Home / উপ-সম্পাদকীয় / করোনা ভাইরাস : ও আমার ডাক্তার ভগবান

করোনা ভাইরাস : ও আমার ডাক্তার ভগবান

জ্যোতিষ মন্ডল, এফসিএ

এই মুহুর্তে সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাসের চরম প্রদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় তের লক্ষাধিক আক্রান্ত ও পচাত্তর হাজারের মত মানুষ মারা গেছে। সব দেশেরই ব্যবসা বাণিজ্য চরম ভাবে আক্রান্ত, পুর্বের অবস্থা ফিরে পেতে হয়তো কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। সবচেয়ে ভয়ের কথা হল, এই ভাইরাসের এখনো সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করা যায়নি। তারপরও ডাক্তারগন প্রাণপণ চেষ্টায় রুগীকে সেবা করার চেস্টা করে চলছেন। পত্রিকা মারফত আমরা এই সংবাদও পড়েছি যে, ভারতের একজন ডাক্তার মেয়ে তার বহু কাক্সিক্ষত বিয়ের তারিখ বাতিল করে দিয়েছেন করোনার রোগীর সেবা করার জন্য, পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য। সব সময়ই আমার মনে হয়- পৃথিবীতে ডাক্তারি পেশার চেয়ে মহৎ আর কোন পেশা নেই, হতে পারেও না। প্রত্যেক দেশেই যে সব ডাক্তার ও স্বাস্থ্য কর্মী নিজের জীবন বিপন্ন করে করোনা রোগীর সেবা করছেন তারা প্রত্যেকেই সেই সব দেশের জাতীয় বীর বলে বিবেচিত হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশেও যে সব ডাক্তার ও স্বাস্থ্য-কর্মী করোনার রোগীর সেবা করছেন তারাও এ দেশে মুক্তি-যোদ্ধার মত সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। আমরা হাজারো ব্যক্তি হাজারো রকম পেশায় নিয়োজিত আছি, যাহার সবগুলোই কম-বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে তার নিজ-নিজ ধর্ম বলে বিবেচিত হওয়া উচিৎ। যেমন আজ পর্যন্ত কোন দিন শোনা যায়নি যে, বিপদে যাত্রীবাহী প্লেনের পাইলট যাত্রী ফেলে প্যাঁরাসুট নিয়ে ঝাপ দিয়ে নিজের জীবন বাঁচিয়েছেন। এটিও পেশাগত দায়িত্বের আর একটি উৎকৃস্ট উদাহরণ। তবে ডাক্তারী পেশা যতখানি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, এতখানি বোধহয় আর কোন পেশা পারে না। তবে কিছু-কিছু দুঃসংবাদ আজকাল মনকে খুব বেশী ব্যাথিত করছে, জ্বরের রুগী পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ঘুরেও কোথাও ভর্তি করানো যায় নি; অগত্য বিনা চিকিৎসায় স্বজনদের সামনে রুগীর মৃত্যু হচ্ছে। বিস্মিত হচ্ছি এজন্য যে, জ্বর শুনলেই হাসপাতাল গুলি আর রোগী ভর্তি নিচ্ছে না। জনগণের আয়করের টাকা দিয়ে যাদেরকে সরকার রেখেছে জনগণের সেবা দেয়ার জন্য তারা সেই জনগণকেই সেবা দিচ্ছে না। ডাক্তাররা রোগীর সেবা দিচ্ছেন না শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সুরক্ষা মূলক পোশাকের অভাবে! জ্বর আর কাশির রোগী এলেই তারা নাকি দৌঁড়ে পালাচ্ছেন। যাহা কোন ভাবেই কাম্য নয়। সামর্থ থাকা স্বত্তেও, যেসব ডাক্তার ও হাসপাতাল এই সময় করোনার ভয়ে ভীতহয়ে মানুষকে সেবা দিবেন না, তারা ভবিষ্যতে জাতির কি কাজে আসবেন? হাসপাতাল এবং ডাক্তার থাকতে রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে সেটা কিছুতেই মানা যায় না। প্রত্যেক ব্যাক্তি-সে যেকোন পেশাধারীই হোন না কেন, পেশাগত কর্তব্যকে উপাসনা বা এবাদত বলে মনে করা উচিৎ। রামায়নে দেখেছিলাম, যখন মহাবীর মেঘনাদের বানে রামের ভাই লক্ষনের প্রান সংকটে, তখন বীর হনুমান লংকা থেকে রাবনের বৈদ্যি সুসেনকে উড়িয়ে নিয়ে আসেন। কেউ-কেউ প্রশ্নতোলেন শত্রুর বৈদ্যির দ্বারা চিকিৎসা নেয়া কতখানি সমিচীন? প্রতি উত্তরে বৈদ্যি সুসেন বলেছিলেন, বৈদ্যির কোন শত্রু-মিত্র থাকতে নেই। বৈদ্যির একটাই ধর্ম, সেটা হল রোগীর সেবা দেয়া। রামের ভাই লক্ষন সেদিন শত্রু রাবনের বৈদ্যির সেবায় জীবন ফিরে পেয়েছিলেন। তাই সর্বাস্থায় ডাক্তারকে রোগীর সেবা দিতে হবে, এতে কোন অজুহাতই কাম্য নয়। আমারা প্রায় দু’মাস সময় পেয়েছি করোনা মোকাবেলা জন্য, চেস্টা করলে আমাদের সরকার অথবা বে-সরকারি হাসপাতাল গুলোও কি ওইসব নিরাপত্তামূলক পোশাক ও টেস্ট কিট এতদিনে চিন থেকে প্রইয়োজনে চার্টার্ড বিমান পাঠিয়ে সংগ্রহ করতে পারত না বা এখনও পারে না? আমিতো আজও দেখলাম চায়নার আলী এক্সপ্রেস, আলীবাবা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এই সব পোশাক বিক্রয়ের জন্য। আমাদের দেশের সরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে যারা পাশ করে ডাক্তার হয়েছেন তাদেরকে বলব, আপনারা সাধারন জনগনের আয়করের টাকায় লেখাপড়া করেছেন। জনগণের কাছে আপনাদের দ্বায়বদ্ধতা আছে। জনগণের কাছে সেই দ্বায়বদ্ধতা শোধ করার জন্য, এই সময়ের চাইতে শ্রেষ্ঠ সময় আপনার জীবনে আর নাও আসতে পারে। তাই এ সময় আপনাদের প্রত্যেক ডাক্তারকে কর্তব্যকে ধর্ম মনে করতে হবে এবং সাথে-সাথে অবশ্যই নিজের সুরক্ষাও নিয়ে নিতে হবে। আমাদের রাস্ট্রকেও এ সময় তার নাগরিকদের প্রতি আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের সংবিধানের ধারা ১৫(ক) তে পরিষ্কার ভাবে বলা আছে যে, রাস্ট্র জনগণের চিকিৎসার জন্য ব্যাবস্থা গ্রহন করিবেন। তাই একজন মানুষও যদি বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, তাহলে সেটা হবে সরকার কর্তৃক সংবিধান লংঘনের সামিল। শুরুতে আমরা যদি কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নিয়ন্ত্রন করতে পারতাম এবং কিছূ আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে বিদেশ ফেরত সব মানুষগুলিকে বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইন নিচ্ছিত করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আজকে পূরো জাতিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে যেতে হতো না। সময় এখন রাষ্ট্রের সব নাগরিককে সচেতন হয়ে সরকারী নির্দেশনা মেনে চলা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা। মনে রাখা প্রয়োজন নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। এ মহামারী যদি এখনই রোখা না যায় তাহলে আমাদেরকে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখির হতে হবে। একদা যাদের রাজত্বে কখনো সুর্য-অস্ত যেত না, এরই মধ্যে সেই ব্রিটিশ রাজা আর তার প্রধানমন্ত্রীর বেড রুম পর্যন্ত করোনা পৌছে গেছেন। তাই এখনই সময় আরো বেশী সতর্ক হবার। আজ আমার সত্যি-সত্যি মনে হচ্ছে যে, মানুশের রুপই হল ভগবানের রুপ। মানুষের বিপদে ভগবান আকাশ থেকে নেমে এসে মানুষকে সহায়তা করেন না। বরং ভগবান মানুষ রুপেই মানুষকে সহায়তা করেন। তাই এক-এক জন ভাল মানুষ ইশ্বরের এক-একটি রূপ। আজ আমরা বিশ্বব্যাপী যখন করোনায় আক্রান্ত, ডাক্তাররাই আমাদের প্রান রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন আর কেউ নন। তাই এক এক জন উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন ডাক্তার যেন একেকজন মানুষ রুপি ভগবান। অবশ্যই তাহারা নন, যাহারা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন নেন, অহেতুক টেস্ট বাড়িয়ে দেন, কর্তব্য পালন করেননা বা এই সংকটে সেবাতো দূরে থাক জ্বরের রোগী দেখলেই দৌঁড়ে পালান। একটি সত্য ঘটনার অবতারনা দিয়ে লেখার ইতি টানব – আমার খুব ছোটবেলার একটি স্মৃতি, আনুমানিক বছর চল্লিশ আগের কথা। এক শীতের সকালে আমি আমার বাবার সাথে সকালবেলার রোদে গাঁ গরম করছিলাম আর খেজুর গুড়ের বানানো মুড়ির মোয়া খাচ্ছিলাম বাড়ির দক্ষিন আঙ্গিনায়। আমাদের বাড়ীর দক্ষিন দিক দিয়ে তখন শুকনো মৌসুমে একটি মেঠো পথ তৈঁরী হতো। সেই মেঠো পথ ধরে আনুমানিক সত্তর-আশি বছর বয়সী এক সাধু ব্যাক্তি হেটে যাচ্ছিলেন, নাম হরেকৃষ্ণ পাগলা। সেই তীব্র শীতের ভোরে তার পরনে মাত্র একখানা পুরাতন গামছা, সারা শরীরে আর কোন কাপর-চোপর নেই। গলায় আর হাতে বড়-বড় রুদ্রাক্ষের মালা, কাধে সামান্য একটি ঝোলা আর ডান হাতেমোটা একখানি লাঠি, যাতে ভড় করে উনি উচ্চ স্বরে গান গাইতে-গাইতে হেটে চলছেন। গানের কথা ছিল “ও আমার মানুষ ভগবান”। আমার বাবা সেদিন পথের সেই সাধু-বাবাকে “মামা” বলে সম্ভোধন করে আমাদের বাড়ীতে ডেকেএনেছিলেন। আর সেদিন আমরা সেই সাধু-বাবার সাথে খেজুর গুর দিয়ে বানানো মোয়া খেয়েছিলাম। যে উদ্দেশ্যে সাধু-বাবার গল্পের অবতারনা সে হল সাধু বাবার দর্শন; ও আমার মানুষ ভগবান। আজ এই আন্তর্জাতিক সংকটে যেসব স্বাস্থ্য কর্মি ও ডাক্তার নিজের জীবন বাজীরেখে করোনার রোগীর সেবা দিচ্ছেন তাহারা আমাদের কাছে মানুষ ভগবান বলে বিবেচিত।

লেখক একজন ফেলো চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

bangla.joti@icloud.com

Check Also

প্রাকৃতিক দেওয়াল সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে

সৈয়দ ইবনে রহমত বাংলাদেশের গর্ব করার মতো যে কয়টি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তার মধ্যে সুন্দরবন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *