Home / উপ-সম্পাদকীয় / শেখ হাসিনাই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কারিগর

শেখ হাসিনাই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কারিগর

তাপস হালদার

আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতার একযুগ পূর্তি। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করে টানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে ‘রূপকল্প-২০২১’ একটি সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিন বদলের সনদ জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। এই একযুগে বাংলাদেশ রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়ন করে ভিশন-২০৪১, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাফল্যের মূলে রয়েছে শেখ হাসিনার ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা ছিল নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার। এটি সম্পূর্ণ করা ছিল সরকারের কাছে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর চাপ থাকা সত্ত্বেও শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে। কলঙ্কমুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদেরও বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে।

টানা এক যুগে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোতে হয়েছে সরকারকে। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠীর নানাবিধ ষড়যন্ত্র, হরতালের নামে জ্বালাও-পোড়াও, বিডিআর বিদ্রোহ, হোলিআর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলাসহ নানাবিধ ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই পথ চলতে হচ্ছে। শতবাধা অতিক্রম করে দেশরত্ন শেখ হাসিনার দৃঢ়নেতৃত্বে দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদু্যৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নসহ সব ক্ষেত্রেই অসামান্য সাফল্য এসেছে।

বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় প্রবেশ করেছে ২০১৫ সালেই। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ২০০৫-০৬ সালে ৫৪৩ ডলার মাথাপিছু আয় থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২০৬৫ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। জিডিপি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এসেছে বিস্ময়কর সাফল্য। বর্তমান অর্থবছরে জিডিপি ৮ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রতিমাসেই রেকর্ড হচ্ছে, সর্বশেষ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ বিলিয়ন ডলার।

এক সময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশের কাতারে শামিল হয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী কৃষিনীতির কারণে খাদ্য সংকট দূর হয়েছে। উন্নত শস্যবীজ, সুলভমূল্যে সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ বিতরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের ফলে কৃষিজাত পণ্যের ক্ষেত্রে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ধান উৎপাদনে তৃতীয় স্থান, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় ও রপ্তানিতে প্রথম, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ, আম উৎপাদনে সপ্তম ও মৌসুমি ফল উৎপাদনে দশম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে মেগাপ্রকল্প। পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। নদীর দুই প্রান্ত মাওয়া ও জাজিরাকে সংযুক্ত করেছে মূল সেতু। যখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী, তখন অনেকেই অবাস্তব বলে সমালোচনা করেছিলেন। সেই পদ্মা সেতু এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তৈরি হচ্ছে পারমাণবিক বিদু্যৎকেন্দ্র। পাবনার রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদু্যৎকেন্দ্রটি চালু হলে বিদু্যতের ক্ষেত্রে বৈপস্নবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। এছাড়া রামপাল বিদু্যৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদু্যৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ, চট্টগ্রাম-রামু হয়ে মিয়ানমারের ঘুমধুম পর্যন্ত রেলসংযোগ, দেশের জাতীয় সড়কগুলোকে চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন হয়ে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্স্নোগানকে সামনে রেখে তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী পদক্ষেপ, যার সুফল পাচ্ছে দেশের সমগ্র জনগণ। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন, মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম, ইউনিয়ন ডিজিটাল তথ্যসেন্টার স্থাপন, তিন সহস্রাধিক ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড সংযোগ, তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জাতীয় ওয়েব পোর্টাল, সরকারিই-টেন্ডিরিং ও ই-জিপিচালু, সেবা প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য ই-পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং, চালু করা হয়েছে। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ডিজিটাল জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম চালু হয়েছে ই-পার্সপোট। ১৫ কোটির বেশি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটিরও বেশি। ফোরজি প্রযুক্তির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ফাইভজি চালুর উদ্যোগ চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। গত এক দশকে শুধু এ খাতেই কর্মসংস্থান হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের। আগামী পাঁচবছরে আরো ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আউটসোর্সিং খাতে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৭৩ কোটি টাকা। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ বরাদ্দের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকায়। যা মোট বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ। বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, স্বামীপরিত্যক্ত ও দুস্থ মহিলাভাতা, প্রতিবন্ধীভাতা, মাতৃকালীন ভাতা, হতদরিদ্র, ছিন্নমূলসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আনা হয়েছে। দেশের ভূমিহীন, গৃহহীনদের বাসস্থান নিশ্চিতকরণের জন্য নেওয়া হয়েছে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ ও আশ্রায়ন প্রকল্প।

বর্তমান সরকারের আমলে কোন রকম সংঘাত ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রবিজয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যালমাইল এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যালমাইল এলাকা পর্যন্ত এখন বাংলাদেশের মালিকানা। এখানের সমুদ্রের তলদেশ কিংবা উপরিভাগে একছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে যে ছিটমহল সমস্যা ছিল সেটা বাস্তবায়নও ছিল একটা বিরাট অর্জন। দীর্ঘ ৬৮ বছর পর ১১১টি ছিটমহল ভারতের কাছ থেকে ফিরে পায় বাংলাদেশ। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচু্যৎ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটির’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি খাতকে সহায়তা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেরা অবস্থানে আছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে এশিয়ার ‘এমার্জিং টাইগার’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

করোনা মহামারি মোকাবিলায় বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশগুলো যখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছিল তখনো দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাংলাদেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে শুধু মুক্তই করেননি, নিরাপদ দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্য শীর্ষে রেখেছেন। এখনো বাংলাদেশে যে কোনো দেশের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃতু্যহার অনেক কম। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও এশিয়ার মধ্যে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এটা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে। সারাবিশ্ব লকডাউনে যখন কার্যত অচল হয়ে গিয়েছিল তখন প্রধানমন্ত্রী জীবন ও জীবিকাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে যে পলিসি গ্রহণ করেছিলেন তারই সুফল পেয়েছে বাংলাদেশ। একদিকে জীবিকাকে সচল রেখে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখা অন্যদিকে আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বৈশ্বিক করোনাকালে দেশরত্ন শেখ হাসিনার পদক্ষেপ জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বারবার প্রসংশিত হয়েছে।

‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’ বিশ্বের পাঁচজন সৎরাষ্ট্র প্রধানদের যে তালিকা করেছে সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম রয়েছে তৃতীয় স্থানে। টাইম ম্যাগাজিন বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ শীর্ষ নারী তালিকায় মনোনয়ন দিয়েছেন শেখ হাসিনাকে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ‘খালিজ টাইমস’ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার জন্য ‘নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট’ বা পূর্বের নতুন তারকা হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছে। ইউনেস্কো ‘শান্তির বৃক্ষ’, ওমেন ইন পার্লামেন্টস গেস্নাবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ‘রিজিওনাল লিডারশিপ’ পুরস্কার, জাতিসংঘ ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত করেন। এছাড়া কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

বাংলাদেশ এক সময় ছিল দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারই সেই বদনাম ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছেন মর্যাদার আসনে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ আজ অপার সম্ভাবনার নাম।

নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান তৈরি, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাতৃ ও শিশু মৃতু্যহার কমানোসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব সূচকেই ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। এত সবকিছু অর্জনের মূলে যিনি রয়েছেন তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনিই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কারিগর।

Check Also

ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য

মোহাম্মদ আবদুল গফুর আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন এক অনন্য স্থান অধিকার করে রয়েছে। বৃটিশ-শাসিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *