Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / জলবায়ুর পরিবর্তন ও কৃষির ওপর প্রভাব

জলবায়ুর পরিবর্তন ও কৃষির ওপর প্রভাব

ফুয়াদ হাসান

পরিবর্তন বলতে সাধারণত এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় ধাপিত হওয়াকে বুঝায়। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত শব্দের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু বলতে সাধারণত কোনো স্থানের দীর্র্ঘ সময়ের গড় আবহাওয়াকে বুঝায়। আর আবহাওয়া বলতে কোনো স্থানের দৈনন্দিন অবস্থাকে বুঝায়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠে প্রতিনিয়ত নানামুখী পরিবর্তন হচ্ছে। ইন্টার গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) তথ্য মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই-ই বাড়বে এবং অসম বৃষ্টিপাত হবে। বিশ্ব গড় তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে ফসল উৎপাদন, পানির প্রাপ্যতা, জীববৈচিত্র্য, তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস, বরফগলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রভাব পড়বে। বিশ্বে গড় তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা একবিংশ শতাব্দীর শেষে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে ও বিশ্ব পানিচক্রে অসমতা পরিলক্ষিত হবে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকট সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত গেস্নাবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইন্ডেক্স অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় শীর্ষেই রয়েছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষাটি ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৩টি দেশের ওপর চালানো হয়। ওই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৭ ও ২০০৮ সালের রিপোর্টেও বাংলাদেশকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উলেস্নখ করেছিল। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২১০০ সাল নাগাদ সাগর পৃষ্ঠ সর্বোচ্চ ১ মিটার উঁচু হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৩ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা, টর্নেডো, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। যার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে কৃষি খাত। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান আসে কৃষি খাত থেকে। বিবিএস ২০১৪-১৫ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ১০ লাখ এবং প্রতি বছর নতুন করে ২০ লাখ লোক মোট জনসংখ্যায় যোগ হচ্ছে। ২০৪৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১.৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২২.৫ কোটি হবে। এদিকে আমাদের কৃষিব্যবস্থা এখনো সনাতনী ও প্রকৃতি নির্ভর। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তীর্যকভাবে পড়ছে আমাদের কৃষির ওপর। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এ দেশে ছোট ও বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও কালবৈশাখীর সংখ্যা ১৬৭টি, তার মধ্যে ১৫টি ছিল ভয়াবহ। এতে সম্পদের ক্ষতি হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের বন্যায় ৩২৫.৯ মিলিয়ন ডলার, ২০০৪ সালের বন্যায় আউশ ও আমন ফসলের ৪৩৫.৮৯ মিলিয়ন ডলারের খাদ্যশস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ১৯৮৮ সালে বন্যায় খাদ্যশস্যের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ টন। ২০০৭ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের প্রভাবে উপকূলের ১৮৬,৮৮৩ হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণভাবে, ৪৯৮,৬৪৫ হেক্টর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়- যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের কৃষি জমির শতকরা ৩০ ভাগ উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় ২.৫৮ মিলিয়ন ২৮.৫ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে ০.৮৩ মিলিয়ন ৮.৩ লাখ হেক্টর জমিই লবণাক্তায় আক্রান্ত। গত চার দশকে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্তার মাত্রা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। আর গত এক দশকে এর মাত্রা বেড়েছে ৩.৫ শতাংশ। ১৯৯০ সালে দেশে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৮,৩০,০০০ হেক্টর আর ২০০১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০,৫০,০০০ হেক্টরে। আমাদের দেশে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৩০০ মি.মি. এবং এলাকাভেদে ১২০০ মি.মি. (দক্ষিণ-পশ্চিম) থেকে ৫০০০ মি.মি. (উত্তর-পূর্বাঞ্চল)। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৩০ সালে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০-১৫ শতাংশ এবং ২০৭৫ সালে প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি বন্যাকবলিত হয়। বর্তমানে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার জমি অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যার শিকার হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নষ্ট হয়- যা দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য সংকটের কারণ। এদিকে প্রতি বছর ৩০-৪০ লাখ হেক্টর জমি খরায় আক্রান্ত হয়। আশঙ্কা করা হয়, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রি, ২০৫০ সালে ১.৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে- যা দেশের কৃষি খাতের জন্য অশুভ বার্তা। ধানের ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে গেলে চিটার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে- যা ধানের ফলনকে কমিয়ে দেয়। ধানের কাইচ থোড় আসার পরপরই রাতের তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে এবং এ অবস্থা ৪/৫ দিন অব্যাহত থাকলে ধান আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে চিটা হওয়ার আশংকা থাকে। বর্মান তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে গম চাষ অসম্ভব হয়ে পড়বে। অতি মাত্রায় উষ্ণতা ও শৈত্য প্রবাহের ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত রোগবালাই বৃদ্ধি পায়।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সার্ভিসের তথ্য বলছে, ১৯৭৩-২০০৮ সাল পর্যন্ত ভোলা জেলার মূল ভূখন্ড থেকে ২৪০ বর্গকিলোমিটার এবং হাতিয়ার মূল ভূভাগ থেকে ১৫০ বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শস্যের নিম্ন গুণমান, উৎপাদনের নিম্নমান,পানির স্বল্পতা, জমির অনুর্বরতা ও নতুন নতুন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। ফলে কৃষিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের প্রয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ। আমাদের দেশের সিংহভাগ কৃষক অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষত, ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না নিজেদের। যে কোনো সমস্যায় জৈবিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির পরিবর্তে দারস্থ হচ্ছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর আধুনিক কীটনাশকের। বিভিন্ন কীটনাশক প্রস্তুত ও বাজারজাত কারক প্রতিষ্ঠান তাদের চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কৃষকদের বুঝাচ্ছে তাদের পণ্যেই উদ্ভূত সমস্যার উত্তম সমাধান। এদিকে কৃষকরা না বুঝে সহজলভ্য কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ করছে- যা প্রকৃতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং অধিক ব্যয়বহুল। এমনিতেই আমাদের দেশের সিংহভাগ কৃষক দরিদ্র, তারা অন্যের জমি বর্গা চাষ করে। শুধু তাই নয়, ফসল রোপণ থেকে কর্তন পর্যন্ত সব ব্যয় নির্বাহের জন্য অন্যের দারস্থ হতে হয়। ফলে চড়াসুদ গুনতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। তার ওপর ব্যয়বহুল কৃষি উৎপাদন তাদের মেরুদন্ড ভেঙে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় পরিবেশবান্ধব জৈবিক পদ্ধতি-ই শ্রেয়। আর তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। মোট দেশজ উপাদান (জিডিপি)-তে কৃষি খাতে অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়াও এ খাতে নিয়োজিত রয়েছে বিপুল পরিমাণ কর্মঠ মানুষ। শিল্পের এই যুগে কৃষি খাতে গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বহুগুণ বেড়েছে। কারণ শিল্পের কাঁচামালের মূল উৎস এই কৃষি খাত। উৎপাদন খাত আমাদের মতো দেশের অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা করোনা মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সুতরাং, কৃষি খাতকে ছোট না ভেবে বরং উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে সব স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই শ্রেয়। সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমাদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে। কৃষি উৎপাদনে অধিক কীটনাশকের ব্যবহার ও ব্যয় হ্রাস করতে কৃষকদের পরিবেশবান্ধব জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহী করতে হতে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের এগিয়ে আসতে হবে, কৃষকদের সঙ্গে উঠোন বৈঠক বা সরাসরি মাঠে গিয়ে হাতে কলমে দীক্ষা দিতে হবে। কৃষি উৎপাদন এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনে বাধা প্রদান করতে হবে, এটা একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ। কীটনাশক প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠান বাজার দখলদারি মনভাব পরিহার করে কৃষক ও পরিবেশবান্ধব হতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না কৃষক টিকে থাকলে ব্যবসাও টিকে থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিনিয়ত কৃষি উৎপাদনে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, এসব সমস্যা সমাধান ও প্রতিহত করতে উচ্চমানের গবেষণা বৃদ্ধি করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষি উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কৃষকদের অভিযোজন কৌশল ও পরিবেশবান্ধব জৈবিক উৎপাদন কৌশলে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এ কাজে সরকারি ও বেসরকারি সবাইকে কাজ করতে হবে যৌথভাবে।

সর্বোপরি একটি কথা বলতেই হবে কৃষি বাঁচলে, বাঁচবে দেশ, সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা।

Check Also

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে পূর্ণতা পায় স্বাধীনতা

মোনায়েম সরকার ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার কিছুক্ষণ পরেই পাকিস্তানি বাহিনীর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *