Home / বিশেষ প্রতিবেদন / সচেতনতার জন্য প্রচারণা থাকলেও চর্চা নেই

সচেতনতার জন্য প্রচারণা থাকলেও চর্চা নেই

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     নতুন সড়ক আইন চালু হওয়ার পর সমালোচনার মুখে সেটি কার্যকর করার জন্য দুই দফায় দুই সপ্তাহ পিছিয়ে নেওয়া হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, এ সময়ে কোনো মামলা কিংবা জরিমানা করা হেব না। চালক-মালিক, যাত্রী-পথচারীসহ সংশ্লিষ্টদের আইনটি নিয়ে সচেতন করা হবে। এ জন্য সারা দেশে চালানো হবে প্রচারণা। সেই হিসাবে আর দুদিন বাদে নতুন সড়ক আইনে শাস্তি দেওয়া শুরু হওয়ার কথা।

কিন্তু গত প্রায় দুই সপ্তাহে আইনটি নিয়ে প্রচারণা দেখা গেলেও এর অনুশীলন দেখা যায়নি। না ট্রাফিক পুলিশের মাঝে, না পথচারীদের। তারা যত্রতত্র ঝুঁকি নিয়ে রাস্তার পারপার হচ্ছেন। ট্রাফিক পুলিশকেও দেখা যায় না এ কাজে পথচারীদের নিবৃত্ত করতে।

আর গাড়ির চালকদের মধ্যে বিশেষ করে টার্মিনালে কিছুটা শৃঙ্খলা এলেও অধিকাংশ চালক এখনো যত্রতত্র গাড়ি থামান। যাত্রী তোলেন কিংবা নামান। তাদের মধ্যে এখনো আগের বেশির ভাগ প্রবণতা থাকলেও ‘সড়ক পরিবহণ আইন ২০১৮’ সামনে রেখে কিছুটা সতর্ক অবস্থায় দেখা যায়। মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ছাড়া চলাচলের প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে।

চালকদের মধ্যে যেটুকু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা পুলিশের প্রচারণার মধ্য দিয়ে এসেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পথচারীদের বেলায় কোনো পরিবর্তন হয়নি এখনো।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, পথচারীরা যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার হচ্ছে। পাশে ফুটওভার ব্রিজ রেখে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন রাস্তার ওপারে। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে আয়েসি ভঙ্গিতে পার হচ্ছেন রাস্তা। তাহলে দুই সপ্তাহের প্রচারণার ফল কী হলো?

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রচারণার পাশাপাশি সড়কে অনুশীলনেরও দরকার ছিল। বিশেষ করে যেসব পথচারী বেআইনিভাবে রাস্তার পার হচ্ছেন তাদের আটক করে প্রতীকী জরিমানা করা যেত। গাড়ির চালকদের প্রতীকী মামলা দিয়ে অনুশীলন করা যেত নতুন আইনের।

তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, আইন কার্যকর করার আগে সবাইকে সে সম্পর্কে ঠিক ঠিক জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শনিবার থেকে নতুন আইনে মামলা কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

৭৯ বছরের পুরনো আইনের ভিত্তিতে তৈরি মোটরযান অধ্যাদেশ বাতিল করে গত ২২ অক্টোবর নতুন সড়ক আইন কার্যকরের গেজেট জারি করে সরকার। গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর এই আইনে আগের তুলনায় দ-ের পরিমাণ বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। কিন্তু যাদের জন্য এই আইন, তাদের অনেকেই আইন সম্পর্কে অবগত নয়। এমন যুক্তির কারণে প্রথম ধাপে এক সপ্তাহ এবং পরের ধাপে আরও এক সপ্তাহ শিথিল রাখা হয় আইনের প্রয়োগ।

রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশ বক্সগুলো থেকে নিয়মিত মাইকিং করতে দেখা যাচ্ছে। লিফলেট বিতরণ এবং পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের মৌখিকভাবেও আইন সম্পর্কে ধারণা দেয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

নগরির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চোখে পড়েছে ট্রাফিক বিভাগের সক্রিয়তার চিত্র। সেই সঙ্গে যানবাহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলেও মনে হয়। কিন্তু সড়ক পারাপারের শৃঙ্খলা একেবারেই নগণ্য।

নতুন আইনে যত্রতত্র রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে পথচারীদের। তাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, এ ব্যাপারে খুব একটা গরজ দিচ্ছে না তারা।

রাজধানীর কল্যাণপুর, শ্যামলি, শিশুমেলা, কলেজগেট, আসাদগেট, ফার্মগেট, বাংলামোটর, শাহবাগের প্রতিটি মোড়েই সড়ক পারাপারের জন্য রয়েছে ফুটওভার ব্রিজ বা পদচারী সেতু। কিছু পথচারী এই সেতু ব্যবহার করলেও বেশির ভাগই রাস্তার পারপার করছেন সেতুর নিচ দিয়ে।

শ্যামলি পদচারী সেতুর নিচ দিয়ে পথচারীদের রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে সড়ক বিভাজকে উচু প্রাচীর দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বিভাজকের ওপর দিয়েই পারাপার হচ্ছেন অনেক পথচারী। একই অবস্থা শ্যামলি শিশুমেলার সামনে নবনির্মিত সেতুর নিচে। এখানে পদচারী সেতু ব্যবহারকারীর তুলনায় নিচ দিয়ে পারাপার হওয়া পথচারীর সংখ্যা বেশি।

ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হওয়া একজন পথচারীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি রেগে যান। বলেন, ‘এতো সময় নেই। আপনি আপনার কাজ করেন।’

একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে আরও কয়েকজন পথচারীর কাছ থেকে। এক পথচারী বলেন, ‘আমার জীবন আমি রিস্ক নিচ্ছি, আপনার কী আর সরকারের কী? যখন মামলা দিব তখন দেখে নিব।’

একই চিত্র দেখা গেছে শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। হাসপাতালে আগত রোগী, রোগীর স্বজনদের পাশাপাশি সড়ক আইনের তোয়াক্কা করছেন না সরকারি এই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও।

পদচারী সেতু থাকলেও তার নামমাত্র ব্যবহার দেখা গেছে আসাদগেটে। একই অবস্থা বাংলামোটর মোড় ও শাহবাগে। ফার্মগেটের দুইট পদচারী সেতুর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা গেলেও এর নিচ দিয়ে হুটহাট ছুট দেয়া পথচারীর সংখ্যাও কম নয়।

পথচারীদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ পরিবহন চালকরা। বিকাশ পরিবহণের চালক দেলোয়ার হোসেন জানান, নতুন আইনে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু পথচারীরা চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পারাপার হয়। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।

নতুন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় কাউকে আহত করলে চালকের সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকার জরিমানা এবং ৩ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

চালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আইনে কড়াকড়ি বেশি থাকলেও খারাপ হয় নাই। লাইসেন্স না থাকলে কিসের ড্রাইভার। কিন্তু পাবলিকরে আগে সামলান। এরা আইসা গাড়ির নিচে পরলে তো নিজেও মরবো, আমগোও মাইরা যাইবো।’

নতুন আইন সম্পর্কে সতর্ক পরিবহণ মালিকরাও। মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল রুটে চলাচলকারী রজনীগন্ধা পরিবহনের মালিক আব্দুল কাদির বলেন, ‘লাইসেন্স ছাড়া আমরা কোনো ড্রাইভার আগেও দিতাম না, এখন তো আগের চাইতে অনেক বেশি সতর্ক। গাড়ির ফিটনেসের বিষয়েও আমরা সতর্ক। এ ছাড়া ড্রাইভার এবং হেলপারদেরও আমরা নতুন আইন সম্পর্কে জানিয়েছি। পুলিশ মাইকিং করছে। সেক্ষেত্রে তারাও সতর্ক রয়েছে।’

মহানগর ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ জানান, ‘আইন কার্যকর করার আগে যাদের উপর আইন প্রয়োগ করা হবে তাদের সে সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্দেশনা অনুযায়ী শনিবার থেকেই নতুন আইনে মামলা করা হতে পারে।’

আইন প্রয়োগের আগে প্রচারণা মাধ্যমে সুফল আসছে জানিয়ে যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘নতুন একটি আইন করা হলে, আইন যারা প্রয়োগ করেন তাদের যেমন জানার বিষয় থাকে। একইভাবে আইনটা যাদের জন্য করা হয়েছে বা যাদের উপর প্রয়োগ করা হবে, যারা ভুল করতে পারেন, তাদের নিজ গরজেই জেনে-শুনে আইন মেনে নেয়ার দায়-দায়িত্ব রয়েছে।’

নতুন আইনের শাস্তি

নতুন আইনে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাসের জেল হতে পারে। ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করলে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত জেল। রেজিস্ট্রেশন বিহীন গাড়ি চালালে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা সর্বোচ্চ ছয় মাস জেল।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাস জেল। ট্রাফিক সংকেত অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ একমাস জেল। অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর জেল। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা একমাস জেল।

অবৈধ পার্কিং এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, উল্টো পথে গাড়ি চালালে ১০ হাজার টাকা, হেলমেট না থাকলে ১০ হাজার টাকা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালালে ১০ হাজার টাকা, সিটবেল্ট না বাঁধলে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা।

এ ছাড়া মহাসড়কে ধীরগতিতে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা এক মাস জেল। আবার বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা বা তিন বছর জেল।

Check Also

অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ ঋণ পাঁচ মাসেই

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের মাত্র পাঁচ মাসে বছরের লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *