Thursday , September 19 2019
Home / উপ-সম্পাদকীয় / ইসলামে পরকালে বিশ্বাসের গুরুত্ব

ইসলামে পরকালে বিশ্বাসের গুরুত্ব

মোহাম্মদ আবদুল গফুর  :    অত্যন্ত চমৎকার একটা কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঈদুল আজহা-পরবর্তী এক শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, কবরে একাই যেতে হবে। নিজ কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, কবরে একাই যেতে হবে। তার অর্থ হলো এ পৃথিবীতে মানুষ সাময়িক সুযোগ-সুবিধার প্রভাবে তাদের কাজ-কর্মে যত বেপরোয়াই হোক, একদিন পার্থিব জীবনের অবসান ঘটবেই এবং তাকে কবরে একাই যেতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এ চমৎকার কথার জন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। তবে তাঁকে সাথে সাথে তাঁর নিজের আচরণের বাস্তবতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারছি না। কবরে একাই যেতে হবে- তাঁর এই কঠিন সত্য উচ্চারণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত রয়েছে ধর্মীয় জীবন-দর্শন। এই জীবন-দর্শনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে যে জীবন দৃষ্টি, তাতে বলা হয়েছে, মানুষের জীবন মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যুর পর শুরু হয় আখেরাতের জীবন, যা অনন্তকাল ধরে চলে। সেই পরকালীন অনন্তকালের জীবনের তুলনায় পার্থিব জীবনের মেয়াদ একেবারেই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ।

প্রশ্ন উঠবে, তবে কি আমাদের পার্থিব জীবনের কোনই মূল্য নেই? আছে, অবশ্যই আছে। কারণ এই সীমিত ক্ষুদ্র পার্থিব জীবনে আমরা যে যেভাবে চলবো পরকালের অনন্তকাল ধরে সে অনুযায়ী ফল ভোগ করবো। যদি আমরা বিশ্ব স্রষ্টার নির্দেশ মোতাবেক জীবন যাপন করি, তবে তার মহাসুফল আমরা ভোগ করব পরকালের অনন্ত জীবন ধরে। আর আমরা যদি বিশ্বস্রষ্টা বিধান মোতাবেক জীবন যাপন না করি, তার শাস্তি ভোগ করবো অনন্তকাল ধরে।

আমাদের মধ্যে এমন অনেক রাজনীতিবিদ রয়েছেন, যারা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তাদের বক্তব্য মেনে নিলে এ সত্যও মেনে নিতে হয় যে, রাজনীতি-সহ পার্থিব জীবন সম্পর্কে বিশ্বস্রষ্টা প্রদত্ত কোন জীবন বিধান নেই। মানুষ যে যেভাবে ইচ্ছা চলতে পারে। অথচ এর মতো বড় অসত্য আর কিছু নেই। কারণ আসমান ও জমিনের মধ্যে যা কিছু আছে তার একমাত্র মালিক বিশ্বস্রষ্টা। শুধু নাই নয়, বিশ্বেসের সব কিছুর শেষ আছে। শুধু তিনি ছাড়া। বিশ্বজগতের একমাত্র সার্বভৌম সত্ত¡া তিনি। তাঁর প্রদত্ত জীবন-বিধান মোতাবেক জীবন চালনা না করা, তাঁকে অমান্য করার শামিল।

যারা ধর্মনিরপেক্ষ বলে নিজেদের দাবি করেন, তারা প্রকৃত প্রস্তাবে ধর্মহীন বা ধর্মবিরোধী। তাদেরকে স্রষ্টা-বিরোধী বললেও অন্যায় হবে না। বিশ্ব স্রষ্টা শুধু বিশ্ব সৃষ্টি করেই থেমে থাকেননি। তিনি এই বিশ্বে তাঁর প্রদত্ত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে স্রষ্টা-প্রদত্ত জীবন বিধান শিক্ষা দিতে যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রসূল। ইতিহাসে কোন দিনই যাতে মানুষ স্রষ্টা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না থাকে, যে লক্ষ্যে প্রথম মানুষকেই (আদম) বিশ্ব স্রষ্টা করেন প্রথম নবী।

এরপর মানুষ কোন নবীর শিক্ষা ভুলে গেলে অথবা পরিবর্তনশীল বাস্তবতার কারণে বিশেষ পরিস্থিতির প্রয়োজন বোধে অন্য নবী পাঠিয়েছেন। বিষয়টি স্পষ্ট করতে একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ ছিলেন হজরত আদম (আ.), আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন বিবি হাওয়া (আ.)। সে নিরিখে পৃথিবীর প্রথম দম্পতি ছিলেন আদম-হাওয়া।

তাদের সময় নিয়ম ছিল, একই সাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তানের জন্মদান। আরও নিয়ম ছিল, এক সাথে জন্ম নেয়া পুত্র অন্যের সাথে জন্ম নেয়া কন্যার মধ্যে বিবাহ হতে পারবে। পরবর্তীকালে আদম-সন্তানদের মধ্যে পুত্র-কন্যাদের সংখ্যা বেড়ে গেলে এই বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন রহিত হয়ে যায়।

ব্যক্তি-মানুষের বয়স যেমন শৈশব থেকে বাল্য, বাল্য থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে যৌবনের পর এমন একটা পর্যায়ে উপনীত হয়, তখন তার জীবন-চালনার জন্য আর নতুন দিক নির্দেশনার প্রয়োজন পড়ে না, তেমনি মানবতার পরিণত বয়সে হিসাবে শেষ শিক্ষক নবী হজরত মুহম্মদ (সা.) এর আগমনের পর আর কোন নতুন নবী রসূলের দরকার হবে না। মানুষ শেষ নবীর আনা আদর্শের ভিত্তিতে ইজতিহাদ (বুদ্ধি) প্রয়োগ করে তাদের নিজেদের সমস্ত সমস্যার সমাধান পেতে পারবে। এটাই খতমে নবুওতের মূল ভিত্তি।

এ কথা পূর্বেই বলা হয়েছে যে, পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী ছিলেন হজরত আদম ও হজরত হাওয়া। তাদের প্রথম নিবাস ছিল বেহেশত, পরে সেখান থেকে তাদের পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয় এবং প্রথমে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে তাদের সন্তান সন্ততি। আজ আমরা যারা বিশ্বে বিভিন্ন ভূখণ্ডে বসবাস করছি, আমরা সবাই সেই প্রথম মানব-মানবীর অধস্তন বংশধর।

আমরা আগেই জেনেছি, আমাদের এই পার্থিব জীবন অত্যন্ত সীমাবদ্ধ সময়ের জন্য। তবে মৃত্যুর সাথে সাথেই আমাদের জীবন শেষ হয়ে যায় না। আমরা আমাদের এ পার্থিব জীবনে স্রষ্টা-প্রদত্ত জীবন বিধান যেভাবে মেনে চলবো, মৃত্যু-পরবর্তী অনন্তকাল ধরে তার পুরস্কার বা শাস্তি ভোগ করবো। সুতরাং পর জীবনের অনন্তকাল আমরা যাতে স্রষ্টাপ্রদত্ত জীবন-বিধান মেনে চলার প্রতিফল হিসাবে স্রষ্টা সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভ করে ধন্য হতে পারি, সে চেষ্টা-সাধনা করাই আমাদের জন্য কাম্য। বলা বাহুল্য, আমাদের সেই অনন্তকালের জীবন শুরু হয় কবর থেকে এবং সেখানে আমাদের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউই সঙ্গে থাকবে না। সুতরাং, পৃথিবীতে আমরা যতদিন বেঁচে থাকি, আমরা যাতে স্রষ্টা নির্দেশিত পথে থেকে যেন তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন ও ক্ষমা লাভ করতে পারি, সে চেষ্টা ও সাধনাই হতে হবে আমাদের জীবনের প্রধান কাম্য।

সে চেষ্টা ও সাধনার পরিবর্তে আমরা যদি ধর্মনিরপেক্ষাতার নামে ধর্মহীনতার পথে এগিয়ে যাই তা হবে আমাদের জন্য প্রচণ্ডতম ভুল ও অভিশাপের নামান্তর। আসলে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক বলে নিজেদের পরিচয় দেন, তারা নিজেরাও হয়ত জানেন না ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে তারা কী বুঝাতে চান। তারা আসলে যা চান তা সম্ভবত ধর্মহীনতা নয়। তারা আসলে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সম্প্রদায়নিরপেক্ষতা বুঝাতে চান, যা আদৌ ধর্মহীনতা নয়, বরং তা ধর্মীয় জীবন-দর্শন (বিশেষজ্ঞ ইসলামী জীবন-দর্শনের) অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইসলামের সোনালী যুগের ইতিহাসে এ ধরনের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ ধরনের একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দিয়েই আমাদের আজকের এ লেখার ইতি টানব।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) এর খিলাফত আমলের কথা। সে সময় মিশরের গভর্নর ছিলেন আমর ইবনে আস। একবার গভর্নরনন্দন এক অমুসলিম বালককে অন্যায়ভাবে চপেটাঘাত করে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গভর্নরের কাছে অভিযোগ করা হলেও গভর্নর তার ছেলের বিরুদ্ধে সে অভিযোগকে গুরুত্ব দেননি। গভর্নর নন্দনের বিরুদ্ধে মিসরে কেউ বিচার করতে রাজী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খলিফা হজরত উমর (রা.) পর্যন্ত পৌঁছে।

হজরত উমর (রা.) এ অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে মদিনায় ডেকে পাঠান। সকলে উপস্থিত হলে তিনি সমস্ত বিষয়টি বিস্তারিতভাবে শুনে এ সম্পর্কে বুঝতে পারেন যে, গভর্নর-সন্তানই দোষী। কিন্তু গভর্নর সন্তান বলে তার বিরুদ্ধে কেউ সত্য প্রকাশ করছে না। সত্য বুঝবার পর তিনি তাঁর ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন, অমুসলিম বালককে গভর্নর নন্দন যেভাবে চপেটাঘাত করেছে, সে যেন ঠিক তেমনিভাবে সকলের সামনে গভর্নর নন্দনকে চপেটাঘাত করে। শুধু তাই নয়, রাগত স্বরে গভর্নর আমর ইবনে আসকে বলেন, মুনজু কাম তাআব্বাদতুমুন্নাছা, ওয়াকাদ অলাদাতহুম উম্মুহুম আহরারান? অর্থাৎ তোমরা আর কতদিন মানুষকে গোলাম করে রাখবে? অথচ ওদের মায়েরা ওদের স্বাধীন করে জন্ম দিয়েছে?

আমরা এ লেখা শুরু করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য থেকে। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সকলকে একা একাই কবরে যেতে হবে। এই অনুভূতি যদি কারো মধ্যে বাস্তবে থাকে, তাহলে তার মধ্যে এ অনুভূতিও থাকতে হয় যে, মানুষের জীবন মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় না। আমরা যদি ইসলামে বিশ্বাস করি, তা হলে আমাদের একথাও মানতে হবে, আমরা মৃত্যুর পর যেমন একা একা কবরে যাব, তেমনি পরকালেও একা-একাই আল্লাহর বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কেউ আমাদের কোন কাজে আসবে না। সুতরাং এই কঠোর বাস্তবতার আলোকে আমাদের জীবন চালনা করতে হবে ¯্রষ্টা নির্দেশিত পথে। এর অন্যথা করে পরকালে কেউ সর্বশক্তিমান আল্লাহর শাস্তি এড়াতে পারবে না।

Check Also

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কর্মসূচি সমাজ পরিবর্তনে আজও শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মতবাদ

ডা. এস এ মালেক  :    মাসব্যাপী জাতীয় শোক দিবসের সমাপনী দিবসে গণভবনে ছাত্রলীগ আয়োজিত সমাবেশে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *