Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / কোভিড-১৯ আক্রান্ত বিশ্বে ন্যাটোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

কোভিড-১৯ আক্রান্ত বিশ্বে ন্যাটোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর নীতিগতভাবে তারা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করে। পৃথিবীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো সমর্থন করে। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি সেইসব উপনিবেশের মানুষের একটা দুর্বলতা থেকেই যায়। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেসব উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করে, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তাদের একটা নরম মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। এই সত্যটা ব্রিটিশ-মার্কিন ও অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর নজর এড়ায় না। তদুপরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রতিষ্ঠা তাদের আরো সুদৃঢ় করে তোলে। উদাহরণ হিসেবে উলেস্নখ করা যায়- ভারতবর্ষের কথা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কামড় থেকে ওয়াহাবি খেলাফতকে রক্ষা করার জন্য এ দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ তুরস্কের দিকে পদযাত্রা করেছিল এবং তারাই তাশখন্দে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেছিল। শুধু তাই নয়, সমাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সাজুয্য প্রতিষ্ঠা করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। যদিও তারা কেউই মার্কসবাদী ছিলেন না। তাই বলছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই সত্যটা সাবেক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো দৃষ্টি এড়ায়নি এবং সমগ্র ‘মুক্ত’ বিশ্ব সমাজতন্ত্রের করতলগত হওয়ার ভয়ে থাকে এবং একের পর এক নানা রকম আঞ্চলিক সামরিক জোট গঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরই একপর্যায়ে গঠিত হয় ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি ‘North Atlantic Treatz Organi“ation (NATO)।’

দাপ্তরিকভাবে ন্যাটো গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ’ নিশ্চিত করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ‘স্বাধীনতা, অভিন্ন ঐতিহ্য এবং সভ্যতার’ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করা। চুক্তি অনুযায়ী, ন্যাটোভুক্ত যে কোনো দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটি জোটভুক্ত সব দেশের ওপর হামলা বলেই গণ্য হবে এবং সব দেশ একে অন্যের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। বাস্তব ক্ষেত্রে, জোটটি এটা নিশ্চিত করে যে, ‘ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্যভাবে উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।’ সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সাম্যবাদকে জোটটি তাদের বড় হুমকি মনে করত। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে ন্যাটোর সীমান্ত মস্কোর দিকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার অগ্রসর হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপে বিপস্নব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে জোটটি সাবেক সোভিয়েত স্যাটেলাইট জাতিকে নিজেদের সদস্য হিসেবেই গণ্য করে।

স্নায়ুযুদ্ধপরবর্তী যে কোনো সময়ের চেয়ে, বর্তমানে রাশিয়া এবং ন্যাটোর বৈরিতা কিছুটা হলেও কমে এসেছে। তবে অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই মুহূর্তে রাশিয়ার তুলনায় সক্ষমতার দিক থেকে ন্যাটো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাছাড়া নিজেদের ভেতর ভুল বোঝাবুঝির কারণে ন্যাটো কিছুটা খারাপ সময় পার করছে। বিশেষ করে, তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার সাম্প্রতিক অস্ত্র চুক্তিকে জোটের অনেকে ভালোভাবে নেয়নি। অনেক দেশই ন্যাটোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক আবার যাচাই করার আবেদন করেছে। তারপরও সব ভেদাভেদ ভুলে ন্যাটো পুরো ইউরোপজুড়ে নীরবে প্রতিরক্ষা বিপস্নব কার্যক্রম শুরু করতে চায়- যা রাশিয়াকে ইউরোপে একঘরে করে ফেলারই প্রয়াস। তবে রাশিয়াও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। চারদিক থেকে মেলে ধরা জাল ছিন্ন করতে তারাও নীরবে ছক কষছে। তাদের নীরব থাকার এই একটা মানেই হতে পারে। ফলে আদতে বর্তমানে দুই পক্ষের মাঝে যে নীরবতা, সেটা বড় কোনো ঝড়ের আগে বায়ুপ্রবাহ থেমে যাওয়ার মতোই।

তুরস্ক ও জাতিসংঘ সমর্থিত লিবীয় সরকার গ্রিস ও সাইপ্রাসের নাগরিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে একটি সমঝোতায় স্বাক্ষর করেছে। জবাবে গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকি বলেছেন, তিনি ওই অঞ্চলে তুরস্কের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ন্যাটোর কাছে সমর্থন চাইবেন। তবে তুর্কি কর্মকর্তারা মনে করেন, লিবিয়ার সঙ্গে তাদের চুক্তি সাফল্য এনেছে। কারণ, এটা গ্রিস, সাইপ্রাস ও মিসরীয়দের বিভক্ত করেছে, যা তাদের জন্য লাভজনক। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেন, তারা এখনও গ্রিস ও মিসরের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তুরস্ক ও ন্যাটোর অন্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা সিরিয়ায় তুর্কি অভিযান নিয়ে কথা বলবেন। গত সপ্তাহে ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, এককভাবে সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জোটকে ক্ষতিগ্রস্ত করা চলবে না। জবাবে এরদোগান বলেন, ফ্রান্স তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সিরিয়ায় অভিযানের পর ফ্রান্স, চেক প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তুরস্কে অস্ত্র রপ্তানি সীমিত করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। তুরস্ক অবশ্য এই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়। সিরিয়ায় অভিযান ও সেফ জোনের ব্যাপারে রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন দেশটির। ইতিমধ্যে ম্যাক্রোঁর পাশাপাশি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এরদোগান। জার্মান মার্শাল ফান্ডের তুর্কি পরিচালক উনলুজিসাসিকলি বলেন, ‘তুরস্ক কর্তৃক রুশ এস-৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার ব্যাপারটিও আলোচনায় আসতে পারে। সিরিয়ায় তুর্কি অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার সমালোচনা করেছেন ম্যাক্রোঁ। আর বাকি সবাই সমালোচনা করেছে এস-৪০০ কেনার প্রশ্নে। এরদোগান সবারই সমালোচনা করেছে যে তারা কেউ তুরস্ককে সহায়তা করছে না।’

স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি আর সোভিয়তে ইউনিয়ন নেই- তার মানে এই নয় যে, পশ্চিমারা মস্কোকে নিয়ে ষড়যন্ত্র বন্ধ করে দেবে। ২০০৩ সালে দেয়া এক ভাষণে ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেমি শেয়া বলেন, ‘কেউ-ই হঠাৎ করে বিশ্বাস করেনি যে, কমিউনিজমের অনুপস্থিতি একটি দুশ্চিন্তামুক্ত পরিস্থিতি, একটি স্বর্ণযুগের সূচনা করেছে যেখানে মিত্র শক্তিরা কোনো ধরনের সশস্ত্র বাহিনী ছাড়াই থাকবে, বা সুরক্ষা ছাড়াই বসবাস করতে পারবে।’

তাই আজ বিশ্ববাসীর সামনে যে সব প্রশ্ন এসে দাঁড়য়িছে তা হলো জাতিসংঘ কি ন্যাটো নামের একটি আঞ্চলিক সামরিক জোটে বিলীন হয়ে যাবে? জাতিসংঘ সনদে ছোট-বড় সব জাতি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রের জন্য তার ভৌগোলিক সীমানাকে অলঙ্ঘনীয় বলে ঘোষণা দেয়া হিেছল। ১৯৯৯ ন্যাটোর নতুন সংস্করণে মানবাধিকার রক্ষার নামে সে ভৌগোলিক সীমানা লঙ্ঘন করার অধিকার নিজ স্কন্ধে তুলে নিচ্ছে। বিশ্বসভা কি তার ঘোষিত সনদ থেকে সরে আসবে? জাতিগত সহিংসা, ধর্ম ও জাতিগত সংখ্যালঘু ওপর ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অজুহাতে ন্যাটো পৃথিবী যে কোনো রাষ্ট্র আক্রমণ করতে পারে। বিশ্ববাসী কী এ দাবি মেনে নেবে? বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিজয়রথ সঠিকভাবে বহন করতে পারে না যেসব দুর্বল জাতি রাষ্ট্র, সেসব দুর্বল রাষ্ট্রের বাজার উন্মুক্ত করার যে নয়া-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু হয়েছে, তা কতদূর চলতে দেওয়া যাবে? জাতি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কে বাজারের কাছে বিক্রি করতে হবে? প্রতিটি আক্রমণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে দেশে এবং তার আশপাশের দেশগুলোতে তার স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে-১৯৯১ সালে ইরাক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব, কুয়তে, বাহরাইন, কাতার, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে ইরাককে ঘিরে রাখে। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় বারের মতো ইরাক আক্রমণ করার পর সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার স্থায়ী সেনাঘাঁটি স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৭৫ বছর পর আজও জার্মানি ও জাপানে যথাক্রমে ৫৫ হাজার ও ৪৫ হাজার মার্কিন সেনা স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসে আছে। একইভাবে কোরিয়ার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও হাজার হাজার মার্কিন সৈন্য দক্ষিণ কোরিয়াতে অবস্থান করছে। কাজেই এরকম প্রশ্ন উঠতেই পারে; যেসব দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে কিংবা যেসব দেশে চলে ঘাঁটি স্থাপন করেছে, সেসব দেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম- এটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি?

স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এসব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্য জাতিসংঘ কি কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে? মানবাধিকার লঙ্ঘন একটি মারাত্মক ঘটনা তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু ন্যাটোর মতো একটি আঞ্চলিক সামরিক জোটের ওপর তা নিরসনের দায়িত্ব অর্পণ করলে আরও ভয়ঙ্কর রকমের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই ন্যাটোকে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদের অধীন করা এক অপরিহার্য কর্তব্য। বিশ্বস্ততা ও কার্যকরভাবে ন্যাটোর কার্যক্রমকে বিশ্ব সভার আওতায় নিয়ে আসা আজকে জাতিসংঘের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে ন্যাটো জোটের অবস্থায়ইবা কী রকম হবে- এটা আজ বিশ্ববাসীর কাছে বড় প্রশ্নবোধক।

ঐতিহাসিক ন্যাটো সুসংহত ও শক্ত ভিতের ওপর অবস্থান করবে- নাকি ন্যাটো ঐতিহ্য ও সংহতির কোনো নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে বা ওয়ার্শ চুক্তির ন্যায় তারও অবসান ঘটাবে এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের ওপরই ন্যস্ত হওয়া ভালো।

Check Also

কৃষিই একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন

আফতাব চৌধুরী বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নিজ দেশকে শিল্পে উন্নত করতে চায়। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তারা মডেল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *