Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে

আফতাব চৌধুরী

কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের ভিত্তি অবশ্যই কৃষি। এদেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকে উপেক্ষা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। কৃষি উন্নয়নে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রসরতার তাগিদে আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা। জনবিষ্ফোরণ ও ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যার প্রেক্ষাপটে স্ব-নির্ভরতা জরুরি। কৃষি ক্ষেত্রে চাপ বাড়ছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা কৃষির মান উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তিবিদ্যায় সফলতা ও সুফলকে কাজে লাগিয়ে দেশের অনেক শিক্ষিত বেকার আজ স্বাবলম্বী, প্রতিষ্ঠিত ও সফল। বেকারত্ব দূর করতে চাকরির মোহ ত্যাগ করে তারা কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে নিজেদের নিয়োজিত করে চলেছে।

আজকাল অনেক শিক্ষিত যুবক-যুবতী সরকারি চাকরির পিছনে ছুটে ক্লান্ত। তারা অনেকেই ভুলে যায়, শিক্ষা শুধু চাকরির ভিত নয়, শিক্ষা জীবনের আলো। শিক্ষিত সমাজ ভুলে যায় সীমিত সরকারি ব্যবস্থায় অজস্র চাকরি প্রদান অসম্ভব। অজস্র চাকরি প্রার্থীর ভিড়ে তাই সরকার দিশেহারা এবং সরকারী আমলাদের কেউ কেউ প্রার্থীদের প্রতিযোগিতার সুযোগে দুর্নীতিপরায়ণ। ফলে, প্রতিযোগিতার তলে তলে দুর্নীতি বাড়ছে। সমাজ অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। যুবক-যুবতীরা ক্লান্তিতে ভুগছে। অর্থনৈতিক সংস্কারে এক বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিযোগিতার রেশ ক্রমে আলস্য, জিঘাংসা, হিংস্র লালসায় রূপ নিচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়ায় সমাজে চোরাকারবার, কালো টাকা, চরম পন্থা এবং শোষণ ও অত্যাচার মাথাচাড়া দিচ্ছে। এসব নিশ্চয় সভ্যতার পথে অশনি সংকেত। বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা তাই আজ একান্ত জরুরি।

এখন দেশের কৃষি, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। দেখা যায়, দেশের গ্রামে-গঞ্জে জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি এবং কৃষিক্ষেত্রে তার প্রভাব যথেষ্ট। শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কৃষিতেও সর্বাত্মক তৎপরতায় উন্নয়ন জরুরি। নানা সমস্যা, ব্যর্থ রাজনীতি, সরকারি ভ্রান্তনীতি নানা প্রতিকূলতা প্রভৃতি আমাদের অর্থনীতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবিলা করে কৃষিতে আঁকড়ে থাকাই আমাদের প্রধান ভরসা। সুতরাং, কৃষিক্ষেত্রে অবাধ যোগদান নিশ্চয়ই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে।

ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার জীবনমানের দিকে তাকানোর ফুরসৎ আপাতত আমাদের নেই। আমাদের উন্নয়নের পটভূমি কৃষিভিত্তিকই তৈরি করতে হবে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার ২ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ কৃষিজীবি, অন্যদিকে আমাদের দেশের ৭০ শতাংশই কৃষিজীবী। আকাশ-পাতাল তফাৎ। এ ধ্রুবসত্যকে উপেক্ষা করা যায় না। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ববহ। পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের এখন মাঠে নামতে হবে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা অর্থনীতি উদ্ধারে নিবেদিত হতে হবে। কৃষিক্ষেত্র থেকে মুখ না ফিরিয়ে নিজ অধিকার বলে ‘হরির লুট’-কে নিয়ন্ত্রণ করে স্বনির্ভর হতে হবে। কৃষির উন্নতিতেই গ্রামীণ স্ব-নির্ভরতা এবং গ্রামীণ স্ব-নির্ভরতাতেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ। বিভিন্ন পরিকল্পণায় সরকার কৃষির উন্নয়নে যতটুকু গুরুত্ব দিয়ে চলেছে তারও মনিটরিং দরকার। কোথায়, কী বাবদ, কত টাকা মঞ্জুর হচ্ছে, কিভাবে খরচ হচ্ছে শিক্ষিত সমাজকে তার খতিয়ান রাখতে হবে এবং নিঃস্বার্থ সেবায় তা পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি গ্রামে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের ভূমিকাও অপরিসীম। সংবাদ মাধ্যমে যেন রাজনৈতিক নেতাদের কেচ্ছাকাহিনীর পাশাপাশি সরকারি সব ব্যবস্থার স্বচ্ছ তালিকা সর্বদা যথাযথ ও নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় সে ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে লাখ লাখ অর্ধাহারি, অনাহারি মানুষের মৌলিক চাহিদার দিকে প্রথম তাকানোর আবশ্যকতা রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি নিতান্ত পিছিয়ে নেই। দেশের অর্থনীতি এবং আপাত শান্তির বাতাবরণ গ্রামীণ অর্থনীতির উপরই টিকে রয়েছে। প্রয়োজন আরো গতি সঞ্চার। জনবিষ্ফোরণ এবং অপরিকল্পিত শিক্ষা পদ্ধতি, দুর্নীতি এবং ভ্রষ্টাচারের সুযোগে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। এক্ষেত্রে কৃষি এবং কৃষিসম্বন্ধীয় বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আধুনিকতার পরশে চিরাচরিত দেশীয় জীবনযাত্রার মৌলিকতা সুরক্ষিত রেখেও নতুন দিশার সূচনা করতে পারে। হস্তশিল্প, বয়ন শিল্প, খাদি ও গ্রামোদ্যোগ আমাদের অনেক উন্নতি ঘটাতে পারে। মৎস্য চাষ, ফুল চাষ, পাট চাষ, পান চাষ, পশুপালন, দুগ্ধ প্রকল্প, ইক্ষু চাষ এবং তদসঙ্গে চা শিল্প ও কাগজ শিল্প আমাদের অর্থনীতিকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আরো অবাধ যোগদান এবং পরিকল্পিত অবস্থান শিক্ষিত যুবক-যুবতীকে শিক্ষার আলোয় নিঃসন্দেহে স্ব-নির্ভরতা দিয়ে আমাদের আরো উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে। শিক্ষা পদ্ধতিকে সে ধরনের কর্মমুখী করার উদ্দেশ্য নিয়ে সংস্কার করতে হবে।

পাহাড়িদের জুম চাষ আমাদের অর্থনীতিতে যথেষ্ট সমাদৃত। এসব ক্ষেত্রে তাদেরও উন্নত চিন্তাধারা এবং সহযোগিতার প্রয়োজন। বনজ সম্পদের অবাধ ধ্বংস রোধ করে জুম চাষির চাষ ক্ষেত্রকে উন্নত প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সরকারি সহযোগিতা ও অনুদানের প্রয়োজন এবং সেটি সুনিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে উপযুক্ত বাজার ও পথঘাটের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান বেকার সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে। আর সেজন্য অর্থনৈতিক প্রগতিতে আনতে হবে বাস্তবমুখী ও উৎপাদনমুখী পদক্ষেপ।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান চিরন্তন। যাযাবর জীবনের অবসানে কৃষি সভ্যতার গোড়াপত্তনেও নারীর অবদান সর্বজনস্বীকৃত। আমরা বাংলাদেশি নারীকে ‘ঘরের লক্ষ্মী’ বলে জানি। বাস্তবে নারী দূরদর্শী ও অধ্যবসায়ী। আদর্শ সমাজ গঠনে অগ্রদূত। কৃষি সভ্যতার এ দেশে গ্রামীণ মহিলারা পুরুষের কর্মক্ষেত্রের নিত্য অনুসঙ্গী। পশুপালন থেকে আরম্ভ করে চাষাবাদ এবং দ্রব্যের বাজারীকরণ সর্বত্রই নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগদান গ্রামীণ জনজীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এক কথায়, গ্রামীণ অর্থনীতিনির্ভর দেশীয় অর্থনীতিতে এবং সমাজ জীবনে নারীর অবদান ও ভূমিকা অপরিমেয়। যে জাতির নারীরা যত উন্নত মানসিকতায় সমুন্নত সে জাতির অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক ভারসাম্য তত বেশী সুরক্ষিত।

আমাদের এতদঞ্চলের কৃষিক্ষেত্রে অনেক মহিলা ও যুবতীদের প্রত্যক্ষ অবদান চোখে পড়ার মতো। তারাই মাঠে বর্ষাকালীন শস্য থেকে রবিশস্য উৎপাদনের সময় পর্যন্ত নিরলস সহায়তা করে যায়। গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সিংহভাগই মহিলাকেন্দ্রিক ও মহিলানির্ভর। তবে অর্থনৈতিক সংস্কারকদের একটি ব্যাপারে সচেতন হতে হবে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও যোগদান আনুপাতিক হারে সর্বাধিক হলেও মধ্যবিত্ত ও তদুর্ধস্তরের মহিলারা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের যোগদানের সুযোগ থাকলেও তাদের সিংহভাগই কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিযুক্ত নন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে মহিলাদের শ্রম বিমুখতাও দেখা যায়।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে মেয়েদের অবাধ ও নির্ভয়ে যোগদান আমাদের অর্থনীতিকে শুধু চাঙ্গা করবে না বরং এক মজবুত আর্থ-সামাজিক পরিবেশের সূচনাও ঘটাবে। ফলে নারীরা শুধু বোঝা হবে না বরং সমাজের এ অর্ধাংশের যোগদানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নারী মুক্তিকে সুনিশ্চিত করবে। এক্ষেত্রে উপজাতি মহিলা, চা-শ্রমিক মহিলা, মণিপুরী জনগোষ্ঠীর মহিলারা আমাদের আদর্শ প্রেরণা হতে পারে। আমাদের গ্রামীণ অর্থনৈতিক তাগিদে নারীদের আরো সক্রিয় হতে হবে এবং তাদের প্রতি সমাজ ও সরকারের আরো সহায়তা দান করতে হবে। তাদের প্রেরণায় সমাজের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর নারীরা আরো তৎপর হয়ে উঠবে। শুধু হস্ত বা বয়ন শিল্প নয়, কৃষিভিত্তিক প্রতিটি অর্থনৈতিক উৎসেই নারীর অবদান বেশি। সুপরিকল্পিত অবাধ যোগদানে নারীদের আরো নিষ্ঠা নিয়ে এগিয়ে আসার প্রতীক্ষায় সমাজ।

Check Also

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে পূর্ণতা পায় স্বাধীনতা

মোনায়েম সরকার ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার কিছুক্ষণ পরেই পাকিস্তানি বাহিনীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *