Saturday , January 18 2020
Home / উপ-সম্পাদকীয় / বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৈরাজ্যের কারণ আইনের শাসনের অভাব

বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৈরাজ্যের কারণ আইনের শাসনের অভাব

সরদার সিরাজ  :    দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই চরম নৈরাজ্য চলছে। এতে মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। জনমনে আতংকও সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, বিন্দু বিন্দু জলে যেমন সাগর সৃষ্টি হয়, তেমনি বিশৃঙ্খলা বাড়তে বাড়তে বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর প্রধান কারণ, আইনের শাসনের অনুপস্থিত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আইন অমান্য হতে হতে বে-আইনই এখন আইনে পরিণত হয়ে হয়েছে, যা দেশের জন্য মারাত্মক বিপদজনক, চরম ক্ষতিকর। এ জন্য প্রধানত দায়ী শাসকশ্রেণি ও আইন বাস্তবায়নকারী সরকারি লোকজন। মানুষের জন্মগত স্বভাবই হচ্ছে ইচ্ছামতো কাজ করা। কিন্তু সে কাজ যদি অন্যায় হয় তাহলে, তা দমন করার দায়িত্ব সরকার ও সরকারি লোকজনের। এই ব্যবস্থা সভ্যতার প্রারম্ভ থেকেই শুরু হয়েছে। যাকে বলে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন, সেটাই সরকার ও সরকারি লোকজনের দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্ব পালিত হচ্ছে না এ দেশে এবং তা বহুদিন যাবত। ফলে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সা¤প্রতিক সংঘটিত কিছু ঘটনার বর্ণনা দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১’ বাস্তবায়নকালে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা অঘোষিত ধর্মঘট করে কয়েকদিন। এতে মানুষের চলাচলে চরম ব্যাঘাত ঘটে। মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হয় নারী-শিশু ও বয়স্ক মানুষসহ অগণিত মানুষ। পণ্য মূল্য বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আইনটিকে দেশের বেশিরভাগ মানুষ ও মিডিয়া প্রকাশ্যে সমর্থন করে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার অভিমত ব্যক্ত করেছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকের পক্ষ থেকেও আইনটিকে ভাল বলে অবহিত করা হয়েছে। তবে তাদের কেউ কেউ কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনীর দাবি জানিয়েছে। ভালো কথা। যে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষেরই যে কোন বিষয়েই মতামত বা দাবি থাকতে পারে। কিন্তু সেটা আদায়ের নির্দিষ্ট নিয়ম বা প্রক্রিয়া আছে। আর সেটা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সুরাহা করা। তাতে কাজ না হলে নোটিশ দিয়ে ধর্মঘট/মানব বন্ধন বা অন্যভাবে প্রতিবাদ করা। এটাই নিয়ম। কিন্তু এবারের পরিবহন ধর্মঘটে এসবের কিছুই করা হয়নি। আচমকা বিনা নোটিশেই সারাদেশে একযোগে সড়কের যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে (পরবর্তীতে জলপথেরও) দেশবাসীকে জিম্মি করে ফেলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এরূপ কাজ তারা আগেও করেছে অনেকবার। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে এই আইনটির বাস্তবায়ন আগামী জুন মাস পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নিয়ে চারটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তার ফলাফল কি হবে তা অজানা। ফলে এই কল্যাণকর আইনটি আর বাস্তবায়ন হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আইনটি বাস্তবায়ন না হলে সড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও ব্যাপক জানমালের ক্ষতি অব্যাহতই থাকবে।

জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বিল পাশ হয়েছে গত বছরের অক্টোবর মাসে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে খোলামেলা আলোচনা শেষে আইনটি প্রণয়ন করা হয়। খুদে শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ বলে প্রবল আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ মাস আগে আইনটি প্রণীত হয়েছে। তবুও এতদিন তা কার্যকর করা হয়নি। কার্যকর করতে গিয়ে একের পর এক সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে-প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি,বিধিমালা নেই ইত্যাদি। কেন এসব হলো না এতদিনে? তার সদুত্তর নেই। দ্বিতীয়ত: এর আগেই যানবাহন ও সড়ক নিয়ে অনেক আইন আছে। এবং সে আইন বাস্তবায়ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট লোকজন আছে। কিন্তু আইনগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে চলমান যানবাহন ও চালকের বেশিরভাগই অবৈধ হয়েও রাস্তায় চলাচল করছে? এমনকি প্রতিটি গাড়িতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপন, ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ ও হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের বিষয়ে মাননীয় হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে ২০০৭ সালে। কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক ও যানবাহন বিষয়ে কিছু নির্দেশ দিয়েছেন কিছুদিন আগে। তাও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এসব নানা কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। ফলে দুর্ঘটনা বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক অব্যাহতই রয়েছে। মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত চরম আতংকে থাকে নিজে ও আপনজনরা। বলা হয়ে থাকে, যানবাহন আইন বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে (অন্য বিভিন্ন সরকারি অফিসেও বহু পদ শূন্য আছে বহুদিন যাবত। যার মোট সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এতে করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজের চরম ব্যাঘাত ঘটছে)। কিন্তু কেন লোকবলের অভাব থাকবে? কয়েক কোটি বেকারের দেশে অসংখ্য মানুষ লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। এই অবস্থায় লোকবলের ঘাটতি থাকবে কেন? তবুও এসব হচ্ছে। অথচ শুধু একটি বিষয়কেই প্রাধান্য দেওয়া হলেই অবৈধ যানবাহন ও চালকের সমস্যা দূর হয়ে যেত। আর সেটা হচ্ছে, যে যানবাহন ও চালক অবৈধভাবে চলাচল করবে তার মালিককে কঠোর শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা। এটা চালু করা হলেই মালিক ভয়েই অবৈধ যানবাহন ও চালক বন্ধ করে দিত কয়েকদিনের মধ্যেই। ফলে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে মানুষকে চরম হয়রানি করে অবৈধ যানবাহন ও চালক বন্ধ করার দরকার হতো না। উপরন্তু বেশি পুলিশেরও প্রয়োজন হতো না। তবুও তা করা হয়নি। কারণ,জবাবদিহিতা নেই। আইনের শাসন অনুপস্থিত। যেভাবেই হোক না কেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দুর্ঘটনা বন্ধ করে জান-মাল রক্ষা করতে হবে। এটা না হলে শত উন্নতিতেও মানুষের মন তুষ্ট হবে না। সে লক্ষ্যে সড়কের নতুন আইনের আপত্তিকৃত অংশের বাস্তবায়ন আপাতত বন্ধ রেখে বাকী অংশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। নতুবা মানুষের ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে তা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অভিমত স্মরণীয়। প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদ গত ২৩ নভেম্বর বলেছেন, ‘পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর, লুটেরা ও মজুদদারদের মধ্যেও ঐক্য রয়েছে। এখন এসব দুষ্কৃতকারীর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ ডিএমপি’র কমিশনার গত ২১ নভেম্বর সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা আরেকবার রাস্তায় নামলে পুলিশ, গাড়িচালক মালিক-শ্রমিক কারও পিঠের চামড়া থাকবে না। তাই সাবধান হোন। আইন মেনে চলুন।’

গত ২০ নভেম্বর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জানানো হয়েছে যে, ‘সারাদেশে প্রায় ৪৯,১৬২টি নদী দখল হয়েছে। এ সকল নদী দখলমুক্ত করার জন্য কমিশন কাজ করছে।’ কিন্তু এই কুকর্ম তো একদিনে সংঘটিত হয়নি। বহুদিন যাবত দিনে দিনে হয়েছে এবং তাতে অসংখ্য নদীখেকো জড়িত আছে। তাতে করে নদী, মানুষ, জীব বৈচিত্র্য ইত্যাদির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে ও হচ্ছে। ‘নদীকে জীবন্ত প্রাণ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবুও নদীকে দখল করে ধ্বংস করার কাজটি চলছে নির্বিঘেœ। কেন? এটা বন্ধ করার জন্য তো সংশ্লিষ্ট সরকারি লোকজন আছে। তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এর কারণ, আইনের শাসনের অনুপস্থিত। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। স¤প্রতি নদীকে দখলমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। এটা দেশের জন্য মহা কল্যাণকর কাজ। তথাপিও তা কোথাও কোথাও স্থায়ী হচ্ছে না। পুনঃদখল হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কতিপয় স্থানে রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। যেমন: ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে ওয়াইজঘাট থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত একসময় ছিল শত শত আড়ত ও দোকানপাট। মাস ছয়েক আগে নদীর পাড় থেকে এসব স্থাপনা অপসারণ করেছে বিআইডবিøউটিএ। কিন্তু এখন ওই জায়গাতেই বাজার বসিয়েছে খোদ বিআইডবিøউটিএ। এটা সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের চাপে করা হয়েছে বলে গত ২৩ নভেম্বর এক দৈনিকে প্রকাশ। এরূপ ঘটনা আরও আছে বিভিন্ন স্থানে। এতে করে নদী রক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে রেল, বন, খাসজমিসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে।এতে সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ দেশের চরম ক্ষতি হচ্ছে।

দেশের বেশিরভাগ বিল্ডিং ও স্থাপনা বিধি মেনে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে প্রায়ই বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। তবুও এই বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।ফলে দুর্ঘটনা অব্যাহত আছে। যেমন: বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডে ব্যাপক ক্ষতির পর রাজধানীর বহুতল ভবনের অবস্থা তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে রাজউক আওতাধীন অঞ্চলে ১০ তলার বেশি ১,৮১৮টি বহুতল ভবনের বেশিরভাগেই ত্রুটি পাওয়া গেছে। এগুলো হলো নকশা ছাড়া নির্মাণ, নকশায় ব্যত্যয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, জরুরি সিঁড়ির অপ্রতুলতা ও আবাসিক অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার। তন্মধ্যে জরুরি সিঁড়ির অপ্রতুলতা রয়েছে প্রায় ৭১% ভবনে। যথাযথ ও প্রয়োজনীয় জরুরি সিঁড়ি নেই ১,২৮৭টি ভবনে। এছাড়া নকশা না নিয়ে বা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনের সংখ্যা ৪৭৮। নকশা দেখাতে পারেননি ৪৭৫টি ভবনের মালিক। এর মধ্যে ৪৪টি ভবন রয়েছে সরকারি মালিকানায়। গত ২৫ মে প্রকাশ করা রাজউকের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এরূপ অবস্থা কম-বেশি সারাদেশেই বিদ্যমান। অথচ বিল্ডিং ও স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া থেকে শুরু করে নির্মাণ তদারকির জন্য লোকজন আছে সংশ্লিষ্ট বিভাগে। কিন্তু তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। উপরন্তু অনেকের যোগসাজশও রয়েছে। কিন্তু তাদের তেমন কোন শাস্তি হয়নি। এ ক্ষেত্রে আর একটি মারাত্মক বিষয় হচ্ছে- ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা। এসব ঢাকা,চট্টগ্রামসহ সারাদেশেই রয়েছে এবং তা অসংখ্য। যা সরকারিভাবেই সনাক্ত করা হয়েছে । তবুও তা ভেঙ্গে ফেলা হয়নি। তাই সেখানে বহু মানুষ বাস করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যও চলছে। তাতে দুর্ঘটনাও ঘটে অনেক জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। এই অবস্থায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সম্পূর্ণ এলাকায় ম্যাচাকার হয়ে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাই এসব স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার জন্য বহুবার সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নির্দেশ জারী করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর হয়নি কোনটিই। তদ্রæপ আবাসিক এলাকা হতে বাণিজ্যিক কারবার সরিয়ে ফেলার জন্য বহুবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়ে বসবাসের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। তাই ঢাকা অভিজাত এলাকায় এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হয়েছিল। হঠাৎ করে তা বন্ধ হয়ে গেছে । এসবের কারণ, আইনের শাসনের অনুপস্থিত।

দেশে মজুদ বিরোধী আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, নিরাপদ খাদ্য আইন ইত্যাদি সম্বলিত বহু আইন আছে। কিন্তু কোনটিরই তেমন বাস্তবায়ন নেই। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। তথা বিশুদ্ধ খাবারের চেয়ে ভেজাল খাদ্যের হার বেশি হয়েছে। আর মূল্য বৃদ্ধি তো সকল সীমা অতিক্রম করেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছে পেঁয়াজ। নিত্য ব্যবহার্য এই পণ্যের মূল্য বাড়তে বাড়তে ট্রিপুল সেঞ্চুরি অতিক্রম করেছিল। কিনতে না পেরে অনেক মানুষ এই পণ্যের ব্যবহার বন্ধ বা হ্রাস করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও তাই করেছেন বলে জানিয়েছেন এবং মানুষকে পেঁয়াজ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবুও পেঁয়াজের সংকট দূর হয়নি। ফলে বিষয়টি টক অব দি কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ভারত হঠাৎ করে রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে এই মহাসংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের সময় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের আদেশ প্রত্যাহার করার আশ্বাস দিয়েও ভারত তা রক্ষা করেনি।অথচ ভারত মালদ্বীপে পেঁয়াজ রফতানি অব্যাহত রেখেছে। এই অবস্থায় সংকট মোকাবেলার জন্য পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে বিমানে। এছাড়া, মিশর, তুরস্ক, ইরান, মিয়ানমার থেকেও বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। তবুও সংকট দূর হয়নি। মূল্য অত্যধিকই রয়েছে। তাই স্বল্প মূল্যে টিসিবির পেঁয়াজ কেনার জন্য দীর্ঘ লাইন ধরেছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ। অথচ দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি খুব বেশি নয়। কয়েক লাখ মে:টন মাত্র। তবুও পেঁয়াজ নিয়ে লঙ্কাকান্ড বেঁধে যাওয়ার কারণ-ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথেই দেশের কতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। ফলে সরবরাহ কম জনিত কারণে মূল্য অস্বাভাবিক হয়ে যায়। অভিযান চালিয়ে অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করেও তেমন সুফল পাওয়া যায়নি।

পেঁয়াজের এই সংকটের জন্য ভারতের রফতানি বন্ধ ছাড়াও পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি রয়েছে বলে মিডিয়ায় প্রকাশ। অর্থাৎ দেশে যা উৎপাদন হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। অবশ্য দেশের বেশিরভাগ পরিসংখ্যান নিয়েই চরম বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া, অসত্য কথা বলা তো রয়েছেই। যা’হোক, পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির পরপরই হঠাৎ করে চাউল, আটা, লবণ, শাক-সবজীসহ নানা ভোগ্য পণ্যের মূল্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের মধ্যে হাহাকার বিরাজ করছে। এর কারণ,সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট করে পণ্য মূল্য বৃদ্ধি ঘটানো আজ নতুন নয়। এটা অনেক ব্যবসায়ীর মজ্জাগত অভ্যাস। তবুও তাদের বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে তারা লাই পেতে পেতে এখন দেশের কর্ণধার বনে গেছে। অথচ এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে ফেলা পুলিশের কাছে সামান্য ব্যাপার। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে লবণ। পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করার সময়েই লবণের মূল্য বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিছুটা সফলও হয়েছিল। মূল্য কেজি প্রতি শত টাকা হয়েছিল কোথাও কোথাও (এরূপ অবস্থা হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। তখন লবণের সের ৮০ টাকা হয়েছিল। আমি নিজে ২০ টাকা দিয়ে এক পোয়া লবণ কিনে ছিলাম)। ফলে লবণ নিয়েও মানুষের মধ্যে চরম আতংক সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের ব্যাপক অভিযানের ফলে এবং অনেককে কঠোর শাস্তি দেওয়ার কারণে তা দমন হয়েছে। তদ্রæপ ক্যাসিনো বাণিজ্যও বন্ধ করেছে পুলিশ। অথচ এই চরম জঘন্য কাজটি কয়েক বছর চলেছে অবাধে। তাও খোদ রাজধানীতে এবং পুলিশের গোচরেই। পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। উপরের নির্দেশ না পাওয়ার কারণেই তারা তা করতে পারেনি বলে তাদের অনেকের অভিমত। এখন উপরের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে তা দমন করে ফেলেছে তারা। তদ্রæপ তারা জঙ্গি দমনেও সফল হয়েছে। তাই পুলিশকে যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়,তাহলে দেশের অনেক অপরাধ দমন করতে সক্ষম তারা। সে যোগ্যতা তাদের রয়েছে। তাই বলে পুলিশের সবাই যে ধোয়া তুলসী পাতা,তা নয়। পুলিশের মধ্যে অনেক খারাপ লোক রয়েছে। যারা মাদক,চাদাবাজীসহ বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্ট। অনেকের শাস্তিও হয়েছে। তবুও তাদের কারণেই ভাল পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তদ্রæপ অন্য প্রতিষ্ঠানের লোকজনেরও। অথচ দেশের আইনের বেশিরভাগই খুব ভাল, বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে ভাল। কিন্তু তা কার্যকর করার অভাবে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে,তারও বেশিরভাগই নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে না। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে!

Check Also

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ – নাগরিক ভাবনা

জ্যোতিষ মন্ডল  :   ১৯৯১ সনের অগোছালো মূল্য সংযোজন কর আইনটিকে যুগোপযোগী করার উদ্দ্যেশ্যে ভ্যাট ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *