Home / বিশেষ প্রতিবেদন / আবার লাগামহীন পেঁয়াজ, পেছনে ছুটছে ভোজ্যতেল

আবার লাগামহীন পেঁয়াজ, পেছনে ছুটছে ভোজ্যতেল

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     বাজার ভর্তি দেশি-বিদেশি পেঁয়াজে। এরপরও নিত্যপণ্যটির বাজারে অস্থিতিশীলতা কাটছে না। গেল মাসের দুই সপ্তাহ খানিকটা লাগামে থাকলেও ফের দাম বাড়তে শুরু করেছে পেঁয়াজের। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাম বাড়ছে ভোজ্যতেলেরও। নতুন বছরের শুরুতেই এই দুটি নিত্যপণ্যে নির্বিচারে পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ ক্রেতার।

পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীরা এতদিন নানা অজুহাত দেখিয়ে এলেও এবার তারা যুক্তি দিচ্ছেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে গত এক সপ্তাহে বাজারে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ আসেনি। এছাড়া মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পাইকারদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিশোধন কারখানাগুলো ভোজ্যতেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলেই পাইকারি ও খুচরা বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে।

দেশের নিত্যপণ্যের প্রধান পাইকারি বাজার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সপ্তাহের প্রথম দিন শনিবার থেকেই পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলের ঊর্ধবগতির এই চিত্র পাওয়া গেছে। গতকাল পাইকারি এই বাজারে চীনের সাদা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি ৬০ টাকায়, মিসরের পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকা, পাকিস্তানের পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় এবং মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকায়। আর চাহিদার শীর্ষে থাকা দেশি পেঁয়াজ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের সপ্তাহে তারা চীনের পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ৪৫ টাকায়। অন্যান্য পেঁয়াজও বর্তমান দামের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা কম দামে বিক্রি করেছেন। তাদের দেয়া হিসাবে সব রকম পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা।

আর দেশি পেঁয়াজের দামে লাগামহীনতার পক্ষে ব্যবসায়ীদের সাফাই হচ্ছে, বাজারে এখন মিয়ানমারের পেঁয়াজ তেমন নেই। বাজারে এখন দেশীয় নতুন পেঁয়াজ উঠছে। তবে সেই পেঁয়াজ বিক্রির উপযোগী হতে সময় লাগবে অন্তত মাসখানেক। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পেছনে এটাই বড় কারণ।

খাতুনগঞ্জের হামিদউল্লাহ মার্কেটের পেঁয়াজের আড়তদাররা বলছেন, দেশি পেঁয়াজ নিয়েই বড় সমস্যা। অধিকাংশ পেঁয়াজ আসে পাবনা আর ফরিদপুর অঞ্চল থেকে। কিন্তু সেখানে বৃষ্টি হওয়ায় কৃষক পেঁয়াজ তুলতে পারেননি। তাই বাজারে দেশি পেঁয়াজের সংকট রয়েছে।

খাতুনগঞ্জে গত বৃহস্পতিবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। দুই দিনের ব্যবধানে গতকাল মণপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

ঢাকার বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে সব ধরনের পেঁয়াজের দাম কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ টাকা করে বেড়েছে। পলাশী ও হাতিরপুল বাজারে গতকাল পাকিস্তানের ছোট পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১২০ টাকা, বড় পেঁয়াজ ৮৫ টাকা এবং তুরস্কের বড় পেঁয়াজপ্রতি কেজি ৯৫ টাকায় বিক্রি হলেও দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ২০০ টাকার বেশি দামে। তবে দেশির পাশাপাশি ক্রেতাদের চাহিদায় থাকা মিয়ানমারের পেঁয়াজ দেখা যায়নি এই দুই বাজারে।

পলাশীর রাসেল স্টোরের মালিক মো. রাসেল বলেন, ‘গত সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম মোটামুটি ছিল। তবে এ সপ্তাহের প্রথম দিনই সব রকম পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আমরা পাইকারদের কাছ থেকে যেই দরে পণ্য কিনে আনি সামান্য কিছু লাভ করেই পণ্য বিক্রি করি। দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা থাকে পাইকারদের।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিকটন। অর্থাৎ মাসে ২ লাখ টন ও দিনে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিকটন পোঁজের চাহিদা রয়েছে। আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা পেঁয়াজ মিলিয়ে প্রতিদিন বাজারে ৭ হাজার ৮৯০ মেট্রিকটন সরবরাহ ছিল। অর্থাৎ দৈনিক চাহিদার চেয়েও সরবরাহ ছিল বেশি।

এরপরও পেঁয়াজের বাজারে অস্থিতিশীলতা গত বছরের অক্টোবর থেকে। ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর যুক্তি দেখিয়ে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। দেশের বাজারে চরম ঘাটতি দেখা দেয়। বিভিন্ন স্থলসীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আমদানির পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসে। এর বাইরে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আসে মিয়ানমারের পেঁয়াজ। আর বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।

তবে জাহাজে করা আসা এসব পেঁয়াজ চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। কারণ হিসেবে আমদানিকারকদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কৃষিজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র থেকে অনুমতি নিতে হয়।

জানা যায়, গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ৬৮ হাজার মেট্রিকটন। এর মধ্যে টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমার থেকে এসেছে প্রায় ৪৩ হাজার টন। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এসেছে ১২ হাজার টন পেঁয়াজ। বাকি ১৩ হাজার টন পেঁয়াজের মধ্যে কিছু বিমানে এবং কিছু ভারত থেকে এসেছে পুরোনো এলসির পেঁয়াজ। গত ডিসেম্বরে বাজারে দেশের পেঁয়াজ উঠতে শুরু করলে আমদানির পরিমাণও কমেছে বলে আমদানিকারকদের ভাষ্য।

পেঁয়াজের পেছনে ছুটছে ভোজ্যতেল

পেঁয়াজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্য ভোজ্যতেল। গেল বছরের নভেম্বর থেকে দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তে শুরু করে। তবে চলতি বছরের শুরুতে প্রায় লাগামহীন হয়ে পড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। গত এক মাসে প্রতি লিটার তেলে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। আর কেবল গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে তিন থেকে চার টাকা করে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত সপ্তাহে ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়া প্রতিমণ সয়াবিন তেল এ সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩৮০ টাকায়। আগের সপ্তাহে ২ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া সুপার সয়াবিন এ সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। আর পাম অয়েল গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৭৫০ টাকায়, যা এ সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়।

সে হিসেবে পাইকারি বাজারে গত সপ্তাহে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৯১ টাকায় যা চলতি সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৯৪ টাকা। একইভাবে সুপার সয়াবিন দাম বেড়ে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায় আর পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৮৩ টাকায়।

ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল বিভিন্ন ব্রান্ড ভেদে পুষ্টি ও তীর মার্কা ৪৯০ টাকা এবং রুপচাঁদা ৫১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এস আলম ও মুসকানের তেল ৪৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দেশে বছরে ১৪ লাখ টনের মতো ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর পুরোটাই আমদানি করা হয়। আমদানি করা তেল বোতলজাত করে বাজারে বিক্রি করে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, এস আলম, বসুন্ধরা, গ্লোবসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তবে ভোজ্যতেলের সিংহভাগই বিক্রি হয় খোলা পর্যায়ে।

ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিমণ সয়াবিন তেলের বুকিং রেট হচ্ছে ৯৩০ ডলার আর পাম অয়েল ৮৩০ ডলার। গত নভেম্বরে এই দাম ১০০ ডলার কম ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে মিল মালিকরা তেল বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। আর যাদের কাছে পুরনো বুকিং রেটের তেল যাদের ছিল তারাও বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন। মার্কেটে সরবরাহ কম থাকার কারণেই ভোজ্য তেলের দাম বাড়ছে বলে দাবি পাইকার ব্যবসায়ীদের।

Check Also

পোস্টারের দেয়ালে ঘিরেছে গোটা রাজধানী

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে নীলক্ষেত মোড়ে বিশাল ফটক তৈরি করেছিল ঢাকা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *