Monday , November 18 2019
Breaking News
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / অনিরাপদ হেলমেটে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

অনিরাপদ হেলমেটে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :   রাজধানীসহ সারা দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একাধিক মৃত্যুর খবর আসছে প্রায় প্রতিদিন। এসব দুর্ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আরোহীর মাথায় হেলমেট থাকলেও তাদের জীবন রক্ষা হচ্ছে না।  দুর্ঘটনায় হতাহতের আশঙ্কা কমানোর জন্য মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে পাম্পে জ্বালানি সংগ্রহ ও ট্রাফিক কড়াকড়ির কারণে হেলমেটের ব্যবহার বেড়েছে অনেক। তারপরও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল কেন?

গত ৪ অক্টোবর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের দ্বীপনগর এলাকায় বাসচাপায় নিহত হন খালেদ নামের একজন মোটরসাইকেল আরোহী। তার মাথার হেলমেটটি বাসের আঘাতে চূর্ণ হয়ে যায়। মাথায় তীব্র আঘাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেতে দুর্ঘটনায় মারা যান লাফিজুর রহমান নামের একজন মোটরসাইকেল আরোহী। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে মতিঝিল এলাকায় রিপন শিকদার এবং জানে আলম গাজী নামের দুজন, ২০ আগস্ট মোহাম্মদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় সোহেল পারভেজ, ৬ জুলাই বিমানবন্দর গোলচত্বরের কাছে নাজমুল হাসান এবং ৬ মার্চ তেজগাঁওয়ের আড়ং চেকপোস্টে কাজী মারুফ হাসান নামের মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। সবার মাথাতেই হেলমেট ছিল বলে তখনকার খবরে দেখা গেছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব মৃত্যুর বেশির ভাগের কারণ নিম্নমানের হেলমেট। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ হেলমেট নি¤œমানের উপাদানে তৈরি এবং আঘাত-সহনীয় নয়। অনিরাপদ এসব হেলমেটের কারণে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে দুর্ঘটনায়।

কিন্তু এর প্রতিকার ও হেলমেটের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই দেশের কোনো সংস্থার। মাথায় হেলমেট থাকলে সড়কে ট্রাফিক পুলিশ থেকে বাঁচা যায় এটাই বিবেচনায় থাকে আগে। হেলমেট ভালো না মন্দ, আঘাত-সহনীয় না ভঙ্গুর তা বিবেচনা করা হয় না। ব্যবহারকারীর সচেতনতার ওপর দায় সেরে বলা হচ্ছে, হেলমেট ব্যবহারকারী নিজে সতর্ক না হলে এর প্রতিকার সম্ভব নয়।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেলে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়িতে রাজধানীতে চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার বেড়েছে অনেক। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো তাদের রাইডার ও গ্রাহকদের জন্য হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। বেশির ভাগ রাইড শেয়ারিংয়ে বাধ্যবাধকতা মানা হলেও আরোহীর নিরাপত্তার কথা ভাবা হয় না।

এই প্রতিবেদক রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে মোটরসাইকেল পর্যবেক্ষণ এবং অনেক চালকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, অনেকে কেবল ট্রাফিক আইনের দণ্ড থেকে রক্ষা পেতে দায়সারা হেলমেট ব্যবহার করেন। টেকসই হেলমেট ব্যবহার না করে কেউ কেউ ঝুঁকছেন দেখতে সুন্দর এমন হেলমেটের দিকে। রাইড শেয়ারিং সেবায় যাত্রীর জন্য যে হেলমেট রাখা হয়, সেটি পাতলা প্লাস্টিকের ঢাকনা ছাড়া কিছুই নয়। ছোটখাটো কোনো আঘাত মোকাবেলা করতেও সক্ষম নয় তা।

পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, মোটরসাইকেলে চলাচলের আইন অনুযায়ী, চালক ও আরোহীকে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। অন্যথায়, ট্রাফিক আইনে চালকের বিরুদ্ধে মামলার বিধান রয়েছে। কিন্তু হেলমেটের মানের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকায় তা যাচাই করার সুযোগ নেই ট্রাফিক বিভাগের।

বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার তালিকায় মোটরসাইকেল ১৪০তম। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এই কাজটি করার মতো সক্ষমতা নেই তাদের।

হেলমেটের মান যাচাইয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর সুযোগ-সক্ষমতা না থাকলেও সড়কে মোটরসাইকেল প্রতিদিনই বাড়ছে। শহর-নগরে সহজ যাতায়াত ও অসহনীয় যানজট ঠেলে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং সার্ভিস। মোবাইল ফোনের অ্যাপভিত্তিক এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা। কিন্তু নিরাপদ রাইড শেয়ারিংয়ের কোনো উদ্যোগ নেই সরকারি-বেসরকারি কারও তরফে।

সম্প্রতি কয়েকটি দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা অনিরাপদ হেলমেট ব্যবহারের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনার অন্যতম কারণ মানহীন অনিরাপদ হেলমেট, যা কোনো ধরনের আঘাত-সহনীয় নয়।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাবিবুর রহমান প্রায়ই মোটরসাইকেল রাইডে অফিসে যাতায়াত করেন। মোটরসাইকেলে হেলমেট নিয়ে তার অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে বলেন, ‘সারা রাস্তায় আতঙ্কে থাকেন এই হেলমেট নিয়ে। রাইডার নিজেরা ভালো হেলমেট পরলেও আমাদের জন্য রাখেন নামকা ওয়াস্তে হেলমেট। পরার উপযোগী তো নয়ই, সেফটির জন্যও উপযুক্ত নয়।’

নি¤œমানের এই হেলমেট নিয়ে ট্রাফিক পুলিশও কোনো গা করেন না। কোনো একটা হেলমেট মাথায় থাকলেই হলো। কাইয়ুম নামের এক গ্রাহক বলেন, ‘অধিকাংশ রাইডার যেসব হেলমেট আরোহীকে দেন তা ব্যবহার করা-না করা একই কথা। ট্রাফিক থেকে বাঁচতে এটা শুধু হেলমেটের প্রদর্শনী। ট্রাফিক পুলিশও এ নিয়ে কোনো কথা বলে না।’

অথচ একটি ভালো হেলমেট কমাতে পারে দুর্ঘটনায় হতাহতের আশঙ্কা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভালো মানের হেলমেট ব্যবহারে দুর্ঘটনা মৃত্যুঝুঁকি ৪০ শতাংশ কমে যায়। আর জখম থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় ৭০ শতাংশ ।

গবেষকদের মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বেশির ভাগই মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যায়। নিরাপদ হেলমেট ব্যবহার করলে এই হতাহতের সংখ্যা ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্বদ্যিালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণা বলছে, মোটরসাইকেলে হেলমেটের ব্যবহার বাড়লেও নিশ্চিত হচ্ছে না নিরাপত্তা। দেশে ব্যবহৃত বেশির ভাগ হেলমেট দুর্ঘটনায় সুরক্ষা দেওয়ার উপযোগী নয়।

হেলমেটের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিএসটিআইয়ের হলেও প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা না থাকার কথা উঠে এসেছে বুয়েটের ওই গবেষণায়। তাতে আরও বলা হয়, মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহার বাড়লেও তা যতটা মামলা এড়ানোর জন্য ততটা নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য নয়। বাজারেও ভালো হেলেমেটের অভাব আছে। নিম্নমানের সস্তা হেলমেট বিক্রি হচ্ছে বাজারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হেলমেট ব্যবহার না করা এবং নিম্নমানের হেলমেটের ব্যবহার। দুর্ঘটনায় পড়া আরোহী-চালকদের ৮০ শতাংশ মারা যান হেলমেট ব্যবহার না করার কারণে। ভালো মানের হেলমেট কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু থেকে সুরক্ষা দেয় ৪০ শতাংশ। আর মারাত্মক আহত হওয়ার আশঙ্কা ৭০ শতাংশ কমিয়ে দেয়।’

Check Also

নয় লাখ টাকার পুশ বাটন কাজ করে তো করে না

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :     বাটন চেপে বাতি জ্বালিয়ে পথচারীদের সড়ক পারাপারে রাজধানীর আসাদ এভিনিউ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *