Home / জাতীয় / পিস্তল তাক করে পুলিশ সার্জেন্টকে মারধর করা সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা বহিস্কার

পিস্তল তাক করে পুলিশ সার্জেন্টকে মারধর করা সন্ত্রাসী যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা বহিস্কার

 

সার্জেন্ট ফরহাদ (বায়ে),  বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা সন্ত্রাসী জুয়েল রানা (ডানে)

সাব্বির সৈকত :  রাজধানীর পল্লবীতে মাস্ক পরতে বলায় পিস্তল দেখিয়ে কর্তব্যরত পুলিশের এক সার্জেন্টকে মারধরের অভিযোগে অভিযুক্ত পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনা নিয়ে গত মঙ্গলবার ওই নেতাকে বহিষ্কার করেছে আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রিয় কমিটি।

এর আগে গত রবিবার দুপুরে পল্লবীর কালসী পুলিশ বক্সের অদূরে পুলিশ পেটানোর খবর ঢাকার ডাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর পরই বহিষ্কার করা হলো যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ, মাদক, হত্যা ও হত্যা চেষ্টার একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, পল্লবীর কালসী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে একটি অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কেন্দ্রিয় কমিটি। নীতি নৈতিকতার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংগঠনের কেউ উশৃঙ্খলতার পরিচয় দিলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুশিয়ারি দেন তিনি।

 

পুলিশ পেটানার ওই ঘটনায় গত সোমবার পল্লবী থানায় যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাসহ অচেনা আরও ৪০ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্য সার্জেন্ট মো. আল ফরহাদ মোল্লা। মামলা নম্বর-৬১। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই তাপস কুণ্ড জানান, ঘটনায় জড়িত জুয়েল রানা ও তার সহযোগীরা গাঁ ঢাকা দিয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগী পুলিশ সার্জেন্ট মো. আল ফরহাদ মোল্লা জানান, তিনি পল্লবী ট্রাফিক জোনে কর্মরত। গত রবিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে কালসী পুলিশ বক্সের অদূরেই মূল সড়কে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে বিকল হয়ে পড়ে বসুমতি পরিবহনের একটি বাস। রাস্তায় যানজট লেগে গেলে সহকর্মীদের নিয়ে বাসটি রাস্তা থেকে সড়ানোর চেষ্টা করছিলেন সার্জেন্ট ফরহাদ। এ সময় বিকল হওয়া বাসের চালককে গালাগাল করছিলেন জুয়েল রানা। তাকে থামার জন্য বললে উল্টো ফরহাদকেও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন ওই যুবলীগ নেতা। এ সময় জুয়েলকে মাস্ক পরে কথা বলতে বললে আরও ক্ষেপে গিয়ে ফরহাদকে চরথাপ্পর মারতে থাকেন জুয়েল। একপর্যায়ে জুয়েল প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তল বের করে ফরহাদকে গুলি করার জন্য উদ্যোত হন জুয়েল। সহকর্মী ও উপস্থিত লোকজনের সহায়তায় রক্ষা পান। সার্জেন্ট ফরহাদ আরও জানান, কালশী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে জুয়েল রানা তার ক্যাডারদের খবর দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই অচেনা ৩০ থেকে ৪০জন এসে বক্সের মধ্যেই ফরহাদ ও তার সহকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। ছিনিয়ে নেয় তার বডিঅন সরকারী ক্যামেরা; ছিঁড়ে ফেলেন পরিধেয় পুলিশের পোষাক। খবর পয়ে পল্লবী থানা পুলিশ এগিয়ে এলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। পরে সহকর্মীরা আহত ফরহাদকে ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যায়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও ওপাশ থেকে সাড়া দেননি তিনি। ঢাকা মহানগর উত্তরের পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পী বলেন, পুলিশকে মারধরের অধিযোগে দায়ের মামলায় অভিযুক্ত পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে আমিও শুনেছি। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি কাউন্সিলর বাপ্পী।

কে এই জুয়েল রানা ?

রিকশাচালক থেকে কোটিপতি। পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। কোটি কোটি টাকার মালিক। মিরপুর-পল্লবীবাসীর আতঙ্কের নাম জুয়েল রানা। সংসদ সদস্য ইলিয়াছ উদ্দিন মোল্লার ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে কাউকে তোয়াক্কা করেন না তিনি। খুন, ধর্ষণ, ভ‚মিদখল, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জেল খেটেছেন একাধিকবার। তবে বেশি দিন জেলে আটকে রাখা যায়নি তাকে। এমপির ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় জেলে যেতে না যেতেই বেরিয়ে আসেন তিনি। সর্বশেষ বিহারি পল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে ১০ জন হত্যার ঘটনায় আলোচনায় তিনি। বিহারিদের অভিযোগ, এ জুয়েল রানার নেতৃত্বেই যুবলীগের নেতাকর্মীরা সেই রাতে বিহারি ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছিল। মিরপুর এলাকায় তার রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। ওই এলাকার মাদক, জুয়া থেকে শুরু করে সব অপকর্মই নিয়ন্ত্রণ করেন জুয়েল রানা। গত ১০ই জুন রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়াকে কেন্দ্র করে মিরপুর কালশী এলাকার কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বিহারিদের কাছে অপদস্থ হন স্থানীয় এমপি ইলিয়াছ উদ্দিন মোল্লা। তিনি চেয়েছিলেন তার ক্যাডার জুয়েল রানার নিয়ন্ত্রণাধীন রাজু বস্তির জন্য অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ। এমপিকে অপদস্থ করার শোধ নিতেই গত শনিবার সকালে বিহারি ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়। জুয়েল রানার নেতৃত্বেই পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে ওই হামলা চালায় বলে বিহারিদের অভিযোগ। হামলাকারীদের মধ্যে জুয়েল রানা ও তার ক্যাডার বাউনিয়াবাদ লালমাটি এলাকার সুমন (পেটকাটা সুমন), বাচ্চু, হারুন, হেলু, দিলা, গেসু, জালাল, শাহপরাণ বস্তির মুকুল, বাস্তুহারা লীগের নেতা ফজর আলীসহ যুবলীগের শতাধিক নেতাকর্মী ছিল। বিহারি পল্লীর বাসিন্দা মুহাম্মদ শামসাদ জানান, হামলাকারীরা তার দোকান ও বাসা লুট করেছে। ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। সুরাইয়া হেয়ার সেলুন, ফয়সাল ইলেকট্রনিক্সসহ অর্ধশত দোকানের শাটার রামদা দিয়ে কেটে মালামাল লুট করেছে। ক্যাম্পের বাসিন্দা শাহজাদী জানান, তাকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেছে সন্ত্রাসীরা। এমনকি পুলিশও তাদের পক্ষ নিয়ে ক্যাম্পের নারীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে। ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল ওয়াহিদ জানান, ইয়াছিনের ঘরে-বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে আগুন দেয়া হলে তারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ছোড়ায় তা সম্ভব হয়নি। আগুন নেভাতে গিয়েই আজাদ গুলিবিদ্ধ হন বলে তিনি জানান। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা সবাই জুয়েল রানার ক্যাডার বলে জানান ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাউনিয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা জুয়েল রানা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তার পিতা একজন রিকশাচালক। স্থানীয়রা জানান, ২০০৯ সালের পূর্বে জুয়েল নিজেও পল্লবী-কালশী এলাকায় রিকশা চালিয়েছেন। ওই সময়ে স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে অংশ নিতেন তিনি। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। দল ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি পাল্টে যায় তার ভাগ্য। অনেক গুলো রিকশার মালিক হন জুয়েল রানা। কালশী মোড়ে স্কুলের পাশে গড়ে তোলেন রিকশার গ্যারেজ। এমপি ইলিয়াস মোল্লার কাছের লোক হিসেবে যুবলীগের গত সম্মেলনে পল্লবী থানার সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। বাউনিয়া বাঁধ, পলাশনগর, রূপনগর, বেগুনটিলা ও লালমাটি এলাকায় সরকারি খাস জমি দখলে নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কালশী বেগুনবাড়ী সংলগ্ন সরকারি জায়গায় গড়ে তুলেছেন রাজু বস্তি। এ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। এভাবে গত কয়েক বছরে কম করেও হলেও ৫০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন জুয়েল রানা। বনানীর ডিওএইচএস এলাকায় রয়েছে তার ফ্ল্যাট। দামি গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। স্থানীয়রা জানান, জুয়েল রানা এখন কালশী এলাকার আতঙ্কের নাম। অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর পল্লবী এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানা ও বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে মাসোয়ারা আদায় করেন যুবলীগের এ নেতা। তবে জুয়েল রানার অত্যাচারের শিকার এসব ব্যবসায়ীরা ভয়ে তার বিরুদ্ধে কখনও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন না।

সূত্র জানায়, গত বছরের এপ্রিল মাসে বাউনিয়া বাঁধ ডি-ব্লকে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে জুয়েল রানা। বাউনিয়া বাঁধ ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা ষষ্ঠ শ্রেণীর ওই ছাত্রী পরে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় তরুণীর মামা আমীর হোসেন বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। এ মামলায় গোয়েন্দা পুলিশ জুয়েল রানাকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও রহস্যজনক কারণে রিমান্ডে আনতে পারেনি পুলিশ। এরই মধ্যে জামিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান জুয়েল রানা। যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা বাহিনীর প্রতিটি কর্মীই ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। বিহারি ক্যাম্পে হামলায় অংশ নেয়া মুকুল একজন চিহ্নিত ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ী। কিছুদিন আগে শাহপরান বস্তি থেকে তার স্ত্রীসহ ওই চক্রের আকরাম, গুডুকে আটক করেছিল পুলিশ। ওই দিন তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দু’টি মামলা করা হয়। এসবের মাঝেই পুলিশ সার্জেন্টকে পিস্তল ঠেকিয়ে মারধর করলে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে জুয়েল রানা ।

Check Also

করোনায় মৃত্যু কমেছে রোগীও কমেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     দেশে করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) মৃত্যুহার এবং শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে বলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *