Home / বিশেষ প্রতিবেদন / বৈশাখের পণ্য এখন কী করবেন তারা?

বৈশাখের পণ্য এখন কী করবেন তারা?

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। অতিমারি করোনাভাইরাস ঠেকাতে সরকারি নির্দেশে অফিস-আদালত, কারখানা, যানবাহন, জনসমাগম সব বন্ধ। ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়েছে এবার পহেলা বৈশাখের সব ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠান হবে না। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ অনু ও ক্ষুদ্র উদ্যেক্তাদের।

স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিপর‌্যস্ত এই উদ্যোক্তারা পহেলা বৈশাখ ঘিরে একটু আশা দেখছিলেন। এবার সেটাও গেল। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে যারা পণ্য তৈরি করে রেখেছিলেন, তাদের এখন কী হবে! তাদের প্রায় সবাই এই উৎসবের বিক্রিবাট্টা থেকে ঋণের অংশ পরিশোধ করেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের কাছে সহায়তা চেয়েছেন তারা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ উদ্যোক্তাদের দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে সরকারকে তাদের দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বাঙালির সর্বজনিন উৎসব বৈশাখ। গ্রাম-গঞ্জ আর শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে অলিগলির দোকান ও বিপণিবিতানে থাকে কেনাকাটার ভিড়। বাহারি রঙের বৈশাখী পোশাক দেদার বিক্রি হয়। অনলাইনেও জমে ওঠে বেচাবিক্রি। বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য বড় পরিসরে ছড়িয়ে আছে দেশজুড়ে। এই সময়ে সারা দেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য বেচাকেনা হয়। মিষ্টি, মিঠা-মণ্ডা বিক্রি হয় টনে টন। সবই থমকে গেছে করোনার প্রভাবে।

‘নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প’ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হাসিনা মুক্তা বলেন, ‘সাধারণত পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এসএমই পণ্য বিক্রি হয় বেশি। সাত দিন আগে থেকে বিক্রি শুরু হয়ে যায়। আমরা এ সময়টা টার্গেট নিয়ে পণ্য তৈরি করি। টাকা জোগাতে হয় ঋণ করে। উৎসবে উল্লেখযোগ্য পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু এবার বৈশাখ উৎসবের মৌসুমে সবকিছু বন্ধ। আমাদের তৈরি পণ্য নিয়ে এখন কী করব?’

এসএমই উদ্যোক্তারা বড় বিপদের মধ্যে ছেন জানিয়ে মুক্তা বলেন, ‘এখন সরকার আমাদের জন্য কিছু না করলে বেশির ভাগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বেকার হবে হাজার শ্রমিক-কর্মচার।’

করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি এড়াতে সরকার সংগত কারণে পহেলা বৈশাখের সব অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘আমি ভাবছি শত শত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কথা, যারা এই বৈশাখকে ঘিরে তাদের পণ্য উৎপাদন করেন, বিক্রির জন্য প্রস্তুত থাকেন। হালখাতার মিষ্টি, মাটির পুতুল থেকে শুরু করে মুড়ি-মুড়কি কিংবা ফুলের ব্যবসা, পোশাক-আশাক তো আছেই, সবার একটা বড় বিক্রয়ের মৌসুম হলো পহেলা বৈশাখ। এই একটি উৎসব না হওয়ার কারণে ব্যবসা নষ্ট হবে এই উদ্যোক্তাদের।’

সরকারকে এসব অনু ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার রিফাইন্যান্সিং স্কিম দেয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, একটা জরুরি ফান্ড করে খুব অল্প সুদে তাদের ঋণ দেয়া যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসহ পণ্যের সরবরাহ চেইন যাতে সচল থাকে তার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান ড. নাজনীন আহমেদ। বলেন ‘কেউ কিছু তৈরি করলে তা যদি বাইরে না যায়, কিংবা কেনাকাটা না হয় তাহলে চাহিদাও তৈরি হবে না। কাজেই চাহিদাকে চাঙা করতে হলে সব ধরনের মানুষের কাছে টাকা থাকতে হবে। কেনাকাটার ব্যবস্থা থাকতে হবে।’

ড. নাজনীন ক্রেতাদের উদ্দেশেও একটি আহ্বান রাখেন। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ছোট ছোট অনলাইন উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অন্তত একটি পণ্য অনলাইনে অর্ডার করুন, যাদের সামর্থ্য আছে। ডেলিভারি নিবেন করোনা সংকটের পর। যারা দেশি পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করে, মূলত তাদের কাছ থেকে কিনবেন। এই কেনাকাটা বিলাসিতা নয়। আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের এই কেনাকাটা অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবে, বাঁচিয়ে দেবে অনেকের ব্যবসা।’

ড. নাজনীন আহমেদ সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘সরকারের প্রথম গ্রেড থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত যেসব কর্মকর্তা আছেন, তাদের বৈশাখী ভাতা সরকারের করোনা ফান্ডে দেয়া হোক।’

শাহবাগের বটতলার ফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। ঢাকাটাইসকে তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের অনেক ফুল বিক্রি হতো। শাহবাগ ফুটপাতে ৫১টি দোকানে জমে উঠতে ফুল বিক্রি। এখন গত ২৬ তারিখ থেকে সরকারের নির্দেশনায় বন্ধ আছে আমাদের দোকান। আমরা সরকারের ঘোষণামতো বন্ধ রেখেছি। কবে খুলতে পারব জানি না। সরকার যেন আমাদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করে। আমাদের এখানের দোকানদান দিনে দিনে বিক্রি করে সে টাকা দিয়েই তারা সংসার চালায়। বসে থেকে তাদের টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেছে। কত দিন আর ঘরে বসে খাওয়া যায়!’

করোনার প্রভাবে অনু ও ক্ষুদ্র উদ্যেক্তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করছেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ প্রচুর হয়েছে। এটাতে একটা বড় ধাক্কা লাগবে। এখানে সরকারকে নজর দিতে হবে। এসব উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসা শুরু করে। তাদের ঋণ আদায়টা পিছিয়ে দিতে হবে। আরও ঋণ লাগলে সেটা তাকে সহজ শর্তে দিতে হবে। এমনকি অনুদানও দেয়া দরকার। বড়দের না দিয়ে এমন ছোট উদ্যোক্তাদের অনুদান দিতে হবে।’

সরকারকে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পর্কে এখনই তথ্য নিতে হবে বলে মনে করেন পিকেএসএফ চেয়ারম্যান। ‘সারা দেশের ছোট-ছোট উদ্যোক্তাদের কিছু তথ্য আমাদের কাছে আছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছেও তথ্য আছে। এর ভিত্তিতে কাজ করা দরকার, যাতে এসব উদ্যোক্তা স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। অথবা যে অবস্থায় আছে সেটা যেন ধরে রাখতে পারে।’

চীনের উহান শহর থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণসংহারী করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও হানা দিয়েছে। এর বিস্তার রোধে সরকার পহেলা বৈশাখের সব ধরনের অনুষ্ঠান ও কার্যক্রম স্থগিত করেছে। স্থগিত করা হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বৈসাবি উৎসবের অনুষ্ঠানও।

Check Also

বর্ষার আগেই গতি ফিরছে রাজধানীর ২৪ খালের

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     আসন্ন বর্ষার আগেই রাজধানীর ২৪টি খালের খননকাজ কাজ শেষ করতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *