Breaking News
Home / উপ-সম্পাদকীয় / ফারাক্কা ভারতের জন্যও ক্ষতি ডেকে এনেছে

ফারাক্কা ভারতের জন্যও ক্ষতি ডেকে এনেছে

মোহাম্মদ আবু নোমান  :   বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা ব্যারাজের অভিশাপ- এটা বহু পুরোনো খবর। ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়; ঘটনা এখানেই শেষ নয়। পানিপ্রবাহ না থাকায় উত্তরবঙ্গের বিরাট এলাকা মরুকরণের দিকে যাচ্ছে। অনেক নদী মরে গেছে, যাচ্ছে এবং সেচের জন্য বিপুল ব্যয় হচ্ছে কৃষকের, মৎস্যজীবী অথবা পানির ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ পেশা হারাচ্ছে। বর্ষায় পানিতে, খরায় শুকিয়ে মারার কূটকৌশল নিয়ে, আন্তর্জাতিক আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে। তখনকার পশ্চিমবঙ্গের সেচ ও জলপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য ফারাক্কার ৩টি অভিশাপের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের বিরুদ্ধে আমার হুঁশিয়ারি না মানার পরিণতিতে জনগণ দুর্ভোগের শিকার হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এই বাঁধ নদীর পলি-ভরাট হওয়া আরও বাড়াবে, ভাটির দেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ কমাবে এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ আর বিহারের বেশ কটি জেলায় বন্যার প্রকোপ বাড়াবে।’ তার তিন হুঁশিয়ারিই যে ফলে গেছে, তা আজ সর্বজনবিদিত। সে সময় ফারাক্কার বিরোধিতার জন্য ভারতীয় গণমাধ্যম প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্যকে ‘পাকিস্তানের চর’ বলেছিল এবং পরিণামে সরকারি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এই নদীবিশেষজ্ঞ। কিন্তু আমৃত্যু তিনি তার মতে অটল থেকেছেন এবং নিজের ভবিষ্যদ্বাণী নিজেই ঘটে যেতে দেখেছেন।

এখন ভারত সেই ফারাক্কা ব্যারেজের ‘কুয়ায়’ পড়েছে। সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টি থেকে সৃষ্ট বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গসহ ব্যাপক অঞ্চল। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে দুর্যোগের কারণে ১ হাজার ৬৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। নিখোঁজের সংখ্যা শতাধিক। বন্যা পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করায় ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছেন বিহার রাজ্য সরকারের পানিসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী সঞ্জয় কুমার ঝা। চলতি বর্ষা মৌসুমে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারতে ২৫ বছরের মধ্যে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যার প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে মানুষের জীবন, আশ্রয়কেন্দ্র, পশুসম্পদ, ফসল এবং অবকাঠামো। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মূল্যায়নে জানানো হয়েছে, প্রায় ২২ লাখ মানুষকে সড়িয়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলিতে মোট ৮ হাজার ৭০০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ভারত সরকার হঠাৎ করেই ফারাক্কা বাঁধের ১১৯টি লকগেট খুলে দিয়েছে। এতে মুর্শিদাবাদের একাংশ ও বাংলাদেশে বন্যার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ভেড়ামারা, দৌলতপুরসহ পদ্মা নদী বেষ্টিত অঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। ভারত সরকারের হঠকারী এমন সিদ্ধান্তে প্রমত্তা পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। একথাও ঠিক যে, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মিত না হলেও বর্ষার ভরা মৌসুমের এই পানি বাংলাদেশেই আসত। কিন্তু এটি তখন হতো প্রাকৃতিকভাবে। বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোর গতিপথ, স্রোত ও গভীরতা তখন প্রাকৃতিকভাবেই নির্ধারিত হতো। প্রকৃতিকে নিজের মতো চলতে দিলে বন্যায় ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি হতো বাংলাদেশের।

বহু বছর ধরে শুকনা মৌসুমে গঙ্গা থেকে কম বা খুবই কম পানি পেয়ে বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতিটা ফারাক্কা ব্যারাজ না থাকলে হতো না। শুকনা মৌসুমে এই ব্যারাজ দিয়ে পানি আটকে দেয় ভারত। বর্ষা মৌসুমে ব্যারাজের সব ফটক খুলে পানি ছেড়ে দেয় বাংলাদেশের দিকে। শুকনা মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে যেভাবে পানি আটকে রাখা হয়, তা বর্ষা মৌসুমেও করা হলে বাংলাদেশে এতটা বন্যা হতো না।

কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সব ফিডার ক্যানেল চালুর কথা বলে ভারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো ওই ৪১ দিনের পরিবর্তে ৪১ বছর পরেও বাঁধটি চালু আছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশ ক্রমাগতভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ফারাক্কার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নিলে বাংলাদেশ পানি সংকটে পড়ে। আবার বর্ষা মৌসুমে বিহার ও মধ্যপ্রদেশকে বন্যার কবল থেকে রক্ষার অজুহাতে ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে দিলে বাংলাদেশের মানুষ বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশের এতো বড় ক্ষতি করতে পারতো না। বাস্তব কারণে এখন তো ভারতের ভেতর থেকেই ফারাক্কা বাঁধ সরিয়ে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিহার এ ব্যাপারে বেশ সোচ্চার। রাজনৈতিক কারণে কোনো অঞ্চলকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা গেলেও প্রকৃতিকে ভাগ করা যায় না। প্রকৃতিতে হস্তক্ষেপ করতে গেলে তার মন্দ ফল মানুষকে ভোগ করতে হয়। ভারতের জন্য একথা আজ শতভাগ প্রমাণিত, প্রকৃতির সঙ্গে কূটনীতি ও চাতুরীর সুযোগ নেই।

ভারত এককভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যাপক মাত্রায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচকাজ চালাতে হয়। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে তো নামছেই। এর প্রতিক্রিয়ায় আর্সেনিকবাহী খনিজের অক্সিডাইজেশন ঘটে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ কমবেশি আর্সেনিকের হুমকিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটাকে ‘জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিষক্রিয়া’র ঘটনা বলে বর্ণনা করে। গঙ্গা নদীব্যবস্থার পানিপ্রবাহ ফারাক্কার আগের স্তরে নিয়ে গেলে এর সমাধান হতে পারে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপনারত দুই বিশেষজ্ঞ স্থমাস ই ব্রিজ ও মির টি হোসেইন। তাদের গবেষণার শিরোনাম ‘গ্রাউন্ডওয়াটার আর্সেনিক পয়জনিং অ্যান্ড এ সলিউশন টু দ্য আর্সেনিক ডিজাস্টার ইন বাংলাদেশ’। তাদের মতে, আর্সেনিক সমস্যা মেটাতে হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার আন্তসীমান্ত নদীগুলো, বিশেষত গঙ্গা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে নিয়ে যেতে হবে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার আগের পর্যায়ে।

এর বাইরে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কখনো বছরের পুরোটা, কখনো ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকার নাম ‘ভবদহ জলাবদ্ধতা’। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনেও ভবদহ জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে ফারাক্কাকে দায়ী করা হয়। ১৯৪১-৪২ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়ও বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভাব হয়নি। বরাবরই এটা ছিল খাদ্য-উদ্বৃত্ত এলাকা। জলাবদ্ধতার কারণে এখন সেখানে ফসল ডুবে যায়, জীবন যায়, লোক দেশান্তরি হয়। অবস্থাকে আরও করুণ করে তোলে ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত ভারতের নির্মিত বিভিন্ন ধরনের বাঁধ, পোল্ডার ও স্লুইসগেট। এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ও পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘে নালিশ করার পরও ভারত তার সিদ্ধান্ত থেকে একটুও সরে আসেনি।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৩০টিরও বেশি নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নদী আন্তর্জাতিক, যার মধ্যে ৫৪টির মূল উৎস চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারতের পর্বতময় অঞ্চল। অবশিষ্ট ৩টি নদী এসেছে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে। বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যে কোন ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ব্যাপক প্রত্যাহার বাংলাদেশের জনগণের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। মানবসৃষ্ট এই দুর্বিপাকে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, বনজ, শিল্প, নৌপরিবহন, পানি সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এছাড়া ভারতের গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের কারণেই সুন্দরবনসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদী, ভূমি ও বন লবণাক্ততার শিকার হয়েছে। যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকেও হুমকিতে ফেলেছে। এই দক্ষিণাঞ্চল তথা পটুয়াখালী থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত অঞ্চল একসময় ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল কৃষি এলাকা। কিন্তু এখন সেখানে ফসল বিপর্যয় নিয়মিত ঘটনা। ফারাক্কার কারণে উজানের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলো পলিবহনের বদলে পলিতেই ভরাট হচ্ছে। আর এটা প্রভাব ফেলছে সুন্দরবনের গাছ, প্রাণি-পতঙ্গ, জলজ জীবসহ সব প্রাণের বাস্তুসংস্থানে। সুন্দরবনের ভেতরেই লবণাক্ততার মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এর প্রভাব পড়ছে বনের বাস্তুসংস্থানে। অথচ এখানেই বসবাস করে বিপন্ন প্রজাতির সুন্দরীগাছ, বিপন্ন প্রজাতির রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন ও কুমির। সম্প্রতি সুন্দরবনের বিষয়ে ইউনেসকোর প্রতিবেদনেও সুন্দরবনের লবণাক্ততার জন্য ফারাক্কা ব্যারাজকেই দায়ী করা হয়।

বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে নদীকে ‘যৌথ সম্পদের’ মতো বিবেচনা করে অববাহিকার সব রাষ্ট্র মিলে সমন্বিতভাবে এর উন্নয়ন, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা করে থাকে। উদ্দেশ্যে থাকে যেকোনো দেশকে বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, নদীর পানির টেকসই ব্যবহার করা এবং নদীটির ও এর প্রতিবেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা। কয়েক দশক যাবৎ বাংলাদেশ চিন্তা করছে এই ক্ষতি এড়াতে নিজেরাই একটি গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করবে কি না। এর ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে বছর পাঁচেক আগে। অথচ এ ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আগে দেখতে হবে। এক. প্রকল্পে ভারতের কোনো ক্ষতি যাতে না হয়। দুই. প্রকল্পে কোনো লাভ হলে তার অংশীদারও ভারতকে করা যায় কি না। অথচ ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের আগে বাংলাদেশের এমন ব্যাপক ক্ষতির ব্যাপারে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের কিছু করণীয় আছে কিনা বা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত দুটি বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই।

Check Also

পবিত্র ঈদুল ফিতর

সম্পাদকীয়  :  বছর ঘুরে আবারও পবিত্র ঈদুল ফিতর সমাগত। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর বিশ্বের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *