Thursday , September 19 2019
Home / উপ-সম্পাদকীয় / সড়কে মৃতু্যর মিছিল আর কত?

সড়কে মৃতু্যর মিছিল আর কত?

সাহাদাৎ রানা  :    প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবমূখর পরিবেশে সারাদেশে উদযাপিত হয়েছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। কিন্তু এই ঈদ সবার মনে আনন্দের বার্তার রঙিন রং একে দিতে পারেনি। প্রিয়জনদের কাছে যাওয়ার আগেই অনেকের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে ঈদুল আজহার ঈদযাত্রায়। আবার অনেকে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে কর্মস্থলে ফেরার পথে হয়েছেন লাশ! তাই অনেকের জন্য ঈদ হয়েছে বিষাদে পরিপূর্ণ। এবার সড়ক দুর্ঘটনা নামক ভয়াল থাবায় ঈদযাত্রায় কেড়ে নিয়েছে ৪০ জনের বেশি মানুষের প্রাণ। এমন পরিসংখ্যান সবার জন্যই কষ্টের। কিন্তু এটা এখন প্রায় প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। গত ঈদুল ফিতরে মৃত্যের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ জনের বেশি। কখনো সংখ্যাটা কম আর বেশি হয়। এ ছাড়া ঈদযাত্রায় সড়ক দুঘর্টনার ক্ষেত্রে এখানে আর কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।

অস্বস্তির আরও একটি তথ্য রয়েছে এই ঈদযাত্রা নিয়ে। অন্য সময়ে প্রতিদিন গড়ে যত মানুষ সড়ক দুঘর্টনায় প্রাণ হারান তার প্রায় কয়েকগুণ বেশি মানুষ প্রাণ হারান ঈদযাত্রায়। এটা সত্যিই সবার জন্য বেদনাধায়ক। কিন্তু এটা যেন প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র অসতর্কতার পাশাপাশি আরও কিছু ছোটখাটো কারণে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অথচ এমন দুর্ঘটনা আমাদের ঈদযাত্রায় কারও কাম্য নয়। কিন্তু বিগত তিন দশক ধরে এর মাত্রা যেন প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। এখন প্রশ্ন হলো- মৃতু্যর সংখ্যা কততে গিয়ে ঠেকলে আমাদের বোধোদয় হবে। আর ঈদযাত্রায় সড়ক দুঘর্টনা কবে কমবে। তবে এমন মৃতু্যর দায় শুধু একা কারো নয়। এর দায় প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে আসলে আমাদের সবার!

আবারও একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ঈদযাত্রায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মানুষ সড়ক দুঘটনায় প্রাণ হারান। কিন্তু কেন? অথচ, এ সময় ঈদযাত্রায় সড়ক দুঘর্টনার সংখ্যা কম হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আমাদের দেশে ঈদযাত্রায় সড়ক দুঘর্টনার সংখ্যা বেড়ে যায়। অবশ্য এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। এ সময় রাজধানী থেকে প্রায় ৮০/৯০ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান। তবে এটাও সত্যি নৌ-ট্রেনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ সড়ক পথে বাড়িতে যাতায়াত করেন। তাই তাদের মধ্যে কাজ করে দুশ্চিন্তা। নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো আর নির্ঝঞ্ঝাটে পুনরায় এই শহরে ফিরে আসার চিন্তায় এ সময় অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যায়। আবার সড়কে নিজের প্রাণ দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হন কেউ কেউ। ঈদযাত্রায় সড়কে বেশি দুঘর্টনার কারণ হলো- এ সময় ঈদকে টার্গেট করে ফিটনেসবিহীন, রুটপারমিটবিহীন পুরনো বাস রঙ করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সংখ্যা বেড়ে যায় অননুমোদিত বাসেরও। এসব বাসের কারণে এ সময় ব্যাপক হারে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা আমরা লক্ষ্য করি। এ ছাড়া রয়েছে- অদক্ষ চালকদের দৌরাত্ম্য। মূলত ঈদকে সামনে রেখে অদক্ষ চালকরা স্টিয়ারিং ধরে। আর এদের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেড়ে যায়। এবারও ঈদযাত্রায় ব্যাপক প্রাণহানির পেছনে রয়েছে এসব অদক্ষ চালকদের খামখেয়ালিপনা। আর রয়েছে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো।

মূলত সড়কে চালকরা শৃঙ্খলা না মানায় সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর ঈদের সময় রাস্তা ফাঁকা থাকায় এসব চালকদের মধ্যে দ্রম্নত গতিতে গাড়ি চালানোর একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা কাজ করে। আর এ কারণে ঈদযাত্রায় বৃদ্ধি পায় সড়ক দুর্ঘটনা। অবশ্য এ সময় আরও একটি প্রবণতা সড়কে লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে মোটরসাইকেল চালকরা নিজেদের মধ্যে অনেক সময় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। কার আগে কে গন্তব্যে যেতে পারেন। এ সময় রাস্তা ফাঁকা থাকায় যানবাহনের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই দ্রম্নতগতিতে যানবাহন চালানো সড়ক দুঘর্টনার অন্যতম বড় কারণ।

অথচ সড়ক দুঘর্টনা প্রতিরোধে আমরা সবসময়ই সোচ্চার থাকি। বিশেষ করে দুই একটি আলোচিত সড়ক দুঘর্টনা নিয়ে সোচ্চার হওয়ার পর থেমে যায় আমাদের কণ্ঠ। বিগত প্রায় এক বছর ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দুই দফা আন্দোলনের পর এ বিষয়ে প্রায় একশর বেশি সুপারিশ করা হয়। যাতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। কিন্তু সেই সুপারিশ প্রণয়ন শুধু কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, কার্যক্ষেত্রে আর প্রয়োগ হয় না। অথচ, ঈদযাত্রার আগে মন্ত্রীরা আমাদের আশ্বস্ত করেন। শোনান নিরাপদ ঈদযাত্রার কথা। তাদের আশ্বাসকে বিশ্বাসও করেন জনগণ। কিন্তু সুফল আর পাওয়া হয় না। বরং ঈদযাত্রায় বেড়ে যায় সড়ক দুঘর্টনার মাত্রা। তাই এ নিয়ে মানুষের মধ্যে কাজ করে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা। দুঃখের বিষয় এমন উৎকণ্ঠা নিয়েই আমাদের সবসময় যাত্রা করতে হয়। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? প্রশ্ন এটাই।

আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির আরও একটি বড় কারণ হলো- বিচার না হওয়া। দেশের মানুষ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবি করে সবসময়ই। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যা হয় না। দুর্ঘটনার পর কিছু মামলা হলেও সেই মামলায় দোষীদের শাস্তিও হয় না। আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যান আসামিরা। মূলত বিচারহীন, প্রতিকারহীন অবস্থায় কোনো কিছু চলতে থাকলে তার পুনরাবৃত্তি স্বাভাবিকভাবে ঘটবেই। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এটা একটু বেশি হচ্ছে। তবে এটাও সত্যি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধুমাত্র কঠোর শাস্তির বিধান করে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। কঠোর শাস্তির পাশাপাশি আরও অনেক বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।

ইতোমধ্যে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে। এখন প্রয়োজন এসব প্রস্তাব বা সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। কারণ এসব প্রস্তাব বা সুপারিশ বাস্তবায়ন না করা গেলে কোনোভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।

বিভিন্ন সংস্থায় জরিপ অনুযায়ী প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কারও কারও মতে অবশ্য সংখ্যাটা আরও বেশি। তবে মৃতের সংখ্যা নিয়ে তারতম্য থাকলেও, এটা সত্যি সড়ক দুর্ঘটনায় কারণে দেশজ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ, গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগের চেয়ে বেশি মানুষই কর্মক্ষম। যাদের বয়স ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। নিহতের পরিবার এসব কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের মৃতু্যর কারণে পুরো পরিবারে দেখা দেয় এক ধরনের অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি শুধু পরিবার নয়, তাদের হারিয়ে দেশও হয় ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ কর্মক্ষম জনগণ যেমন পরিবারের জন্য সম্পদ তেমনি দেশের জন্যও। অথচ আমরা আমাদের এসব সম্পদকে হারিয়ে ফেলছি প্রতিদিন। কিন্তু আমরা এমনটা চাই না। আমরা চাই, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সড়ক হবে সবার জন্য নিরাপদ।

Check Also

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কর্মসূচি সমাজ পরিবর্তনে আজও শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মতবাদ

ডা. এস এ মালেক  :    মাসব্যাপী জাতীয় শোক দিবসের সমাপনী দিবসে গণভবনে ছাত্রলীগ আয়োজিত সমাবেশে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *