Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা

সালাম সালেহ উদদীন

সামনে শীত মৌসুম। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীও সতর্ক করে দিয়েছেন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য মাঠ প্রশাসনকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসন সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। শীতকালে ঠান্ডাজনিত রোগের কারণে করোনা সংক্রমণ বাড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে মৃতু্যর হারও বাড়বে।

ইতোমধ্যে ইউরোপে নতুন করে প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির মধ্যদিয়ে বিশ্বব্যাপী একদিনে রেকর্ড সংখ্যক নতুন করোনা রোগী বেড়েছে। শনিবার প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে চার লাখের বেশি কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। প্রথমদিকে প্রাদুর্ভাব সফলভাবে সামাল দিলেও সম্প্রতি ফের করোনাভাইরাসের উপকেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইউরোপ। মহাদেশটিতে গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। একক অঞ্চল হিসেবে ইউরোপে প্রতিদিন ভারত, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এখন বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০০ জন আক্রান্তের মধ্যে ৩৪ জনই ইউরোপীয় দেশগুলোর বাসিন্দা। প্রতি ৯ দিনে সেখানে ১০ লাখ নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপে এ পর্যন্ত ৬৩ লাখের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপের নতুন আক্রান্তদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, নেদারল্যান্ড ও স্পেনেই প্রায় অর্ধেক রোগী শনাক্ত হয়েছে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮০ লাখ ৭৬ হাজার ১০৩ জন আক্রান্ত নিয়ে এবং ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৬৯ মৃতু্য নিয়ে উভয় তালিকায় শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ৭৪ লাখ ৩২ হাজার ৬৮০ জন আক্রান্ত নিয়ে এ তালিকায় বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে আছে ভারত। সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি মাসে ভারতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। তারপরেও ভারত এক মাসের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষে চলে যেতে পারে আক্রান্তের দিক থেকে। আক্রান্তের তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ব্রাজিলে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা ৫২ লাখ ৩০০ ছাড়িয়েছে। দেড় লাখেরও বেশি মৃতু্য নিয়ে এ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই আছে দেশটি। আশার কথা সে তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটাই ভালো। যদিও দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একদিনে আরও ১৪ জনের মৃতু্য হয়েছে, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে গত ১৭ মে ১৪ জনের মৃতু্যর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর চেয়ে কম মৃতু্যর খবর এসেছিল ১২ মে, সেদিন ১১ জনের মৃতু্যর তথ্য দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৪ কোটি পেরিয়ে গেছে; মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ১১ লাখ ১৯ হাজারের ঘরে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে সপ্তদশ স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩১তম অবস্থানে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানে শনাক্ত রোগীর সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশে অনেক কম। বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন। আর মারা গেছে ৫ হাজার ৬৮১ জন।

এটা সত্য, সারা বিশ্বই এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি। মহামারি করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিও টালমাটাল। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রত্যেকটি খাত। মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাও ব্যাহত হয়েছে। অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছে। অনেকেই সংসার চালাতে পারছে না। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের আরও একটি প্রবাহ অর্থাৎ দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আসন্ন শীত মৌসুমে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে- জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কার পর তা মোকাবিলায় গত সেপ্টেম্বরে এর রোডম্যাপও তৈরি করা হয়েছে। রোডম্যাপ তৈরি করা হলেও তা কার্যত নথিবন্দি হয়ে আছে। আগাম প্রস্তুতি নাজুক হলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ড ওয়েভ সামলানো কঠিন হবে। এতে সংক্রমণের সঙ্গে পালস্না দিয়ে মৃতু্যর সংখ্যাও বাড়বে। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন। দেশের প্রতিটি জেলা প্রশাসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার। উলেস্নখ্য, সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলার রোডম্যাপে ১৫টি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকরা ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। তাদের একটি কঠোর সিদ্ধান্ত হচ্ছে সরকারি সেবা নিতে হলে মাস্ক পরা ছাড়া কেউ আসতে পারবে না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আবারও সবাইকে মাস্ক পরার আহ্‌বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ঘরের বাইরে সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জোর দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ব্যাপারে সবার সচেতন হওয়া জরুরি।

সারা বিশ্বে মহামারি হয়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনের চেয়েও সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হলো মাস্ক ব্যবহার করা। কারণ করোনাভাইরাস মূলত বাতাসে ড্রপলেটস বা মুখ থেকে নিঃসৃত মিহি জলকণার মাধ্যমে ছড়ায়। আর মাস্ক ব্যবহার করলে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় বলে নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে। গবেষকরা ইতালি ও নিউইয়র্কে করোনা রোধে মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করার আগে ও পরের করোনা সংক্রমণের হারের তুলনা করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, দুই জায়গায়ই মানুষ বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহারের পর থেকে সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। মাস্ক ব্যবহারের কারণেই ইতালিতে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা গেছে। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিকে করোনার বিস্তার প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার করা। ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এর পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, কোয়ারেন্টিন ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করে কোভিড-১৯-এর প্রতিরোধে কাজ করে যেতে হবে।

মানুষের হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে সামনে থাকা মানুষের কাছে সরাসরি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার মানুষের হাঁচি-কাশি থেকে বের হওয়া ড্রপলেট বাতাসে ভাসতে ভাসতে নিচে পড়ে যায়। ছোট্ট এ ড্রপলেটকে বলে অ্যারোসল। এ অ্যারোসল মানুষের পায়ে পায়ে বা বাতাসে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। পরে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। সঙ্গত কারণেই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক।

দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশের জনগণ মাস্ক পরার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তারা তা মানছে না। মাস্ক পরা ছাড়া যে যার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাস্তায় বের হলেই এ ধরনের দৃশ্য চোখে পড়ে। ফলে বিপদ বাড়ছে। সরকারকে এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। যারা মাস্ক না পরে বাইরে বের হবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালত ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় জনসাধারণকে জরিমানা করেছে। এ ব্যাপারে আরও কঠোর হওয়া উচিত।

দেশে মৃতু্যর সংখ্যা কম বলেই আশ্বস্ত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং জনসাধারণের সতর্কতাই কেবল পারে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ থেকে আমাদের মুক্ত রাখতে।

Check Also

বিজ্ঞান গবেষণা, সহযোগিতা ও অর্থায়ন বৃদ্ধিতে ইউনেসকোর আহ্বান

বিধান চন্দ্র দাস পৃথিবীজুড়ে এখন বড় দুঃসময় চলছে। বিগত কয়েক মাসে আমাদের চেনা পৃথিবীটা অনেকটাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *