Home / বিশেষ প্রতিবেদন / বিশেষজ্ঞ ছাড়া ‘ভুল পথে’ এডিসের বিরুদ্ধে লড়াই

বিশেষজ্ঞ ছাড়া ‘ভুল পথে’ এডিসের বিরুদ্ধে লড়াই

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :    এডিস মশার বিস্তারে ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ প্রকোপের মধ্যে কীভাবে এর সমাধান হবে, সে প্রশ্নে জেরবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে তারা অনেকটাই সেনাপতিহীন অবস্থায়। কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার পদ শূন্য ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনে। আর বিশেষজ্ঞ ছাড়া এডিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কার্যক্রমটা ভুল পথে যাচ্ছে- বলছেন একজন জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ।

এডিস মশার জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রধানত বাসাবাড়ি এবং তার আশপাশে। অথচ সিটি করপোরেশন এতদিনের মশাবিরোধী অভিযান ছিল বাড়ির বাইরে। ইদানীং বাসাবাড়িতে গিয়ে লার্ভা ধ্বংসে মনোযোগ দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এরপরও সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্রগুলো যে এখনো বেশ মশার জন্ম দিয়ে যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। কারণ, প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। আর মশা নিয়ে কথাবার্তা ঢাকায় যতটা, ঢাকার বাইরে নয় ততটা। অথচ রোগীর সংখ্যা এখন ঢাকার বাইরেও দিনে এক হাজারের বেশি হয়ে পড়ছে।

এর মধ্যে সিটি করপোরেশন মশা মারতে নতুন ওষুধ আমদানি আর ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম বাড়িয়েছে। স্পষ্টতই বিশেষজ্ঞ মতের বাইরে গিয়ে কাজ হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে তুষ্ট করতে আর গণমাধ্যমের চাপ অগ্রাহ্য করতে পারছে না নগর কর্তৃপক্ষ।

দুই নগর কর্তৃপক্ষ আবার দেশের বাইরে থেকে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানার্জন করতে চাইছে। অথচ তাদের সুপরামর্শ দিতে পারতেন, এমন পদ থাকলেও সেখানে কাউকে নিয়োগই দেওয়া হয়নি।

এর মধ্যে সিটি করপোরেশন আবার নতুন যে মশার ওষুধ কিনতে যাচ্ছে, সেখানেও নিজ সংস্থার বিশেষজ্ঞের মত জানতে পারছে না ঢাকা উত্তর বা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম মনে করেন, যদি কীটতত্ত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নির্ধারিত কর্মকর্তারা থাকতেন তাহলে অনেক বিষয়ে ধোঁয়াশা কেটে যেত।

‘পোকামাকড় বিশেষজ্ঞরা জানেন ডাবের খোসার পানিতে কতটুকু ওষুধ দিতে হবে আর ট্যাংকির পানিতে দিতে হবে। না বুঝে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে গেলেই হবে না। বরং এ ওষুধ যদি মশা কোনোভাবে অভিযোজন করে ফেলে সে মশা আমাদের জন্য আরও ক্ষতিকর। কারণ তার সহনশীলতা তৈরি হয়ে যাবে। পরে সেগুলোকে মারা আরও কঠিন। এভাবে মশার সংখ্যা বেড়েই যাবে।’

ঢাকার দুই নগরে কীটতত্ত্ব কর্মকর্তা না থাকায় তাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে অন্য কর্মকর্তাদের। কিন্তু দায়িত্বে আছেন, এমন একজন নিজে বলেছেন, এটি তার জ্ঞানের বাইরে এবং বিশেষজ্ঞ লোক না থাকায় কাজে ক্ষতি হচ্ছে।

এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়ে গেলেও ঢাকায় এই রোগ ৬০ দশকেও ছিল বলে জানাচ্ছেন প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এ বি এম আবদুল্লাহ। তবে ২০০০ সালে দেশে প্রথমবারের মতো ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ। এরপর থেকে প্রতি বছরই হচ্ছে, কখনো প্রকোপ বেশি, কখনো কম। তবে গত দুই বছর ধরেই ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে।

এর মধ্যে ঢাকার দুই নগর কর্তৃপক্ষ কীটতত্ত্ববিদের অভাবে ভুগছে বছরের পর বছর। আর এবার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একে নগরবাসীর প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলা হিসেবে দেখছেন একজন নগর পরিকল্পনাবিদ।

আর বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ভুপেন্দর নাগপাল ঢাকায় এসে যা বলে গেছেন, তাতে স্পষ্টতই সিটি করপোরেশন ভুল কৌশলে মোকাবেলার চেষ্টা করছে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এডিসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ফগার মেশিন নিয়ে ওষুধ ছিটালে কাজ হবে না। ঘরে ঘরে বা অন্য উৎসস্থলে অন্য কৌশলে ধ্বংস করতে হবে এডিসের লার্ভা। সেই সঙ্গে নগরবাসীকে পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কিন্তু এসব কার্যক্রম কখনো সেভাবে দেখা যায় না। নগরবাসীর করণীয় কী, সেসব বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবও স্পষ্ট।

এর মধ্যে জানা যাচ্ছে- দুই সিটি করপোরেশনে দুইটি করে কীটনিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার মোট চারটি পদ রয়েছে। কিন্তু কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পদগুলো কবে থেকে ফাঁকা সুনির্দিষ্ট করে সেই তথ্যও দিতে পারছেন না কেউ। তবে এটা জানা গেছে যে, নগর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেনও। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আতিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি ধরেননি। আর দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের ফোন নম্বরটিই বন্ধ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটের স্বাস্থ্য বিভাগে কীটনিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা হিসেবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমদাদুল হকের নাম উল্লেখ আছে।

তথ্য কর্মকর্তা আতিকুর রহমান নিশ্চিত করেছেন, ঊর্ধ্বতন কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা নেই আর তার দায়িত্ব পালন করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমদাদুল হক নিজেই বলেন, ‘এটা একটা জরুরি গুরুত্বপূর্ণ পদ। কিন্তু আপাতত কেউ না থাকায় আমাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু জরুরি দাপ্তরিক কাজ করাই আমার কাজ।’

একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কীটতত্ত্ববিদের কাজ কতটা সফলভাবে করতে পারবেন- এমন প্রশ্নে ইমদাদুল বলেন, ‘আমি তো কীটতত্ত্বের ব্যাপার পুরোপুরি বুঝব না। এটা তো স্বাস্থ্য বিভাগের একটি শাখা। নির্ধারিত বিষয়ে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ লোক থাকা দরকার।’

‘বিশেষ করে এ সময়টিতে একজন কীটতত্ত্ববিদ থাকলে মশার ধরণ বুঝতে পারতো এবং সে বিষয়ে যথাযথ ওষুধ থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ সবই করা যেত।’

উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোমিনুর রহমান মামুন এ বিষয়ে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বিভক্তের ফলে গবেষণাগারটি দক্ষিণেই রয়ে গেছে। যদিও এর সঙ্গে কীটনিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার সম্পর্ক নেই, তবু আমরা নির্ধারিত পদ পূরণের চেষ্টা করব।’
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় নিশ্চিত করেন তাদেরও কোনো কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা নেই।

দুই সিটি করপোরেশনের এই চিত্রে বেশ আক্ষেপ নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমরা কীটতত্ত্ব অর্থাৎ পোকামাকড় নিয়ে পড়াই। কোনো মৌসুমে কোন ধরনের পোকার উপদ্রব হতে পারে এবং সে উপদ্রব থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে থাকি। এখনকার সময়ে ডেঙ্গু মশার উপদ্রব অনেক বেশি। অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারাও যাচ্ছে। এটি যদি সারাবছর পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নির্ধারিত পরিমাণের ওষুধ প্রয়োগ করে সর্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যেত তাহলে হয়তো এই পর্যায়ে যেত না। সিটি করপোরেশনের উচিত আগামীতে যেন ডেঙ্গুর উপদ্রব বাড়তে না পারে সে জন্য যোগ্য লোককে নিয়োগ দেওয়া উচিত।

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যদি পদ থাকে তাহলে লোক নেই কেন? উন্নত বিশ্বেও তো ডেঙ্গু আক্রমণ করে। ব্যবস্থাও নেওয়া থাকে। একটা আধুনিক নগরী হতে হলে সেই জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর এত জনবহুল দেশে আমরা কতটা দুর্বল! সেখানে একজন কীটনিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা নেই?’

‘তাহলে লোকবলহীন প্রশাসনিক কাঠামো কীভাবে চলছে? জনস্বাস্থ্য বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে এমনটা সম্ভব হয়েছে। ফলে ডেঙ্গুর বিষয়টি তারা পুরোপুরি বুঝতেও পারছে না। … সার্বিকভাবে গুরুত্ব না দিলে আগামী দিনগুলোতেও এমন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।’

বিষয়টি স্পষ্টত অবহেলার প্রমাণ বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব। বলেন, ‘ডেঙ্গু হঠাৎ আক্রমন করেনি। এর আগেও হয়েছে। সেজন্যই সিটি করপোরেশনে সুনির্ধারিত পদটি রয়েছে। সেখানে কীটতত্ত্ববিদ না থাকাটি স্পষ্টতই জনগণকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।’

Check Also

মহাসড়কে তিন চাকার বিপদ

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :    ঈদ শেষে শহরে ফেরার যাত্রা আর শেষ হয়নি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *