Home / বিশেষ প্রতিবেদন / যেখানে টাকা কথা কয়

যেখানে টাকা কথা কয়

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :   গাজীপুর জেলার একটি জমি বিক্রির ঘটনা। জমির ধরন উঁচু। এর সাব কবলা দলিলের জন্য নির্ধারিত ফি আছে। ক্রেতা চান না অত টাকা দিতে। উপায় কী? দলিল লেখক বললেন, সমস্যা নেই। জমিটাকে দলিলে নাল বা নিচু জমি অথবা ডোবা দেখালে ফি কম দিলেই হবে, তবে রেজিস্ট্রি অফিস ম্যানেজ করতে হবে।

ক্রেতা হিসাব করে দেখলেন, কর্তাদের ম্যানেজ করতে যে টাকা দিতে হবে, তা দিলেও তার লাভ। বড় একটা অঙ্কের টাকা বেঁচে যাবে। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। উঁচু ওই জমি বিক্রি হয়ে গেল নাল বা কৃষি হিসেবে। এতে লাভ হলো দুই পক্ষের। একটি ক্রেতা পক্ষ। অন্যটি যারা কাজটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তারা। ক্ষতিগ্রস্ত হলো রাষ্ট্র। সঠিক রাজস্ব পেলো না।

এ ধরনের ঘটনা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের খুবই স্বাভাবিক চিত্র। এতে লুকোছাপের কিছু নেই। প্রকাশ্যেই এসব দেন-দরবার হচ্ছে। এটি খুবই ছোট বিষয়। এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। ভায়া দলিল বা মূল দলিলের সত্যতা যাচাই-বাছাই ছাড়াই জমি হস্তান্তর হয়ে যাচ্ছে। আইন অনুযায়ী জমি নিবন্ধনের জন্য জমির মালিকানা যাচাইয়ের যে বাধ্যবাধকতা ও পদ্ধতি আছে তা সঠিকভাবে মানা হয় না। অনেক সময় সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলোতে জমির খতিয়ান বা রেকর্ড অব রাইটসের হালনাগাদ কপি না থাকায় সাব-রেজিস্ট্রাররা দলিলের সঙ্গে উপস্থাপিত খতিয়ানের কপি বৈধ কি না তা যাচাই করতে পারেন না। এতে জাল দলিলে জমি হস্তান্তরের ঘটনা ঘটে। টাকা হলে যেকোনো অসাধ্যকে সাধন করা যায় সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে।

জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার, সহকারী, মোহরার এবং নকলনবিশ সবার কাছে এসব অনিয়মই নিয়ম। দলিল লেখকরাও তাই। কোনো ধরনের বিধি-বিধানের তোয়াক্কা নেই। ইচ্ছেমতো দলিল লেখার ফি আদায় করেন। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের বলার কিছু নেই। তারা যা বলবেন, তাতেই রাজি হতে হয়। বিকল্প ভাবনার সুযোগ নেই। টাকা দিয়ে জমিজমা কিনে কে চায় কিছু টাকার জন্য ঝামেলায় জড়াতে?

ভূমি অফিসের দুর্নীতি এখন এতটাই সুবিদিত যে, সরকারের ঊর্ধ্বতনরাও বিষয়টি জানেন। কিন্তু এটিকে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি ভূমি সচিব মো. মাকসুদুর রহমান পাটোয়ারি সিলেট অঞ্চলে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ভূমি সেবা সংক্রান্ত দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় ধুয়া তুলসী পাতায় নয়। কে কী করে সব চলে আসে। কিছু কিছু অফিসে ভূমিসেবা নিতে গেলে হয়রানির শিকার হন সাধারণ মানুষ। সেবার বিনিময়ে টাকা দিতে হয়। যারা ওপরে টাকা দিতে হয় এমন কথা বলে, তারা মিথ্যুক। ওপরে কোনো টাকা দিতে হয় না।’ তিনি ‘ঘুষখোরের’ উদ্দেশে বলেন, ‘যারা ঘুষ খায়, তারা গু খায়।’ পরে তিনি ভূমি অফিস সংশ্লিষ্টদের ঘুষ না খেতে দাঁড়িয়ে শপথ করান।

এত কিছুর পরেও ভূমি সেবায় দুর্নীতি কি কমেছে? কমেনি। সারা দেশে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়, রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলোতে অনুসন্ধান চালালে এর প্রমাণ মিলবে। এলাকা ভেদে ঘুষের ধরন ভিন্ন। জাল দলিলের বিষয়গুলোও অনেক সময় মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যারা সেবা নিতে যান, তারাও বিষয়টিকে উপায় না থাকায় অনেকটা মেনে নিয়েছেন।

এমনিতেই জমিজমার কাগজপত্রের বিষয় অনেকটা জটিল। অনেকের এসব কাগজপত্রের বিষয়ে জানাশোনা নেই। এই সুযোগটা নিচ্ছেন ক্রয়-বিক্রয় বা হেবার মাধ্যমে জমির মালিকানা হস্তান্তর, নামজারি, ভূমিকর আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা।

ভূমি অফিসগুলো ব্যবস্থাপনাতেও নেই নিবিড় নজরদারি। যে কারণে কোন পর্যায়ে কারা কীভাবে এসব দুর্নীতির ডালপালা ছড়াচ্ছেন, তা সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। যুগের পর যুগ এমনটাই হয়ে আসছে। এমন ঘটনাও বিরল নয় যে, সরকারি সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ভুয়া বা জাল দলিল মারফত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে লেনদেন হয়েছে কোটি কোটি টাকা। ভূমি সংক্রান্ত সেবায় আকাশছোঁয়া এসব দুর্নীতি শুধু সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিতই করছে না, সরকারি সম্পত্তিও বেহাতের সুযোগ তৈরি করছে।

সম্প্রতি ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবা সংক্রান্ত একটি গবেষণা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গবেষণা শেষে টিআইবি এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত নানা অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছে। যেখানে বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়গুলোতে আইনের প্রয়োগে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এছাড়া অবকাঠামোগত ঘাটতির কথাও বলেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে বেশির ভাগ অফিসগুলো খুবই জরাজীর্ণ ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে জমির দলিলপত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে খুবই স্যাঁতসেঁতে স্থানে। সেখানে পোকামাকড়ের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস হচ্ছে।

ভূমি সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা আছে। রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারের পেশাগত দক্ষতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও অধস্তনদের ক্ষেত্রে এটি নেই। যে কারণে এই কর্মচারীরা কেবল উৎকোচটাই ভালো বোঝেন, সেবা নয়।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো যখন ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হচ্ছে, তখন ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি এখনো সেকালের রয়ে গেছে। এতে অনেক সময় জাল দলিল সহজে চিহ্নিত করা যায় না। আবার নিবন্ধনের পর মূল দলিল বা দলিলের নকল তোলার জন্য সেবাগ্রহীতাকে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ এটিকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা গেলে বা ডাটাবেজ তৈরি করা গেলে জাল দলিল বা ভুয়া দলিল সম্পর্কে সহজে জানা যাবে।

সারা দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, দলিল লেখকদের জন্য নির্ধারিত ফি ধার্য থাকলেও কেউ তা মানেন না। বরং সবাই নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত, থোক হিসেবে অর্থ আদায় করে থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ১ থেকে ৩ শতাংশ বেশি টাকা দিতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। এ থেকে দলিল লেখক সমিতির ঊর্ধ্বতনরাও ভাগ পান বলে জানা গেছে।

এর বাইরে দলিল লেখক ক্রেতার কাছ থেকে ‘অফিস খরচ’ হিসেবেও অনৈতিকভাবে অর্থ নিয়ে থাকেন। এই টাকার পরিমাণ কখনো প্রতি লাখে, শতকরা হারে, কখনো থোক বা প্যাকেজ আকারে ঠিক করা হয়। এটি নির্ধারণ হয় জমির মূল্য, ধরন, অবস্থান, দলিলের ধরন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা বা না থাকা ইত্যাদি বিচারে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। এর বাইরে অবৈধ কাজের জন্য মোটা অঙ্কের উৎকোচ তো আছেই।

এসব ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নিবন্ধন ফি ফাঁকি দেওয়ার জন্য দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট পথ বাতলে দেন। এ থেকে সরকার সরাসরি রাজস্ব বঞ্চিত হয়। কঠোর নজরদারির অভাবে দিনের পর দিন এসব অনিয়ম চলছে।

অন্যদিকে দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও উৎকোচ লেনদেনের নজির আছে। এসব ক্ষেত্রে লেনদেনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সুপারিশ বা প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্ব পায় বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার সুপারিশ

কাজের সমন্বয়ের জন্য সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার সুপারিশ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। জমির মালিকানা পরিবর্তনের দলিল করার ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার ভূমি, সেটেলমেন্ট অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিস যুক্ত। এর মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এই তিনটি কার্যালয়কে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার কথা বিভিন্ন সময় বলা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।

২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ। ওই চিঠিতে বলা হয়, একসময়ে আইন ও ভূমি মন্ত্রণালয় একত্রে ছিল। পরে পৃথক হওয়ার সময় ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিস আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে যায়। ভূমি ব্যবস্থাপনা কাজে গতি আনতে এই তিনটি শাখাকে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা প্রয়োজন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হলে জনদুর্ভোগ কমবে। কাজের সমন্বয় বাড়বে। এছাড়া দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমে দুর্নীতি ঠেকাতে হলে আইনি ও পদ্ধতিগত সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি আইনের বাস্তবায়নও জরুরি। ‘সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজার মূল্য নির্ধারণ বিধিমালা ২০১০’ সংস্কার করে বাস্তব মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কর্মচারী এবং নকলনবিশদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে ভূমি দলিল নিবন্ধন ও নামজারি সংক্রান্ত যেসব দুর্নীতি চলমান আছে, এগুলো অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঠেকানো যাবে জাল দলিলের মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি ভোগদখলের মতো গর্হিত অন্যায়।

Check Also

বুয়েট ছাত্রাবাসে ভীতির রাজনীতি

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :   দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাধারণ শিক্ষার্থীরা সাংগঠনিক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *