Home / বিশেষ প্রতিবেদন / আইপিও’র মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

আইপিও’র মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     পুঁজিবাজারের ক্রান্তিকালে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দায়িত্ব নেয়া অধ্যাপক খায়রুল হোসেন পুঁজিবাজারকে ক্রান্তিকালে রেখেই বিদায় নেন। তার নেতৃত্বাধীন কমিশন সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে দুর্বল কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন দিয়ে। এরপর তিনি বিদায় নিলে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। চেয়ারম্যান বদলালেও বদলায়নি দুর্বল কোম্পানিকে আইপিও অনুমোদন দেয়ার সংস্কৃতি।

নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৬টি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি কোম্পানির শেয়ার ইতোমধ্যে লেনদেন শুরু হয়েছে। একটি ছাড়া অন্য কোম্পানিগুলো শেয়ারের দাম ধরে রাখতে পারেনি। লেনদেনের শুরুর দিকে দাম অনেক বেড়ে গেলেও অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দামই সেখান থেকে অনেক কমে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক খায়রুল হোসেন টানা ৯ বছর দায়িত্ব পালন করে গত বছর বিদায় নেন। দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার মুখে পড়ে একপর্যায়ে আইপিও অনুমোদন দেয়াই বন্ধ করে দেয় তার নেতৃত্বাধীন কমিশন। করোনা মহামারির মধ্যে বিএসইসি থেকে বিদায় নেন খায়রুল হোসেন। তার আগেই ভয়াবহ ধস নামায় শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। এমন ক্রান্তিকালে তার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম।

তিনি দায়িত্ব নিয়ে টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকা শেয়ারবাজারের লেনদেন পুনরায় চালু  করেন। সেই সঙ্গে শুরু করেন নতুন কোম্পানিকে আইপিওতে নিয়ে আসা। এর আগে অনিয়ম করায় কয়েক ব্যক্তি ও বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের জরিমানাও করেন। এতে শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অনেক বিনিয়োগকারী আবারও আস্থা ফিরে পেয়ে বাজারে ফেরেন। আবার নতুন বিনিয়োগকারীও আসতে থাকে বাজারে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খায়রুল কমিশন সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়ে। নতুন কমিশনও আইপিও’র মান ভালো করতে পারেনি। তাদের অনুমোদন দেয়া কোম্পানিগুলোর মানও খুব একটা ভালো নয়। এ অবস্থায় আইপিও দেয়া বন্ধ করা যাবে না। পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে আইপিও প্রক্রিয়া চলমান রাখতে হবে। আইপিওতে যাতে ভালো কোম্পানি আসে সেজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগের কমিশনের মতো নতুন কমিশনও দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিচ্ছে। স্থির মূল্যে যেমন দুর্বল কোম্পানি আসছে, তেমনি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে অনেক কোম্পানি অতিরিক্ত দাম হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি কোটি কোটি টাকার ভুয়া ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বাবদ সম্পদ দেখিয়েছে এমন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে নতুন কমিশন। আবার এই কমিশনই সবচেয়ে বাজে অ্যাকাউন্টসের কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে। কোম্পানির অবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণেই লেনদেন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হচ্ছে।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজার ভালো রাখতে হলে আইপিও বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু একের পর এক দু্র্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়া হলে তা বাজারের জন্য ভালোর বদলে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। নতুন কমিশনের উচিত দুর্বল কোম্পানির বদলে ভালো কোম্পানি যাতে আইপিওতে আসে সে ব্যবস্থা করা।

নতুন কমিশনের আইপিও অনুমোদন দেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বশেষ লেনদেন শুরু হয়েছে এনআরবিসি ব্যাংকের। আইপিওতে ১০ টাকা করে শেয়ার বিক্রি করা এই ব্যাংকটির শেয়ার দাম লেনদেনের প্রথম দিনই ১৫ টাকায় উঠে যায়। ২৪ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ার দাম কমে ১১ টাকা ৬০ পয়সায় নামে।

শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন থেকে আইপিও অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখনো পর্যন্ত সব থেকে বেশি সমালোচনা হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি রবিকে নিয়ে। মাত্র ৪ পয়সা শেয়ারপ্রতি আয় নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এ কোম্পানিটি প্রথম বছরের বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য এ কারণে কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষকে ডেকে অসন্তোষও প্রকাশ করেছে বিএসইসি।

নতুন কমিশন থেকে আইপিও অনুমোদন পাওয়া আরেক কোম্পানি এনার্জিপ্যাক পাওয়ার। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে টাকা তোলা এই কোম্পানিটি আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করে ৩৫ টাকা করে। কোম্পানিটির বিডিংয়ে কিছু যোগ্য বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দরপ্রস্তাব করার অভিযোগ ওঠে। অবশ্য অতিরিক্ত দরপ্রস্তাব করায় কিছু বিনিয়োগকারীকে শাস্তির আওতায় আনে বিএসইসি। শাস্তি হিসেবে তারা একটি করে কোম্পানির আইপিও আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

jagonews24

বিডিংয়ের সময় সমালোচনার মুখে পড়া এই কোম্পানিটির শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরুর পরও বিনিয়োগকারীদের খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না। লেনদেনে শুরুর প্রথমদিকে কোম্পানিটির শেয়ার দাম টানা বেড়ে ৩৫ থেকে ৯২ টাকা ৬০ পয়সায় উঠে যায়। অবশ্য এরপর ধারাবাহিকভাবে দাম কমতে কমতে ২৪ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ার দাম ৪৩ টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় ইস্যু মূল্যের কাছাকাছি চলে এসেছে এ কোম্পানিটির শেয়ার দামও।

বর্তমান কমিশন থেকে আইপিও অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে সব থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে ওয়ালটন হাইটেক। ৩১৫ টাকা করে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দাম এখন (২৪ মার্চ) ১ হাজার ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অবশ্য আইপিওতে মাত্র ১ শতাংশের কম শেয়ার ছাড়ায় এ কোম্পানিটি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

নতুন কমিশন থেকে আইপিও অনুমোদন নিয়ে শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু করা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ডমিনেজ স্টিল, এসোসিয়েটেড অক্সিজেন, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, লুব-রেফ , মীর আখতার, ই-জেনারেশন এবং তৌফিকা ফুড। লেনদেনের শুরুতে এ কোম্পানিগুলোর সবকটির শেয়ার দাম বাড়ে, তবে পরবর্তীতে একটি কোম্পানিও সেই দাম ধরে রাখতে পারেনি।

১০ টাকার ডমিনেজ স্টিলের শেয়ার  দাম প্রথমদিকে বেড়ে ৪৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। এরপর দফায় দফায় কমে এখন ২০ টাকা ৩০ পয়সায় নেমে এসেছে। ১০ টাকার এসোসিয়েটেড অক্সিজেনের শেয়ার দাম ৬৫ টাকা ৬০ পয়সা হওয়ার পর এখন ৩৫ টাকা ৬০ পয়সায় নেমে এসেছে। ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দাম ৫৩ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ৩৪ টাকা ৭০ পয়সায় নেমে এসেছে।

৩০ টাকা কাট অফ প্রাইস নির্ধারণ হওয়া লুব-রেফ’র শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৩৬ টাকা ৮০ পয়সায়। অবশ্য কোম্পানিটির শেয়ার দাম ৬০ টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। কাট অফ প্রাইস ৬০ টাকা নির্ধারণ হওয়া মীর আখতারের শেয়ার দাম এখন লেনদেন হচ্ছে ৬৭ টাকা ৩০ পয়সায়। লেনদেনের প্রথম দুইদিন দাম বেড়ে এ কোম্পানিটির শেয়ার দাম ১০০ টাকা ২০ পয়সায় উঠেছিল। ১০ টাকার ই-জেনারেশনের শেয়ার দাম ৩৯ টাকা ৪০ পয়সায় উঠে আবার ২৭ টাকা ২০ পয়সায় নেমে এসেছে। আর ১০ টাকার তৌফিকা ফুডের শেয়ার দাম  ২৫ টাকায় উঠে ২১ টাকা ৩০ পয়সায় নেমেছে।

এদিকে বর্তমান কমিশন থেকে আইপিও অনুমোদন পেয়েছে, কিন্তু এখনো লেনদেন শুরু হয়নি এমন কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- সোনালী লাইফ, এএফসি হেল্থ, দেশ জেনারেল, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার এবং ইনডেক্স অ্যাগ্রো। এ কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ নিম্নমানের বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান কমিশনের আনুমোদন দেয়া কোম্পানিগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘পৃথক পৃথক কোম্পানির মান নিয়ে আমার খুব একটা জানা নেই। তবে লেনদেনের শুরুতে দাম বাড়ার পর আবার দাম কমে যাওয়ার জন্য কোম্পানির মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও দায় আছে। নতুন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন শুরু হলেও আমাদের বিনিয়োগকারীরা মান যাচাই না করেই তা কেনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ কারণে প্রথমে দাম বেড়ে যায় এবং পরবর্তীতে দরপতন হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, এর পেছনে বেশকিছু কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো- কোম্পানিগুলো পারিবারিক আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। তাছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে আসতে হবে। নিয়মিত এজিএম করতে হবে এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। এসব কারণে ভালো কোম্পানিগুলো তালিভুক্ত হতে চায় না। তবে ভালো কোম্পানিকে আইপিওতে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএসইসির উচিত তাদের ভালো প্রিমিয়াম দেয়া।’

এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান কমিশনও আইপিও’র মান ভালো করতে পারেনি। তবে ভালো আইপিও না আসলেও আইপিও বন্ধ রাখা যাবে না। পুঁজিবাজার ও বিনিযোগকারীদের স্বার্থে আইপিও চলমান রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএসইসির উচিত ভালো মানের আইপিও আনার ব্যবস্থা করা। ভালো মানের আইপিও আসলে বাজারের গভীরতা বাড়বে। আর ভালো মানের আইপিও আনতে গেলে ট্যাক্স বেনিফিট দিতে হবে। সে জন্য তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যকার কর হারের পার্থক্য আরও বাড়াতে হবে।’

Check Also

ভাড়ায় নেয়া গাড়ি বেচে দিলেন সাড়ে ১০ লাখ টাকায়

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী মো. আলালের কাছ থেকে গত বছরের অক্টোবরে ১০টি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *