Friday , February 28 2020
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / লটারিতে ভাগ্য খুলেছে দালালের, কপাল পুড়েছে কৃষকের

লটারিতে ভাগ্য খুলেছে দালালের, কপাল পুড়েছে কৃষকের

>> কুড়িগ্রামে কৃষকদের তালিকায় চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী সন্তান ভাইসহ ১১ ইউপি সদস্যের নাম
>> নাটোরে ভুয়া নাম দেখিয়ে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন নেতাদের বিরুদ্ধে গুদামে ধান দেয়ার অভিযোগ
>> খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলছেন, ধান ক্রয়ে লটারির মাধ্যমে কৃষকদের তালিকা তৈরি সঠিক হয়নি

কৃষকের ধান সরকারি গুদামে গেল না! যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করার কথা তা সফল হয়নি। লটারির মাধ্যমে খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করায় ভাগ্য খুলেছে দালালদের, আর কপাল পুড়েছে কৃষকদের। কৃষককে সহযোগিতা করতে সরকারের যে মহৎ উদ্দেশ্য ছিল তা স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণে ব্যাহত হয়েছে।

খোদ খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এসব তথ্য স্বীকার করেছেন। তিনিও বলছেন, সরকারিভাবে আমন ধান ক্রয়ে লটারির মাধ্যমে কৃষকদের তৈরি তালিকা সঠিক হয়নি।

বগুড়ার ধুনট থানার চরপাড়া গ্রামের আদর্শ কৃষক আকিমুদ্দিন জানান, যারা প্রকৃত কৃষক, প্রকৃত পক্ষেই যারা ধানের আবাদ করেছেন তাদের নাম লটারিতে ওঠেনি। কিন্তু যারা জীবনে কোনো দিন ধান চাষ করেননি তাদের নাম লটারিতে উঠেছে। আর তাদের টিকিট কিনে নিচ্ছে কিছু দালাল। সেই দালালরাই খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করছে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির আমলে সারের জন্য করা কৃষি কার্ডের ওপর ভিত্তি করে লটারি করায় বেশির ভাগ লটারি বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা পেয়েছে। চরপাড়া গ্রামে কৃষক রয়েছে প্রায় ১৫ জন। আর কৃষি কার্ড দেয়া হয়েছে ১৫০ জনকে। যারা ১ বিঘা জমি বর্গা চাষ করছে তারাও তখন কৃষি কার্ড করে নিয়েছে। এখন তারা জমি চাষ করে না। কেউ ভ্যান চালায়, কেউ রিকশা চালায়। কিন্তু তাদের কাছে কৃষি কার্ড রয়ে গেছে।

আকিমুদ্দিন বলেন, জমি চাষ না করলেও সরকারের সুবিধা যখন আসে তখন কৃষি কার্ড কাজে লাগায়। এবার গুদামে ধান সরবরাহের জন্য যখন লটারি করা হয়েছে তখন যারা জমি চাষ করে না তারাও আবেদন করেছে। যেহেতু তারা সংখ্যায় বেশি সে কারণে তাদের নামই বেশি উঠেছে, অন্যদিকে আসল কৃষকরা বঞ্চিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নে ধান উৎপাদনকারী নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন হলোখানা ইউনিয়নের কৃষি কার্ড না পাওয়া এক ইউপি সদস্য। তবে লটারিতে নয়, সুপারিশের মাধ্যমে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. উমর ফারুক।

বিষয়টি স্বীকার করে হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. উমর ফারুক বলেন, ‘আমি বলেছিলাম যে, আমার অনেক আবাদ আছে, সে জন্য আমার পরিবারের চারটি নামসহ পরিষদের ১২ জনের নাম দিতে। এটা নিয়ে যেহেতু কথা উঠেছে সেহেতু সংশোধন করে নেব।’

লটারি করার পরও কীভাবে আপনাদের সবার নাম আসলো? এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাত্র ১২/১৪টা নাম, খুব বেশি নয়!’

জানা গেছে, নাটোরের পুঠিয়া উপজেলা খাদ্যগুদামে লটারিতে ভুয়া কৃষকদের নাম দেখিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা মিলে সিন্ডিকেট করে গুদামে ধান দিয়েছে।

খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহের জন্য লটারির মাধ্যমে তালিকায় নাম ওঠে ৬২৮ জন কৃষকের। উপজেলার একাধিক কৃষকের অভিযোগ, তালিকায় যাদের নাম উঠেছে তাদের ভেতর বেশিরভাগই প্রকৃত কৃষক নন। তারা ধানের আবাদ করেনি কিন্তু লটারিতে নাম এসেছে। সেই ভুয়া কৃষক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাদের নামে খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করছে। মাঝ থেকে ভুয়া কৃষকরা টাকা পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য ক্রয় কমিটির সভাপতি মো. ওলিউজ্জামান বলেন, প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য লটারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা সঠিকভাবে যাচাই বাছাই করে ধান ক্রয় করছি। কৃষক বাদে কেউ ধান দিতে পারবে না।

এছাড়া মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় কৃষি অফিসের দায়িত্বহীনতার কারণে সরকারের এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন প্রকৃত কৃষকরা। রাজনগর উপজেলায় লটারির মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করায় ভাগ্য খুলেছে দালালের, অন্যদিকে কপাল পুড়েছে কৃষকদের। লটারিতে ধান সংগ্রহ করায় উপজেলার প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

রাজনগর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শাহাদুল ইসলাম বলেন, ধান বিক্রি করার জন্য সবার চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ কম থাকায় লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়েছে। বাছাইকৃতদের মধ্যে চাষাবাদ করেননি এমন কেউ থাকলে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রকৃত কৃষকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

সরকারিভাবে আমন ধান ক্রয়ে কৃষকদের লটারির মাধ্যমে তৈরি তালিকা সঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। গত শনিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনে আমন ধান সংগ্রহ উপলক্ষে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী খাদ্য অধিদফতর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে যে দুর্নাম রয়েছে সেগুলো ঘোচাতে সবার সহযোগিতা চান। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের হয়রানি ও কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না।

Check Also

মহাবিপন্ন চশমাপরা হনুমান

>> পৃথিবীব্যাপী ‘বিপন্ন’ আর বাংলাদেশে ‘মহাবিপন্ন’ চশমাপরা হনুমান >> ছয় বনে ৪০০ চশমাপরা হনুমানের বসবাস, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *