Home / উপ-সম্পাদকীয় / দুর্বৃত্তায়িত সমাজের স্বরূপ সন্ধান

দুর্বৃত্তায়িত সমাজের স্বরূপ সন্ধান

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জি এম কামরুল ইসলাম  :    বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে উন্নতি আর অগ্রগতিতে অনুকরণীয় একটি দেশ। অর্থনীতির প্রায় সব শাখায় আর অধিকাংশ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। ফলে আমাদের সক্ষমতাও বেড়েছে বহুগুণ।। গত কয়েক বছরের হজব্যবস্থাপনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা সেই সক্ষমতা দেখাতেও পেরেছি। আমরা সামাজিক প্রায় সব সূচকে অগ্রগতি করেছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, জন্ম-মৃতু্যর হার, কৃষি উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, অবকাঠামো নির্মাণ, ইত্যাদি সব শাখায়ই অগ্রগতি করতে পেরেছি। আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে তথাকথিত তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করতে পেরেছি। আগামী দিনগুলোতেও আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। এরকমই তো হওয়ার কথা। কেননা, প্রায় ৪৮-৪৯ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতারা হাত ধরে আকাশ সমান ত্যাগ-তিতিক্ষা আর লাখো কোটি জানমালের বিনিময়ে দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রাম এবং রক্তাক্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাই দেশ ও জাতি হিসেবে ভালো থাকার অধিকার আমাদের আছে।

আমাদের খুবই অল্পে সন্তুষ্ট হওয়া প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬০-৬৫%-এর বেশি কর্মক্ষম লোক আছে। প্রায় এক কোটি প্রবাসী রাত-দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছে। সবাই একসঙ্গে হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছি এবং আমরা সবাই একই ভাষায় কথা বলি। আমরা সাধারণভাবে একই নৃগোষ্ঠীর লোকও বটে। আমাদের এক লাখ পঁচিশ হাজার বর্গকিলোমিটারের মতো সুজলা-সুফলা উর্বর জমির সঙ্গে সমুদ্রে বড় বড় চর আর অনাবিষ্কৃত সম্পদে ভরা বিশাল সমুদ্রসীমা আছে। আমরা পদ্মাব্রিজ, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-খুলনা হাইওয়ে, মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বেশকিছু ফ্লাইওভার, কর্ণফুলি টানেল ও মাতারবাড়ি পোর্টসহ অনেক বড় বড় স্থাপনা তৈরি করছি। প্রতিটি একনেক সভায় হাজার হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এ সবই আমাদের। শক্তি, সামর্থ্য, সক্ষমতা ও সম্ভাবনার প্রমাণ যা দেশ ও দশের স্বার্থে সঠিক ও যথাযথভাবে কাজে লাগানো দরকার।

আমাদের সমাজে দুর্নীতিসহ কিছু খারাপ জিনিসও মহামারীর মতো ঢুকে পড়েছে। অর্থাৎ আমরা উল্টো একটি ছবিও দেখতে পাচ্ছি যা আমাদের জাতীয় মানসম্মান ও ভাবমূর্তিসহ সব অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেবে। সম্প্রতি আমাদের একজন প্রধান বিচারপতিসহ সর্বোচ্চ আদালতের আরও চারজন বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নৈতিক স্খ্মলনের জোর অভিযোগ আনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মত। সংসদীয় পোস্টের লোকদের দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতাসহ নীতি-নৈতিকতা নিয়ে জোর অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণের নামে যেনতেনভাবে টাকা নেয়া, ইভিএমসহ অন্যান্য ক্রয়ে অনিয়ম আর টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার বানানোসহ অনেক ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। বাড়ি-গাড়ি ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ বেতন-ভাতা বহুগুণ বৃদ্ধির পরেও আইনরক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সব ধরনের ও পর্যায়ের। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়ার জন্য প্রাধিকারের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যুগ্ম, অতিরিক্ত ও পূর্ণ সচিব বানিয়েও প্রশাসনকে দক্ষ ও গতিশীল এবং তাদের ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ ও লেখক-বুদ্ধিজীবীরা প্রায় সবাই অবৈধ আনুকূল্য ও অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য অন্ধ রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি আর অবৈধ উপার্জনে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভিসিরাই অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা, নৈতিকতা এমনকি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। দেশের অধিকাংশ কন্টাক্টর এবং ব্যবসায়িরা। নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ঘুষ প্রদানসহ সব ধরনের অবৈধপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে ছোট-বড় প্রায়। সবাইকে ম্যানেজ করে (অনেক সময় কাজ না করেও) অধিক মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত। এভাবেই বালিশ, পর্দা, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, চেয়ার-টেবিল, ইত্যাদি অস্বাভাবিক বেশি দামে ক্রয় আর প্রকল্প খরচ অস্বাভাবিক করা হচ্ছে। অথচ সব পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও কেউই তা যথাযথভাবে না করে ফাইল উপরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে আবার কৃষক এবং সাধারণ মানুষ ধানসহ ফসলের আর চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত ও প্রতারিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশন রেল, বিমান ও ভূমিসহ অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থার অনিময় ও দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে ওইসব সংস্থার ভয়াবহ লুটপাট আর অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। তার মধ্যেই আবার দেখা গেল যে দুদকের শুধু দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতাই নেই বরং তার লোকজনের মধ্যেও ঘুষ-দুর্নীতি আর অনিয়ম ঢুকে পড়েছে। রাজনীতিবিদ আর প্রভাবশালীদের কারণে ব্যাংক, বিমা ও শেয়ারবাজারসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে শঙ্কা ও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারের খরচ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যার সিংহভাগ বোঝা সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে। দেশের রাজনীতি আর রাষ্ট্রনীতি প্রকৃত রাজনীতিবিদের হাতে নেই বরং লোভী ব্যবসায়ী আর মাস্তানদের হাতে লুটপাট আর সন্ত্রাসনীতিতে পরিণত হয়েছে। আজ আমাদের এমন কোনো সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নেই যা উলেস্নখ করার মতো অনিয়ম আর দুর্নীতিমুক্ত। আমাদের দেশ ও সমাজের পরিস্থিতির সর্বশেষ উদাহরণ হলো সম্প্রতি ছাত্রলীগ আর যুবলীগে পরিচালিত শুদ্ধি অভিযানে উদঘাটিত অপকর্মের ভয়াবহ চিত্র যা কানার হাতি দেখার মতো বৃহত্তর চিত্রের একটা ছোট অংশ মাত্র। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ ও টেন্ডারবাজির কারণে ধৃত যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের মাত্র ৪-৫ জনের (শামিম, খালেদ, শফিক, আনিস ও লোকমান) কাছ থেকে অন্ধকার জগতের অনেক তথ্য আর সংশ্লিষ্ট রথী-মহারথীদের যথা- কয়েকজন মন্ত্রী ও সাবেক মন্ত্রীসহ-সরকারি ও অন্যান্য দলের রাজনৈতিক নেতা এবং সচিবসহ অনেক আমলা ও কর্মকর্তাদের নাম চলে এসেছে। তারা জোর করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় ক্লাবগুলোর দখল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে ক্যাসিনো আর মদ-জুয়াসহ অন্য সব ধরনের অপকর্ম অবাদে চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০টির মতো ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা ক্লাবের পাশাপাশি বাড়ির ছাদ আর ফ্ল্যাটেও এ ধরনের নৈতিকতা ধ্বংসকারী অবৈধ কাজ শুরু করেছিল। বর্তমান অভিযানের কারণে প্রকাশিত এ ধরনের তিনজনের (একজন আমলা এবং অন্য দুজন নেতা) কথা আলোচনা করে আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকের একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব।

কেস : ১. গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। ১৯১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর, প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার সময় মোটা অঙ্কের (অন্তত ২৫ কোটি টাকা) লবিস্ট নিয়োগ করেছিল। তারপর পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়া, ঠিকাদারি কাজের কমিশন, বদলি, নিয়োগ- সবকিছুতেই টাকা নিয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তার দেশে-বিদেশে বাড়ি ও ফ্ল্যাটসহ সহায়-সম্পত্তির ইয়ত্তা নেই। সে অবৈধ অর্থে কানাডায় বাড়ি কিনেছে। প্রথম ঘরের স্ত্রীর ছেলে শাওনের মাধ্যমে হংকংয়ের এইচএসবিসি ব্যাংকে ২০০ কোটি টাকা জমা রেখেছে। তার ধানমন্ডির ৮নং রোডে হাউস নং-৯, গ্রিনরোডের গ্রিন কর্নার নামের অ্যাপার্টমেন্টে আলিশান দুটি ফ্ল্যাট, গুলশানের ৩৫নং রোডে ৪৪নং বাড়িতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বনানীর ৭নং রোডে এফ/১৭ আনোয়ার মঞ্জিল নামে একটি বাড়ি এবং মিরপুরে ১০ কাঠা জমির ওপর ১২টি ফ্ল্যাটবিশিষ্ট ছয়তলা বাড়ি আছে। এসব অপকর্ম সেসব চোখের সামনে করেছে। কিন্তু কেউই তাকে কিছু বলেননি। বরং বলা যায় যে সবাই (আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রসহ) অপকর্মে তাকে সহযোগিতা করেছে। কয়েক বছর আগে স্থানীয় সরকার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলেও তার কিছুই হয়নি। দেশের অন্যান্য সংস্থার পরিস্থিতিও তথৈবচ।

কেস : ২. এবার আসা যাক স্বয়ং শামীমের কথায়। যুবলীগ নেতা (সমবায়বিষয়ক সম্পাদক) পরিচয়ে ‘ঠিকাদার মোগল’ এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম। একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও সে সংশ্লিষ্টদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে বড় বড় প্রকল্পের কাজ নিত। তার প্রতিষ্ঠান সরকারের অন্তত ২২টি বড় প্রকল্পের কাজ করেছে। যার মধ্যে, প্রায় ৪৫০ কোটি টাকায়র্ যাব সদর দপ্তর, ১৩ কোটি টাকায়র্ যাব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৫০০ কোটি টাকায় রাজস্ব ভবন, ১৫০ কোটি টাকায় পঙ্গু হাসপাতালের নতুন ভবন, ৫০ কোটি টাকায় এনজিও ভবন, ১৫০ কোটি টাকায় নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল, ১২ কোটি টাকায় পাবলিক। সার্ভিস কমিশন, ৩০ কোটি টাকায় বিজ্ঞান জাদুঘর, ১৫০ কোটি টাকায় সচিবালয়ের সম্প্রসারিত ভবন, ১০ কোটি টাকায় বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির, ১৫০ কোটি টাকায় হিলট্র্যাক্টস ভবন ও ১৫০ কোটি টাকায় শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল প্রকল্প অন্যতম। এ ছাড়া ঢাকার পুলিশ সুপারের কার্যালয়, ল্যাবরেটরি মেডিসিন ভবন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও কেবিনেট ভবন নির্মাণসহ বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রাখা ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার কাগজপত্র, নগদ ১ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকা, ৯ হাজার মার্কিন ডলার ও ৭৫২ সিঙ্গাপুরী ডলার পাওয়া যায়। জব্দ করা হয়েছে আটটি বৈধ অস্ত্র ও ২৩টি ব্যাংকের ৮৩টি চেক। তার মা আয়শা হকের নামে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া যায়। ঢাকায় তার অন্তত পাঁচটি বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট এবং সোনারগাঁওয়ে বাড়ি আছে। সে ৫টি ব্যাংকে ৭০০ কোটি এবং সিঙ্গাপুর ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের টাকা জমা রাখা আছে। তার তিন হাজার কোটি টাকার কাজ চলমান আছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদু্যৎকেন্দ্র প্রকল্পের অধীনে আবাসিক ভবন নির্মাণে অনিয়মের ঘটনায়। শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হয়। সে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন সাবেক প্রকৌশলীকেই ঘুষ দিয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো। তা ছাড়া তাকে যুবলীগের অন্তত দুজন শীর্ষ নেতা ও ক্ষমতাসীন। দলের এক শীর্ষ নেতাকে ‘সন্তুষ্ট করতে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতে হতো। তার অর্থভোগীর তালিকা (সব রাজনৈতিক দলের লোক) অনেক দীর্ঘ। কয়েকজন বড় সরকারি কর্মকর্তাও তার কমিশনভোগী ছিল। সে একসময় মির্জা আব্বাসের ‘ডান হাত’ এবং মহানগর যুবদলের সহ-সম্পাদকও ছিল। যুবলীগের নেতা হিসেবে তুলে ধরা হলেও সে ছিল নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।

কেস : ৩. তারপর আসে যুবলীগ নেতা ও ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবের ক্যাসিনোর সভাপতি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার কথা। তাকে তরুণীসহ ১৪২ জনের আটক, নগদ ২০ লাখ টাকা উদ্ধার এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, মদ, বিয়ার জব্দ করা হয়। মতিঝিল, শাহজাহানপুর, রামপুরা, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মুগদা এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল তার। এসব এলাকার সরকারি প্রতিষ্ঠান যথা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রেলভবন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার ফকিরাপুল জোনসহ বেশিরভাগ সংস্থার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করত তার ‘ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া’ নামের প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে। সে মতিঝিল ও ফকিরাপুল এলাকার কমপক্ষে ১৭টি ক্লাবের মধ্যে ১৬টি নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবটি সরাসরি নিজে পরিচালনা করত। সে প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ করে টাকা নিত। খিলগাঁও-শাহজাহানপুরে চলাচলকারী লেগুনা ও গণপরিবহন থেকে নিয়মিত চাঁদা; প্রতি কোরবানির ঈদে শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ; খিলগাঁও রেল ক্রসিংয়ে প্রতিদিন রাতে মাছের হাট বসিয়ে চাঁদা (মাসে কমপক্ষে এক কোটি টাকা) এবং খিলগাঁও কাঁচাবাজার থেকে চাঁদা উঠানো ছিল তার নিয়মিত আয়ের উৎস। তাছাড়া শাহজাহানপুরে রেলওয়ের জমি দখল, দোকান ও ক্লাব নির্মাণ করে ভাড়াও দিত। কুমিলস্নার ছেলে খালেদ হাবিবুলস্নাহ বাহার কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময়ে একটি। তুচ্ছ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে তাকে ল্যাংড়া খালেদ বলা হয়। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম মানিক ও ফ্রিডম রাসুর হাত ধরে উত্থান এবং ২০০২ সালে বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। কথিত আছে যে প্রধানমন্ত্রীর হত্যা চেষ্টা এবং ২০১১ সালে মহানগর উত্তরের সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন বাবু ওরফে লীগ বাবুর খুনের ে তার সম্পৃক্ততা ছিল। ২০১২ সালের পর যুবলীগের সম্রাটের ছত্রছায়ায় ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে তার হাতে।

চলমান অভিযান এবং উপরের তিনটি ঘটনা থেকে এবারও আমরা ২০০৭ সালের মতো বনের রাজা আর ভূমিদসু্যদের মতো ঢাকা আর চট্টগ্রামের থানা আর মহলস্না পর্যায়ের নেতাদের বাসা থেকে কোটি কোটি টাকা আর স্বর্ণসহ অঢেল সম্পদ উদ্ধার হতে দেখেছি। এসব ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং ইতোমধ্যে যুবদলসহ ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় দেশে হাজার হাজার সম্রাট, শামীম, খালেদ, সফিক, আরমান (এক সময়ের বিএনপির লোক, লাগেজ বিক্রি করত), লোকমান (এক সময়ের বিএনপির লোক, ৪১ কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকে), স্বপন (ফ্রিডম পার্টি করত), মনা (জাতীয় পার্টি করত), জাকির (এক সময়ের হোটেল বয়) ও আনিসের (পিয়ন ও কম্পিউটার চালক) মতো গড ফাদেরের জন্ম হয়েছে যারা দেশ ও সমাজের জন্য অবাঞ্ছিত ও ক্ষতিকর বিধায় তাদের এখনই আইনের আওতায় আনতে হবে। উলেস্নখ্য, আগে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখনও এ ধরনের অনেক গডফাদার সৃষ্টি হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামানের। বক্তব্যের সাহায্য নেয়া যেতে পারে যা অনেকটা এরকম, সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে যে উৎকণ্ঠাজনক চিত্র সামনে এসেছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চলমান এ অভিযানের ব্যাপ্তি ও প্রসার অন্যান্য খাত ও পর্যায়ে। বিস্তৃত করতে পারলে একই চিত্র উদঘাটিত হবে। রাজনৈতিক সংশ্রবপ্রসূত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু রাজধানী ও এর আশপাশের যুব ও ছাত্রনেতাদের একাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশব্যাপী বিস্তৃত। তাই আগামীতে আমরা আরও অনেক বড় বড় অন্যায় আর অনিয়ম দেখতে ও জানতে পারব। দুর্নীতি, দুবৃত্তায়ন। আর অনিয়মের শিকড় আমাদের সমাজে যে অনেক শক্তিশালী তা চলমান অভিযানের মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বরে ইইউর রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাতের পর আমাদের অর্থমন্ত্রীর (যিনি নিজেও অনেক কষ্টকরে প্রচুর অর্থবৃত্তের মালিক হয়েছেন) বক্তব্য (যা অনেকটা এরকম…পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ইত্যাদির মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের কিছুটা অপচয় হওয়া স্বাভাবিক) থেকেও অনুধাবন করা যায়। আবার সমাজে নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ের আর একটি বড় উদাহরণ হতে পারে সাবেক অর্থমন্ত্রীর মতো একজন সফল (তথাকথিত) মানুষ কর্তৃক শর্ত সাপেক্ষে শুল্কবিহীন গাড়ি ক্রয় করা। এসব হলো ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা চৌর্যাতন্ত্র অর্থনীতির লক্ষন। তবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে আমরা নিম্নের মতামতগুলো দিতে পারি :

(১) দেশে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে। তবে অনিয়ম-দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নও সমান তালে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

(২) আমাদের সমাজে কিছু মানুষ টাকা আর ব্যক্তিস্বার্থে দেশ ও সমাজের ক্ষতিকর সব ধরনের খারাপ কাজ (মদ, জুয়া, ক্যাসিনো ইত্যাদি) করতে পারে।

(৩) নতুন প্রজন্মের অনেক রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কোনো আদর্শ ও নীতি নেই। নিজেদের অবৈধ কর্মকান্ডের স্বার্থে তারা রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে।

(৪) তাদের অনেকেই অত্যন্ত সাধারণ আর্থ-সামাজিক পারিবারিক অবস্থান (যথা তেল চুরি, মুদি দোকান, কম্পিউটার চালক, বেকার, স্কুলের দপ্তরির ছেলে, হকার ইত্যাদি) থেকে উঠে এসেছে। সাধারণ পারিবারিক অবস্থানে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু তারা নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে টাকার জন্য চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাস্তানি, মারামারি, খুনখারাবি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি সব কিছুই করে যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে।

(৫) আমাদের দেশ ও সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে ও স্থানে দুর্নীতি আর অনিয়ম ঢুকে পড়েছে।

(৬) দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক আকার ধারণ করেছে। একটা অফিস বা প্রতিষ্ঠানের সবাই কিংবা একটা পরিবারের সাবাই এক হয়ে মিলেমিশে দুর্নীতি করছে।

(৭) সবকিছুর জন্য সবাই দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারকের দিকে তাকিয়ে থাকে। অর্থাৎ কেউ ঝুঁকি ও দায়দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে না।

(৮) টাকার জোর অনেক। টাকায় মান-সম্মান, পদ-পদবি, ইত্যাদি সব হয়। তেল চুরির কাজে জীবন শুরু করলেও একেএম মমিনুল হক কিছুদিন আগে সাদেক ভাইয়ের মতো খেলোয়াড়কে হারিয়ে হকি ফেডারেশনের সেক্রেটারি হয়ে বিমান বাহিনীর প্রধানের হয়ে কাজ করছে।

(৯) সংসদ নুরুন্নবী শাওন ও সামসুল হক চৌধুরী যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সম্রাট, আরমান, শামিম, সফিক, আনিছ, খালেদ, সাইদ, হারুন, এনাম, রুপন, সোহেল, আবুল কালাম; ছাত্রলীগের শাওন ও রব্বানীসহ যাদের নাম এসেছে তাদের অনেকে একদিন জাতীয়পর্যায়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করবে। নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত এসব নেতা দেশ ও সমাজকে অধঃপতনের কোথায় নিয়ে যাবে তা চিন্তা করতে হবে।

(১০) গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, প্রকৌশলী আব্দুল হাই ও প্রকৌশলী উৎপলদের মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ঘুষ আর দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। অন্যান্য সংস্থা, দপ্তর, পরিদপ্তরের অবস্থাও একই রকম। তারা রক্ষক হয়ে ভক্ষকের কাজ করছে। তারা রাষ্ট্রীয় অপচয় আর দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। তাদের সবাই চেনে। কিন্তু তাদের কিছু করা হচ্ছে না। ফলে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছে।

(১১) দেশে খেলাধুলাসহ সুষ্ঠু বিনোদনের যায়গাগুলো কলুষিত ও সংকোচিত হচ্ছে। পাশাপাশি মদ, জুয়া আর ক্যাসিনোর মতো ক্ষতিকর বিষয়গুলো বেড়ে চলেছে। ফলে অধিকাংশ খেলাধুলায় আমরা ভালো করতে। পারছি না।

সম্প্রতি টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় গবেষক আফসান চৌধুরীর প্রদত্ত এক জরিপ রিপোর্টে দেখা যায়, দেশের ৮৯% মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে ঘুষ-দুর্নীতির শিকার। খুশির বিষয় এবার দেশের সর্বোচ্চ স্থান থেকেই নির্দেশনা এসেছে বিধায় দুর্নীতিবাজ দমনের এই ধারা একটা পর্যায় পর্যন্ত চলবে বলে আশা করা যায়।

তবে তিনি কিন্তু বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার সৎসাহস (দুঃসাহস) দেখিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত হবে প্রধানমন্ত্রীকে শুধু ধন্যবাদ দিয়ে বসে থাকা নয় বরং সবার নিজ নিজ অবস্থান থেকে চলমান অভিযানকে বেগবান করতে হবে। দেশের লেখক, সাংবাদিক আর বুদ্ধিজীবীসহ। সব মুক্তচিন্তার মানুষের সরকারের পাশে থাকতে হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুর্নীতি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে শুদ্ধিকরণ অভিযান বিস্তৃত করতে হবে। পাশাপাশি দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের উচিত হবে বিষয়টি নিয়ে শুধু রাজনীতি না করে চলমান অভিযানের সুযোগ নিয়ে নিজেদের দলকে শুদ্ধিকরণ এবং চলমান অভিযানে সহযোগী করা। আমরা কিন্তু সবাইকেই দেখেছি। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগসহ সবাই আমাদের কাছে পরীক্ষিত। তাই দুর্নীতি ও সামাজিক আন্দোলনের সময় আর একে অন্যকে দোষারোপ বা সময় নষ্ট নয় বরং সবার আন্তরিকতা ও কার্যকর সহযোগিতা চাই। দেশ ও সমাজের স্বার্থে আমাদের এই সুযোগকেই কাজে লাগাতে হবে। ইতোপূর্বে ২০০৩/৪ সালে বিএনপি কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন ক্লিনহার্ট কিম্বা ২০০৭/৮ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মতো ব্যর্থ অভিযান আর দেখতে চাই না। রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে সবাই সম্ভব। আশার কথা হলো এবার আমরা দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখতে পাচ্ছি। তাই আসুন আমরা সবাই অন্তত দুর্নীতির মতো বিষয়টিতে দলমত নির্বশেষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও সমাজকে পরিছন্ন করি। প্রিয় জন্মভূমিকে পরবর্তী প্রজন্মের বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করি।

Check Also

ফারাক্কা ভারতের জন্যও ক্ষতি ডেকে এনেছে

মোহাম্মদ আবু নোমান  :   বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা ব্যারাজের অভিশাপ- এটা বহু পুরোনো খবর। ফারাক্কা বাঁধের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *