Saturday , December 14 2019
Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক প্রবীণদের আপন ঠিকানা

বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক প্রবীণদের আপন ঠিকানা

মো. ফুয়াদ হাসান  :    জন্মগতভাবেই মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী। মানুষের প্রথম জীবন আর শেষ জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য একটা মিল রয়েছে। জীবনের সূচনালগ্নে শিশু অনেক আদর-যত্নে বড় হয়ে ওঠে। ওই শিশু যখন প্রবীণ হয়, তখন তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি কমে যায় এবং নির্ভরতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। সক্ষম মানুষটি এক সময়ে নির্ভর মানুষকে সহায়তা দিয়েছেন। যদি তিনি কখনো নির্ভরশীলতার বাঁধনে আটকে পড়েন, তখন তিনিও কোনো সক্ষম ব্যক্তির সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখেন। এটিই সহজবোধ, দায়িত্ববোধ ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।

\হবর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির নানাবিধ এই যুগে ক্রমান্বয়ে যৌথ পরিবার ভেঙে সৃষ্টি হয়েছে ছোট পরিবার। স্বামী-স্ত্রী এবং একটি বা দুটি সন্তান নিয়ে গঠিত হয় এসব পরিবার। আধুনিক সভ্যতার সব বিলাসী উপকরণ দিয়ে সাজানো হয় সে সংসার। নেই কেবল প্রবীণ বাবা-মায়ের উপস্থিতি।

এ ছাড়াও পারস্পরিক ঝামেলা, যুগের চাহিদা কিংবা অর্থনৈতিক সংকট যে কারণেই হোক, ভাই ভাই আলাদা পরিবার গড়ে তোলেন। এ ক্ষেত্রে প্রবীণদের পড়তে হয় আর এক দুর্ভোগে, হয়ে পড়েন অবহেলার পাত্র। দেখা যায়, সংসার ভাগের সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবাও ভাগ হয়ে যান। দুই ছেলে থাকলে এক ছেলের সঙ্গে মা এবং অন্য ছেলের সঙ্গে বাবা থাকেন। প্রবীণ বয়সে স্বামী কিংবা স্ত্রী কেউই একজনকে রেখে আরেকজন আলাদা খেতে কিংবা দূরে থাকতে চান না। কিন্তু অসহায়ত্ব তাদের বাধ্য করে।

শুধু তাই নয়, বৃদ্ধ বাবা-মার সম্পদ দখল করে তাদের করে আরো অসহায় ও নির্ভরশীল। আর এই অসহায়তার সুযোগে তাদের ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন, যেন তারা এই পরিবারের কেউ না। আধুনিক শিক্ষাই শিক্ষিত অনেক ব্যক্তিই বৃদ্ধ বাবা-মাকে রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে।পশ্চিমা সংস্কৃতির নির্মম ও কলঙ্কময় উপহার প্রবীণ নিবাস ও বৃদ্ধাশ্রম ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে আমাদের জাতীয় জীবনকেও। হয়ে উঠেছে সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যা মানবতার নির্মম বন্দিশালা।

আমাদের সমাজে অনেক বাবা-মা এতটাই অবহেলিত যে, জীবনের শেষ দিনগুলোকে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় না সন্তানদের সংসারে। রাতের আঁধারে ঘুমন্ত মাকে ফেলে আসে শহরের রাস্তায়।

মাত্র কয়েকদিন আগে দৈনিক খবরের কাগজে এসেছে, বরিশালে ৬৫ বছর বয়সের জোহরা বেগম নামের এক বৃদ্ধাকে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় ফেলে গেছে স্বজনরা। চার সন্তানের জননী বৃদ্ধা স্বদেশি সাহার সন্তানদের সংসারে জায়গা হয়নি তার, শেষ পর্যন্ত ফেনী শহরের রাস্তায় ফেলে গেলেন এক ছেলে।

শুধু জোহরা বেগম ও স্বদেশি সাহা নয়, এমন হাজার জোহরা বেগম নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে আমাদের দৃষ্টির অগোচরে। গর্ভধারণ করা সন্তানদের প্রতি তবুও তাদের না আছে কোনো আক্ষেপ, না আছে কোনো অভিযোগ। তাদের মনোবাসনা একটাই জীবনের শেষ দিনগুলো সন্তানদের সঙ্গে কাটাতে চায়। কিন্তু তাদের এই আশায় যেন বিষ ঢেলে দিচ্ছি আমরা।

বৃদ্ধ বাবা-মার প্রতি আমরা কতটা নির্দয় তা আরো কিছু নির্যাতনের ঘটনার দ্বারা বুঝা যায়, মে মাসের ঘটনা, নড়াইলে সন্তানদের অত্যাচার সইতে না পেরে অসহায় মা আশ্রয় নিয়েছে মন্দিরে।

২২ জানুয়ারির ঘটনা শেরপুরের নকলা উপজেলায় প্রবীণ বাবা-মার জায়গা হয়নি সন্তানদের সংসারে, নিরুপায় হয়ে ঠাঁই নিয়েছেন ইউপি ভবনের বারান্দায়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগররে বৃদ্ধ মাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের মতো নির্মম, নির্দয় ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে।

অল্প কিছু নির্যাতনের বার্তা জনসমক্ষে এলেও সিংহভাগ নির্যাতনের কালো বার্তা রয়ে যাচ্ছে আমাদের সবার আড়ালে।

শত কষ্টের মাঝেও মা-বাবা তাদের সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ করতে রাজি নয়।

এসব নির্যাতনের ঘটনা এটাই প্রকাশ করে যে, বিকৃত মানবিকতার কাছে জন্মদাতা মা-বাবাও নিরাপদ নয়। কতটা হীন মানবিকতার চর্চা করলে, সমাজের কতটা অধঃপতন ঘটলে সন্তানের হাতে মা-বাবা নির্যাতিত হয়। তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু ঠিক যদি এটার বিপরীত দৃশ্যপট লক্ষ্য করি, ২০১৭ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য

মা’কে পিঠে নিয়ে ২৯ মাইল হেঁটে বাংলাদেশে এসেছেন রোহিঙ্গা সাইফুলস্নাহ। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর তান্ডব থেকে জীবন বাঁচাতে ৯৫ বছর বয়সী মাকে নিয়ে একটানা চারদিন হেঁটেছেন তিনি। পথের মাঝে অনেকেই দেখেছেন তাদের মা-বাবাকে ফেলে আসতে, কিন্তু সাইফুলস্নাহ পারেনি তার বৃদ্ধ মাকে ফেলে আসতে। তাই সীমিত আয় ও আর্থিক অনটন থাকলেও বৃদ্ধ বাবা-মাকে পরিবারের সঙ্গে রাখা আমাদের কর্তব্য। যাতে তারা জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবারের সবার সঙ্গে হাসি আনন্দে কাটাতে পারে। আজকের তরুণরাই তো আগামী দিনে প্রবীণ। তাই বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক প্রবীণদের আপন ঠিকানা।

Check Also

আমাদের সন্তানদের মেধা ও সম্ভাবনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

জামালউদ্দিন বারী  :     ব্রেইন ড্রেইন বা মেধা পাচার সম্পর্কে এক সময় অনেক লেখালেখি হতো। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *