Friday , November 15 2019
Home / উপ-সম্পাদকীয় / আবরার হত্যার রেশ না কাটতেই পলিটেকনিকের প্রিন্সিপালকে পুকুরে নিক্ষেপ

আবরার হত্যার রেশ না কাটতেই পলিটেকনিকের প্রিন্সিপালকে পুকুরে নিক্ষেপ

মোবায়েদুর রহমান  :    ছাত্রলীগের অপকর্মের ক্যাটালগ তৈরি করলে তার সর্বশেষ সংযোজন হবে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপ্যাল অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিনকে চ্যাংদোলা করে পুকুরের পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা। এর আগে তারা অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর মোতাবেক, পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে সপ্তম পর্বের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা কামাল হোসেন সৌরভের নেতৃত্বে তার সহযোগী নেতাকর্মীরা শনিবার দুপুরে এই অমার্জনীয় কিন্তু ভয়াবহ কান্ড ঘটায়। কামাল হোসেন সৌরভ ছাড়াও তার আর যে ৫/৬ জন সহযোগী অধ্যক্ষকে মারপিট করে ও পুকুরে ফেলে দেয় তারা সকলে ছাত্রলীগের নেতা। প্রিন্সিপ্যাল বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করেছেন। মামলার পর ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ২৫ জনের মধ্যে ৫ জন প্রিন্সিপ্যালকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলো। এই ৫ জনই ছাত্রলীগের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নেতা। ভিডিও ফুটেজের সাথে মিলিয়ে এই ৫ জনকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শনিবার রাতে এক টেলিভিশন সাক্ষাতকারে অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন জানান, তার সৌভাগ্য যে, তিনি সাঁতার জানতেন। তাই সাঁতার কেটে তিনি পুকুর পার হয়ে অপর পাড়ে যান। এভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তিনি বলেন, তিনি যদি সাঁতার না জানতেন তাহলে নির্ঘাত মারা যেতেন। খবরে প্রকাশ, পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।

ছাত্রলীগের এই কাজ যে অ্যাটেমপ্ট টু মার্ডার, এতে কোনো সন্দেহ নাই। ধরে নেওয়া খুবই সম্ভব যে, হত্যার উদ্দেশ্যেই অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো। সাঁতার না জানলে তো তিনি পুকুরের পানিতেই ডুবে মারা যেতেন।

আমাদের অবাক লাগে এই ভেবে যে, বুয়েটের ছাত্র আবরারের পাশবিক হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আর কোনো ছাত্র নয়, একেবারে প্রিন্সিপ্যালকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের দোষ কী? দোষ হলো, তিনি বেআইনীভাবে তাদেরকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেননি।

ছাত্রলীগদের আর কত বাড়তে দেওয়া হবে? বাড়তে বাড়তে তারা যে একেক জন একেকটা মনস্টার হয়ে গেছে। যেখানেই যে অপকর্ম ঘটুক না কেন, তার পেছনেই রয়েছে হয় ছাত্রলীগ, না হয় যুবলীগ। কথায় বলে, সারা অঙ্গে ব্যাথা/ মলম দেবো কোথা। বাংলাদেশব্যাপী প্রতিটি ইউনিভার্সিটি, কলেজ এবং স্কুলে ছাত্রলীগের শাখা রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে, যেখানেই যত অপকর্ম সেখানেই রয়েছে ছাত্রলীগ। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হত্যা, ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি ইত্যাদি সকল বিষয়েই জড়িত রয়েছে ছাত্রলীগ। বিগত ১০ বছরের সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা উল্টালে ছাত্রলীগের অপকর্ম সম্পর্কে এত সংবাদ বেরিয়ে আসবে যে, সেগুলো নিয়ে গবেষণা নয়, শুধু মাত্র কম্পাইল করলে বা সংকলন করলেই একটি আস্ত থিসিস বেরিয়ে আসবে এবং যিনি থিসিস লিখবেন তিনি ডেফিনিটলি একটি পিএইচডি ডিগ্রি বা ডক্টরেট ডিগ্রি হাসিল করবেন।

সরকারের লোকজন সব সময় বলে যে, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে তারা নাকি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছেন। এটি খুব ভালো কথা। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, বেছে বেছে বিএনপিসহ বিরোধীদলের নেতা ও কর্মীদের ধরা হচ্ছে। বছর খানেক আগে তো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, সরকারি ভাষ্যমতে, সারা দেশে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদে ছেয়ে গিয়েছিল। আর বুঝানো হয়েছিল, বিরোধীদলের নেতা ও কর্মীরাই সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিবাদী। তখন ছাত্রলীগের দখলদারি এবং চাঁদাবাজিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। এভাবেই সেদিন ছাত্রলীগকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল।

দুই
একদিকে ছাত্রলীগ পেয়েছে সরকারি প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা, অন্যদিকে বিরোধীদল এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনসমূহের ওপরে নেমে এসেছে জুলুমের স্টিম রোলার। জেমস বন্ড সিরিজের ছবিগুলি যারা দেখেছেন তারা জানেন যে, কমিউনিস্টদেরকে মোকাবেলা করার নাম করে পশ্চিমা স্পাই জেমস বন্ডকে নরহত্যা এবং অবাধ নারী সম্ভোগের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিলো। যখন বিরোধীদের ওপর জুলমের স্টিম রোলার চলছিলো এবং ছাত্রলীগকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছিলো, তখন সরকারের প্রশ্রয় পেয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে একেকজন মাফিয়া ও ডন হয়ে বড় হতে থাকে। তারা বাড়তে বাড়তে এমন একটি পর্যায়ে যায় যে, জাহাঙ্গীর নগর বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির নিকট থেকে তাদের প্রজেক্ট শেয়ার হিসাবে ৮০ কোটি টাকা দাবি করে। এই টাকা দাবি করার আগেই তারা জাহাঙ্গীর নগর ভিসির নিকট থেকে ঈদের বকশিস হিসাবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকার প্রতি এত লোভ দেখালে টাকার জন্য মানুষ যে কোনো অপকর্ম করতে পারে। ছাত্রলীগের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই।

আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন ৮০ কোটি তো দূরের কথা, ৮০ লাখ টাকাও আমাদের কল্পনার বাইরে ছিলো। ৮০ লাখ তো দূরের কথা, আমরা হাজার টাকাও কল্পনা করতে পারতাম না। আর এখন কথায় কথায় অবলীলাক্রমে কোটি টাকার নিচে কেউ বকে না। টাকার এই উদগ্র লালসা চরিতার্থ করার জন্যই ছাত্রলীগ হয়েছে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। অনেকে ছাত্রলীগের পক্ষে সাফাই গাইবার জন্য বলেন, ছাত্রলীগের সব ছেলে তো খারাপ নয়, মুষ্টিমেয় কয়েক জন খারাপ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের এতগুলো পাবলিক ইউনিভার্সিটি এবং অসংখ্য সরকারি কলেজের প্রত্যেকটিতে ছাত্রলীগ চাঁদাবাজি এবং গুন্ডামি ও মাস্তানি করছে।

অতীতে আমরা দেখেছি, ছাত্রলীগ হত্যা করলে, সন্ত্রাস করলে, চাঁদাবাজি করলে, খুন রাহাজানি করলে, সর্বোচ্চ শাস্তি হতো দল থেকে বহিষ্কার। দল থেকে বহিষ্কার, এটা কি কোনো শাস্তি হলো? ছাত্রলীগ করলে তো টাকার খনির সন্ধান পাওয়া যায়। এর আগে যে ছেলেটি ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলো সেই সিদ্দিকী নাজমুল আলম এখন কোটি কোটি টাকা নিয়ে লন্ডনে ব্যবসায় নেমে পড়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যারাই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিলো তারাই কোটিপতি হয়েছে। আর এই কোটিপতি হতে গিয়ে তারা টেন্ডারবাজি করেছে, চাঁদাবাজি করেছে এবং সব ধরনের অপরাধ করেছে। এই ধরনের সংগঠন কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে থাকলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং পেশি সঞ্চালন বাড়তেই থাকবে। সেটি কারো কাম্য নয়। ছাত্রলীগ ও তার পেট্রোনরা বুঝে গেছে যে, ছাত্রলীগকে দেশের কোনো মানুষ পছন্দ করে না। তাই ছাত্রলীগের সাফাই গাওয়ার জন্য কথাটা একটু ঘুরিয়ে বলছেন। তারা বলছেন, ছাত্র রাজনীতিই যত অনিষ্টের মূল। কিন্তু এই সেই ছাত্র রাজনীতি যেটি জন্ম দিয়েছিলো ভাষা আন্দোলনের, লড়াই করেছে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের জন্য, করেছে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, করেছে মুক্তিযুদ্ধ এবং অবশেষে বাংলাদেশকে করেছে স্বাধীন।

ছাত্রলীগ এই সব অপকর্ম করেই যাচ্ছে। ছাত্রলীগের পরবর্তী ধাপ যুবলীগ। যুবলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগ টাকা কামাচ্ছে না, টাকা লুটপাট করছে। এত বেশি টাকা তারা কামাই করেছে যে, সেই বিপুল অংকের টাকা তারা বাংলাদেশে রাখার সাহস পাচ্ছে না। তাই সেই টাকা তারা অবৈধ পথে বিদেশে পাঠাচ্ছে। ছাত্রলীগ এবং যুবলীগে মধুর নহর বয়ে যাচ্ছে। তাই ৭১ বছরের বৃদ্ধকেও যুবলীগের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেখা যায়। আর জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসিকেও যুবলীগের প্রেসিডেন্ট হতে আগ্রহী দেখা যায়।

তিন
এসব খবর দেখে জনগণ থ বনে গেছে। তাদের মুখ দিয়ে কোনো বাক্য স্ফূরিত হচ্ছে না। আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকীসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, এ রকম বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখিনি। ২০১৫ সাল থেকে বিরোধী দল তথা প্রতিবাদীদেও যেভাবে দমন করা হয়েছে তার ফলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ভূলুন্ঠিত হয়েছে। গত রবিবারের পত্রিকায় দেখলাম, একটি সমাবেশে বক্তৃতা প্রসঙ্গে ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘বাকস্বাধীনতা না থাকলে থাকবে না কোনো স্বাধীনতাই।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমাদের জীবন পশুর জীবন হয়ে গেছে। স্বাধীন দেশে পশুর মতো বাঁচা যায় না।’ ‘হুমকির মুখে বাকস্বাধীনতা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি একথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, এখন যতগুলো আইন হচ্ছে তার প্রতিটি আইনেই বাকস্বাধীনতা খর্ব হয় এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিতে চলছে লুটপাট। পদ্মাসেতুসহ ৫টি প্রকল্পের মূল ব্যয় ধরা হয়েছিলো ৫৮ হাজার ৬৬৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। এ আমরা কোন দেশে বাস করছি? আইনে আছে, যেখানে বিনা বিচারে একটি লোকও মারা যাবে না সেখানে ক্রসফায়ারে ৫০৭ জন লোককে হত্যা করা হয়েছে।

শুরু করেছিলাম ছাত্রলীগকে দিয়ে। অপকর্ম ও দুর্নীতিতে যে ছাত্রলীগের বদনাম হয়েছে তার নেতাকর্মীরা যখন বড় হয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পাবে, তখন সেই প্রশাসনের নিকট থেকে সুশাসন এবং সৎ প্রশাসন আশা করা যায় না।

Check Also

শিশুশ্রম বন্ধে সমাজের ভূমিকা প্রসঙ্গে

মো. আজিনুর রহমান লিমন  :   শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজকের শিশু আগামী দিনের দেশ গড়ার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *