলে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা সিআইটিতে ভাড়া করা ফ্লাটে তাদের পরিবার রাখার ব্যবস্থা করেন এবং থিয়েটার রোডে সরকারের একটা ক্যাম্প অফিস স্থাপন করা হয়। এই ক্যাম্প অফিসের এক কোণায় ছোট্ট দুটি কামরায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তার অফিস করেন এবং সেখানেই তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বাকী অংশে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় ছাড়াও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম.এ.জি ওসমানীর ক্যাম্প অবস্থিত ছিল। এই সময় চারজন সচিব নিয়োগ লাভ করেছিলেন। তারা হলেন প্রতিরক্ষা সচিব আব্দুস সামাদ, অর্থ সচিব খোন্দকার আসাদুজ্জামান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব তওফিক ইমাম, সংস্থাপন সচিব নূরুল কাদের খাঁন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এরা যে অমানুষিক পরিশ্রম করে নির্বাসিত সরকারের সচিবালয় গড়ে তুলেছিলেন তা অতুলনীয়। শুধু সচিবালয় নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারের পরিপূর্ণ কাঠামো এবং অর্থ ব্যবস্থার বিধি-বিধান জারির ব্যবস্থা করেছিলেন।

পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে বাঙালি জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্র সমাজ। মুক্তিযুদ্ধের একটি পর্যায়ে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল মূলত ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজের মহান আত্মত্যাগ ব্যতিত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতো। ছাত্র সমাজের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এ দেশের পেশাজীবীরা মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করে বিশ^বাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ, সাহায্যের আবেদন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধে গণমধ্যম, সাধারণ মানুষ প্রবাসী বাঙালি এবং শিল্প সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের অবদান অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্ববোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়ে বিজয়ের পথকে সুগম করে। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া বিজয় অর্জন করা কখনও সম্ভব হতো না। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র, বস্ত্র, বাসস্থান, নানা খবরাখবর দিয়ে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার ফলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক বাহিনী যুদ্ধ শুরু করার আগেই হেরে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

Check Also

মিষ্টি পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ কেবল পানি থাকলেই জীবন বাঁচে না। জীবন বাঁচাতে হলে বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *