Home / জাতীয় / অস্ত্র তাক করে হুমকি দিয়ে পুলিশ সার্জেন্টকে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মারধর করলেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা

অস্ত্র তাক করে হুমকি দিয়ে পুলিশ সার্জেন্টকে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মারধর করলেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা

পল্লবী থানা যুবলীগের সা. সম্পাদক জুয়েল রানা

সাব্বির সৈকত : পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানার বিরুদ্ধে পুলিশ সার্জেন্টকে মারধর ও তার বডি ক্যামেরা  ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মারধরের শিকার সার্জেন্ট মো. আল ফরহাদ মোল্লা জানায়, রবিবার (২৬/০৭/২০২০ ইং)  মিরপুরের কালসী পুলিশ বক্সের কাছাকাছি এলাকায় বসুমতি বাস নষ্ট হয়ে যায়। সে বাসটিকে রাস্তা থেকে সরানোর সময় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা গালমন্দ করতে থাকে ও সাথে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে সে সার্জেন্ট ফরহাদকে চর-থাপ্পর দিয়ে অস্ত্র তাক করলে সার্জেন্ট জুয়েল রানার হাত ধরে ফেলে। এ সময় অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে জুয়েল রানা ও সার্জেন্টকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে জুয়েল রানা ৩০-৪০ জন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে পুলিশ বক্সে হামলা চালায় ও সার্জেন্ট ফরহাদকে দ্বিতীয় দফায় মারধর করে। এসময় জুয়েল রানা সার্জেন্ট ফরহাদের পরিহিত সরকারী পোশাক ছিড়ে ফেলে ও তার বডি ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়। এসময় পল্লবী থানার টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে জুয়েল রানা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী সার্জেন্ট ফরহাদ। পল্লবী থানার ওসি এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানায়। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর তাপস কুমার কুন্ডু জানান আসামীদের ধরার জন্য আমাদের অভিযান চলছে। তবে পলাতক থাকায় স্থানীয় যুবলীগ নেতা জুয়েলের বাসায় ও ফোনে যোগাযোগ করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রিকশাচালক থেকে ১০ বছরেই কোটিপতি কুর্মিটোলা-বাউনিয়া ও কালশীর আতঙ্ক জুয়েল : 

দশ বছর আগে রিকশা চালাতেন তিনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনটির মিছিল সমাবেশে অংশ নিয়ে নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন জুয়েল রানা। এরপর নেতাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজেই খুলে বসেন রিকশার গ্যারেজ। আরো কিছু দিন পর বাগিয়ে নেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। এরপরই বাউনিয়া বাঁধ, পলাশনগর, রূপনগর, বেগুনটিলা ও লালমাটিসহ আশপাশ এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল করে দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। সেই জুয়েল রানা এখন রাজধানীর কালশী, কুর্মিটোলা ও বাউনিয়া বাঁধ এবং আশপাশ এলাকাবাসীর কাছে যেন মূর্তিমান আতঙ্ক! তিনি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিহারি ক্যাম্পে নয়জনকে পুড়িয়ে মারা, মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ, জমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ স্থানীয়রা অসংখ্য অভিযোগ তুলেছেন। এলাকাবাসীরা জানান, জনৈক প্রভাবশালী এমপির ক্যাডার হিসেবে কাজ করেন জুয়েল। বিভিন্ন মামলায় কয়েক দফা জেলে যাওয়া জুয়েল নিজেও মামলায় ফাঁসিয়েছেন বহু মানুষকে। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে পল্লবী-কালশী এলাকায় রিকশা চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন রিকশাচালক পিতার সন্তান জুয়েল। তবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন তিনি। এর মাধ্যমেই দলটির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠনা গড়ে ওঠে তার। দলটি ক্ষমতার আসার পর রাতারাতি পাল্টে যায় তার ভাগ্য। অনেক রিকশার মালিক বনে যাওয়া জুয়েল কালশী মোড়ে স্কুলের পাশে বসান গ্যারেজ। এক এমপির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদও বাগিয়ে নেন তিনি। এরপরই বাউনিয়া বাঁধ, পলাশনগর, রূপনগর, বেগুনটিলা ও লালমাটিসহ আশপাশ এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল করে দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। কালশী-বেগুনবাড়ী সংলগ্ন সরকারি জমিতে তিনি গড়ে তোলেন রাজু বস্তি। সেখান থেকে প্রতিমাসে ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জন হয় তার।

এলাকাবাসী আরো জানান, মিরপুর-১১ নম্বরের বি ব্লকে ঢাকা শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (ডুইপ) পৌনে এক কাঠা আয়তনের কমপক্ষে ১৫টি বাড়ি রয়েছে জুয়েল রানা ও তার স্বজনদের দখলে। কেনার নামে নানা কৌশলে বাড়িগুলো তারা দখল করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- ৭ নম্বর লাইনের ২১ থেকে ২৪ নম্বর, ৮ নম্বর লাইনের ১৬ থেকে ২২ ও ২৪ এবং ১০ নম্বর লাইনের ১৫ ও ১৬ নম্বর বাড়ি। এছাড়া মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে বাউনিয়া বাঁধ মোড়ে টেম্পোস্ট্যান্ড সংলগ্ন মীম ভিলা নামের বাড়িটি করেছেন জুয়েল। এছাড়াও পলাশনগরে তার আরো তিনটি বাড়ি আছে। যুবলীগ নেতা হওয়ার পর গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতেও বানিয়েছেন আলিশান ভবন।  এছাড়া নেত্রকোনায় তার আরেকটি বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। সাভারের বিরুলিয়ায় স্ত্রীর নামে বেশকিছু জমি কেনার পাশাপাশি জুয়েল নিজ নামে ও বেনামেও কিনেছেন অনেক জমি। চাঁদাবাজির অর্থ ও দখলের মাধ্যমেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন জুয়েল। সরেজমিন বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় দেখা যায়, নতুন রাস্তার এক পাশে জলাশয়ের ওপর শত শত ঘর। পানিতে ডুবে থাকা বাঁশের খুঁটির ওপর কাঠের পাটাতন ও টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরগুলোর কয়েকটি আবার দোতলা। বাঁধের এ ও সি ব্লক এবং বাজার রোডের পাশে জলাশয়ের ওপরে এভাবেই গড়ে উঠেছে কলাবাগান ও পুকুরপাড় বস্তিসহ কয়েকটি বস্তি। প্রতিটি বস্তিতে রয়েছে কয়েকশ ঘর। বেশিরভাগ জলাশয়ের ওপরে হলেও কয়েকটি ঘর তৈরি করা হয়েছে মাটি দিয়ে জায়গা ভরাট করে।

এলাকাবাসী বলছেন, বাউনিয়া বাঁধের এ, বি, সি সহ বিভিন্ন ব্লকে প্রায় দুই হাজারের মতো বস্তিঘর রয়েছে। পাশাপাশি আছে বেশ কয়েকটি দোকান ও গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বস্তির অনেক ঘরই ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছেন স্থানীয় এমপির ঘনিষ্ঠ জুয়েল, খলিল, আলতাফ ও তাদের সহযোগীরা। অন্যগুলো থেকে মাসে ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হয়। কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, জুয়েলের নেতৃত্বে ক্যাম্প থেকে বাউনিয়া বাঁধের রাজু বস্তিসহ আশপাশ বস্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০১৪ সালের ১৪ জুন জুয়েলের লোকজন বিহারি ক্যাম্পে আগুন দেয়। এ ঘটনায় পুড়ে মারা যায় ক্যাম্পের বাসিন্দা ইয়াসিন আলীর স্ত্রী বেবী আক্তার (৪০); যমজ ছেলে লালু ও ভুলু (১৪); তিন মেয়ে শাহানা (২৪), রোখসানা (১৮) ও আফসানা (২০); শাহানার আড়াই বছরের ছেলে মারুফ; ইয়াসিনের বড় ছেলে আশিক (২৫) ও তার স্ত্রী শিখা বেগম (১৮)। ওই নয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার বিচার দাবি করে  জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বিহারিরা। সেখানে তাদের নেতা সাদাকাত খান ফাক্কু বলেন, ঘটনার স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। তার ভাষ্য, ওই অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জুয়েল রানার ভাই রিপন, চাচাতো ভাই রুবেল, রাজনৈতিক সহযোগী মিলনসহ আরো অনেকে জড়িত ছিল। অথচ তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। উল্টো হামলার বিচার চাওয়ায় জুয়েলের নির্দেশে ৩নং ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি এমএম বিপ্লব বিহারিদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও নিরীহ ক্যাম্পবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেন। মিরপুর এলাকায় জুয়েলের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, এলাকায় মাদক ও জুয়াসহ নানা অবৈধ কাজের নিয়ন্ত্রক তিনি। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বাউনিয়াবাদ লালমাটি এলাকার সুমন ওরফে পেটকাটা সুমন, বাচ্চু, হারুন, হেলু, দিলা, গেসু, জালাল, শাহপরাণ বস্তির মুকুল, বাস্তুহারা লীগের নেতা ফজর আলীসহ যুবলীগের শতাধিক নেতাকর্মী।

জুয়েলের বিরুদ্ধে পল্লবীর পলাশনগর সড়কঘেঁষা ৬ নম্বর প্লটে সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির ওপর দোতলা বাড়িটি দখলের অভিযোগ রয়েছে। বাড়িটির অংশীদার মাহবুব হাসান জানান, স্থানীয় স্বপন, রিয়াদ ও বাবুর কাছ থেকে তারা ১২ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন। ওই লেনদেন মেটানোর নামে জুয়েল বাড়িটি দখলের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি ও তার সহযোগীরা অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে সাদা স্ট্যাম্পে তাকে সই করিয়ে নেন। মাহবুবের বলেন, প্রভাব খাটিয়ে জুয়েল রানা আমাদের ২ কোটি টাকার সম্পদ দখল করে নিয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, দখল ও চাঁদাবাজির আয়ে বনানীর ডিওএইচএস এলাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন জুয়েল। নিজে তো বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেনই স্ত্রী-সন্তানও চড়ে আলাদা গাড়িতে! ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে বাঁধের ডি ব্লকের বাউনিয়া বাঁধ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী জামেনা আক্তারকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগে পল্লবী থানায় জুয়েল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে, অপমান ও দুঃখে কিশোরীটি আত্মহত্যা করে।

Check Also

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস পাবে : রীভা গাঙ্গুলি

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *