Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / সাত কোটি বাঙালীর বজ্রকণ্ঠ

সাত কোটি বাঙালীর বজ্রকণ্ঠ

মোঃ নাসিরুল আলম চৌধুরী

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ত্যাগের ইতিহাস, বাঙালীর গর্বের ইতিহাস। এই ইতিহাস বাঙালীর মাথা উঁচু করে বাঁচার ইতিহাস। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি আদর্শকে সামনে রেখে আমরা আমাদের ইতিহাস ও স্বাধীনতার ভিত রচনা করি। আমাদের আছে একটি স্বাধীনতা এবং একটি বিজয় দিবস। আমরা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করেছি। এ দেশটির স্বাধীনতায় আছে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ইচ্ছার প্রতিফলন, বিজয়ের ইতিহাসে আছে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মহিমা। ত্রিশ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে এবং কয়েক লাখ মা-বোনের চূড়ান্ত আত্মত্যাগের ফসল আমাদের এই স্বাধীনতা। আমাদের আছে গর্ব করার মতো স্বাধীনতার একটি ঘোষণাপত্র। আছে ৭ মার্চের এমন একটি ভাষণ যা একটি নিরস্ত্র জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করে তোলে। একটি ভাষণ কিভাবে মানুষকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে দেশের স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে ৭ মার্চের ভাষণ তার একমাত্র উদাহরণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের শুরু বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল সেই ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে। যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ১৭৫৭ সালে পলাশী প্রান্তরে সেই সূর্য উদিত হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। পরাধীনতার একটি কালরাত অতিক্রম করে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হতে বাঙালীর জীবন থেকে হারিয়ে যায় দুই শ’ বছর। দুই শ’ বছরের একটি অন্ধকার কালরাত অতিক্রম করে যে সূর্য আমাদের আলোকিত করেছিল সেটিই আমাদের বজ্রকণ্ঠ। সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক চেতনার ধারকরূপে যেমন আব্রাহাম লিঙ্কনের ‘এ গবর্নমেন্ট অব দ্য পিপল্, ফর দ্য পিপল্, বাই দ্য পিপল্ …’ তেমনি বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…’ আজ সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির মন্ত্রবাণী।

ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ক্ষেত্রে একক নেতৃত্বদানের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পর্যায়ক্রমে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু, পরবর্তীতে জাতির জনক। বলা চলে ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন জাতির পিতা। এই একটি কণ্ঠই দুই শ’ বছরের নিষ্পেষিত ঘুমন্ত বাঙালীকে জাগিয়ে তোলে। মাত্র ১৮.৩০ মিনিটের একটি ভাষণেই বাঙালীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর দৃঢ় প্রত্যয় আর মুক্তির আকাক্সক্ষা। এই ভাষণ কোন একজন নেতার দেয়া ভাষণ নয়। কোন লিখিত ভাষণও ছিল না সেটি। সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর প্রাণের দাবি একটি কণ্ঠে উচ্চারিত। সাড়ে সাত কোটি হৃদয়ের স্বপ্নকে এক হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই গর্জে ওঠে এমন বজ্রকণ্ঠ। তাই তো ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শোনাতে পেরেছিলেন তাঁর অমর বাণী, যা সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর পাশাপাশি বিশ্বমানবতাকেও জাগিয়ে তুলে। তাই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে কোন কোন দেশের সরকার বিরোধিতা করলেও সেই সেই দেশের জনগণ সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর দাবিকে সমর্থন করেছিল। ৭ মার্চে যেন সাড়ে সাত কোটি কণ্ঠ এক হয়ে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠেছিল। যা যুগে যুগে পরাধীনতার সৃঙ্খল ছিড়ে বেরিয়ে আসতে মানুষকে উৎসাহিত করে যাবে। এই ভাষণ শুধু ভাষা দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে হয়। তাই তো সেদিন ভিন্ন ভাষার এক সাংবাদিক রেসকোর্স ময়দানে তার অনুবাদককে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন এই ভাষণ কাউকে বুঝিয়ে দিতে হয় না।

১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বঙ্গবন্ধুকে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয় বিচক্ষণতার সঙ্গে। সে সময়ের সামান্যতম ভুল সিদ্ধান্তে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে হারিয়ে যেতে পারত। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতা আমাদের স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হচ্ছিল না। আলোচনার নামে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা সময়ক্ষেপণ করে যাচ্ছিল আর পশ্চিম পাকিস্তান হতে সৈন্য ও অস্ত্র আনা হচ্ছিল বাঙালীদের দমন করতে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন। আমরা বাঙালীরা আশা করে আছি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। পাকিস্তান সরকার আর বিশ্ববাসীর ভাবনায়ও ছিল তাই। হয়ত পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তুতিও নেয়া ছিল স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গণহত্যা শুরু করার। এতে জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী পাকিস্তান সরকারের কোন অপরাধ হতো না। তখন বঙ্গবন্ধু হতেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে বিচক্ষণতার সঙ্গে সব দিক বিবেচনা করে তাঁর ভাষণের প্রতিটি শব্দ নির্ধারণ করতে হয়। সে ভাষণে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে বঙ্গবন্ধু তাই শোনালেন যা তারা শোনতে চেয়েছিল। বিশ্ববাসী দেখল নতুন এক জাতির সৃষ্টির মুহূর্ত। শাসকগোষ্ঠী নিষ্পলক চোখে চেয়ে দেখল পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ হওয়ার ক্ষণ। তাদের কিছুই করার ছিল না।

৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামে সফলতার নিয়ামক স্বরূপ। এই ভাষণ বাংলার আপামর জনতাকে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য উজ্জীবিত করে তোলে। পরবর্তীতে এই সাধারণ জনগণই দেশের জন্য হাসতে হাসতে জীবনদান করে। অন্যদিকে ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ববাসীর কাছে একটি স্বাধীন জাতির আগমনী বার্তা। প্রকৃত অর্থে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি অগ্নি পরীক্ষা। সাড়ে সাত কোটি বাঙালী আশা করে আছে নেতা আজ স্বাধীনতার ঘোষণা করবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে এর বাস্তবায়নের কথাও ভাবতে হয়েছে। একটি ভুল সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর স্বপ্নের সমাধি রচনা করতে পারে। শুধু তাই নয়, একটি ভুলের জন্য ৭ মার্চের পর আমরা হতে পারতাম পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা জাতি। হয়ত একদিন আমাদের সন্তানদেরও শিখাতে হতো ‘পাখির একটি বাসা থাকে, ঘোড়ার থাকে একটি আস্তাবল, কিন্তু বাঙালীর কোন স্বাধীন দেশ নেই।’ ৭ মার্চের ভাষণে একজন বিচক্ষণ বিচারক যেন প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করেছেন তাঁর বিবেকের দায়বদ্ধতা, বিচক্ষণতা আর একটি পরাধীন জাতির মুক্তির আকাক্সক্ষা থেকে। কারণ সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর মুক্তির আকাক্সক্ষা নিজ হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি বঙ্গবন্ধু। নীতির প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ছিলেন আপোসহীন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামেও বঙ্গবন্ধু একবারের জন্যও তাঁর নীতি থেকে সরে আসেননি। তাই তো সেদিন এক জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি নীতি এবং আদর্শের কথা এতটুকু ভোলেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব’। এ যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর কণ্ঠে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ। স্বাধীনতা আদায়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের সংগ্রাম ছিল ন্যায় এবং আদর্শের ওপর ভিত্তি করে। ৬৬ সালে ছয় দফা পেশ করা থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আদর্শ, নীতি, নৈতিকতা আর আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে শতভাগ ন্যায়সঙ্গত।

৭ মার্চের ভাষণেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি নির্দেশ এবং বাংলার মানুষের পক্ষে তাঁর প্রতিটি দাবি শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, আইনের আলোকেও ছিল বৈধ। ভাষণে দাবি আদায়ে যে আন্দোলনের ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু সেখানেও তিনি শ্রমজীবী স্বল্প আয়ের মানুষের কথা মাথায় রেখে কর্মসূচী ঘোষণা করেন। তিনি যদি নেতৃত্ব দেয়ার অবস্থায় নাও থাকেন তখন কি করণীয় ৭ মার্চের ভাষণে সে নির্দেশও দেয়া আছে। একজন বিচক্ষণ নেতা আন্দোলনকে সফল করতে নেতৃত্বের করণীয়, বিকল্প নেতৃত্ব এবং আন্দোলনের সর্বস্তরে সঠিক বিকল্প নির্ধারণ করে আন্দোলন পরিকল্পনা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণে এদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একজন সফল নেতার সব পরিকল্পনাই ছিল। এই ভাষণের পর পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ কার্যত একটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি বাকি ছিল, যা ২৬ মার্চে দেয়া হয়। সেক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু তাঁর নেতৃত্বের কারিশমা দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আগেই খবর পেয়েছিলেন ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হবে। বঙ্গবন্ধু যদি ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা করতেন অথবা অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হবে খবর পেয়ে ঢাকাবাসীর নিরাপত্তা বিবেচনায় অপারেশন শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেও স্বাধীনতার ঘোষণা করতেন তাহলে হয়ত আজও আমাদের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে যেতে হতো। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল স্বাধীনতার সেই ঘোষণা যা নিরস্ত্র বাঙালীকে স্বাধীনতা অর্জনে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে। আর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে আমরা বিশ্বে স্বাধীন একটি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। আমাদের বজ্রকণ্ঠ যেমন একটি কণ্ঠে উচ্চারিত সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর কণ্ঠ, তেমনি স্বাধীনতার ঘোষণাটিও সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর ঘোষণা। বাঙালী মানেই বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু মানেই সাড়ে সাত কোটি বাঙালী। বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালীকে পৃথক করা মানে দেহ থেকে আত্মাকে পৃথক করা। কারণ বাঙালীই বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব। তাই তো আজও বাঙালী স্বপ্ন দেখে আর ভাবে- যদি রাত পোহালেই শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই।

Check Also

মহামারিতে সুস্থ থাকুক কৃষি ও কৃষক

কামরুজ্জামান তোতা মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রতিদিনের তথ্য আমাদের হতভম্ব করে। একদিকে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, অন্যদিকে স্থবির জীবনব্যবস্থা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *