Sunday , September 22 2019
Home / উপ-সম্পাদকীয় / কৃষকদের অধিকার ও মর্যাদা

কৃষকদের অধিকার ও মর্যাদা

মাহমুদুল হক আনসারী  :  দেশ, মাটি, মানুষ আর গ্রামকে সুন্দর ও সঠিকভাবে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই কৃষি ও কৃষকদের অধিকার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সমাজের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো তাদের সম্মান দিতে হবে। কৃষিকে উৎসাহিত ও উৎপাদন দ্বিগুণ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের দেশের ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। দেশের সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতা থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরে যারা আজকে প্রতিষ্ঠিত নেতা ও কর্মকর্তা সবাই এক সময় কৃষি ও কৃষকের পরিবারে জন্ম নিয়েছিল। দেশের প্রত্যন্ত জমিতে এখনো কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষিপণ্য উৎপাদন করে দেশ জাতিকে সচল রাখছে। আমি ও আমরা কৃষকের সন্তান, কৃষি কৃষকের পরিবার থেকে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও সেই ইতিহাস আমরা অনেকেই ভুলে যেতে বসেছি। আমার জন্মভূমির মালিক কৃষকসমাজ কেমন আছে! কৃষকের ঘরে জন্ম নিয়ে আমি আমরা এখন দেশের মন্ত্রী-মিনিস্টার, সরকারপ্রধান হচ্ছি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদান রাখছি। আমি ও আমরা গ্রামের কৃষকের কোলাহলমুক্ত জীবন থেকে পৃথক হয়ে শহরের নামি-দামি এলাকায় বাস করছি। বিদু্যৎ, গ্যাস আর ওয়াসার পানিতে এসি আর ফ্রিজের আধুনিক সব সুবিধা ভোগ করে উন্নত জীবনে জীবন চালাচ্ছি। যাদের জন্য আমার ও দেশের জন্য পরিশ্রমের ঘামের ওপর দেশ মা মাটি প্রতিষ্ঠিত সেই কৃষি ও কৃষকদের জীবন কেমন যাচ্ছে কীভাবে যাচ্ছে সে হিসাব কয়জনই বা রাখছে সেটাই এখন আমার বলতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে হয় তাদের দুর্বিষহ জীবন কষ্ট ও দুঃখের কাহিনীগুলো রাষ্ট্রের কর্ণধারের নিকট পৌঁছাতে। নিশ্চয় আমার বিশ্বাস দেশের শাসকগোষ্ঠী থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন এনজিও সংগঠনের কাছে কৃষকদের সুখ ও দুঃখের সামাজিক প্রতিবেদন আছে।
\হকৃষি ও কৃষি কাজে কৃষক ভাইয়েরা কেন আজকে নিরুৎসাহিত হচ্ছে সেখানে রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীকে চিন্তা করতে হবে। একজন কৃষক সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে ফসল পণ্য উৎপাদন করছে, তার পেছনে শ্রম আর অর্থ ব্যয়ে যে পুঁজি খরচ হচ্ছে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা তা জমি থেকে পুষে উঠতে পারছে না। কঠোর পরিশ্রম করে জমির ফসল ফলিয়ে সে ফসলে দেশ ও জাতিকে সচল রেখে কিন্তু যে কৃষক এতবড় অবদান ও আত্মদান করছে বিনিময়ে তিনি তার পরিবার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাও পাচ্ছে না রাষ্ট্র থেকে। কৃষকসমাজ তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। সার ও কীটনাশক, জমির খাজনা দিয়ে কঠোর পরিশ্রমে কৃষিকর্ম অব্যাহত রেখেছে কৃষকসমাজ। কৃষি উৎপাদনে যে পরিমাণ খরচ হয় কিন্তু সেভাবে একজন কৃষক তার ফসল উৎপাদনের খরচ ওঠাতে পারছে না। ফলে কৃষি কাজে উৎসাহ হারাচ্ছে কৃষকসমাজ। পেশা পরিবর্তন করে গ্রাম ছেড়ে শহরের আধুনিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করছে। অনেক কৃষিজমি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। সংস্কার ও চাষের অভাবে অনেক সরকারি-বেসরকারি খাসজমি পুকুর, বিল, টিলা পড়ে আছে। এসব জমির সঠিকভাবে তদারকি ও চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনার অভাবে ওই জমি পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে বিদেশ থেকে খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়।

রাষ্ট্রের কৃষি খাতের সঠিক ও প্রয়োজনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতার কারণে কৃষিজমি থেকে বাস্তব কৃষক পর্যন্ত অবহেলা আর ভোগান্তির মধ্যে আছে। গ্রামের কৃষকরা কী পরিমাণ কষ্ট এবং দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে সেটা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ না করলে বোঝা মুশকিল। এক বস্তা বেগুন বিক্রি করে মাত্র পায় ১০০ টাকা। আর ওই ১০০ টাকায় কৃষকের মাছ, মরিচ, লবণ ক্রয় করা সম্ভব হয় না। অন্যসব ভোগ্যপণ্যের চড়া দাম। কিন্তু কৃষক যে তরিতরকারি উৎপাদন করছে তার সঠিক মূল্য সে পাচ্ছে না। কোন জায়গায় সমস্যা, অবহেলা আর সমন্বয়হীনতা রয়েছে সেটা খতিয়ে দেখছে না সমাজ। যার কারণে কৃষি ও কৃষি কাজের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত আছে তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক ও সামাজিকজীবন নিয়মিতই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। একজন কৃষক সারাদিন জমিতে কাজ করার পর পরিবার-পরিজনের জন্য একবেলা খাবারের আয়োজন করতে তার কষ্ট হয়ে যায়। সে ঠিকভাবে পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতে পারছে না। ছেলে-সন্তানদের দৈনন্দিন খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঈদ আনন্দ, বিবাহ অনুষ্ঠান, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সে মর্যাদার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারে না। সমাজের অন্য পেশার মানুষ যেভাবে জীবনকে আনন্দময় করে উপভোগ করছে সে ক্ষেত্রে কৃষি কাজের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তারা সামাজিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় কঠোর পরিশ্রম আর সাধনার পরও তারা নিজ ও পরিবারের সামাজিক ব্যয়ভার বহন করতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে একজন সরকারি অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন ব্যক্তি সুন্দরভাবে তার ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন অতিবাহিত করছে। তার সামাজিক মর্যাদা ও আয়-ব্যয় খরচ নাগালের মধ্যে থাকে। কিন্তু কৃষকের নুন আনতে পান্তা শেষ হয়ে যায়। তার পরিবারের ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছুতেই মারাত্মকভাবে অসম্পূর্ণতার মধ্যে থাকে। কৃষকের পণ্য রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে না পৌঁছালে সেখানে মানুষ ও সমাজ স্থিতিশীল থাকবে না। সামাজিক পরিবেশ স্থিতিশীলতা ধ্বংস হয়ে পড়বে। অথচ যাদের রক্ত এবং ঘামের শ্রমের ফসল এ সমাজ, তাদের জন্য সমাজের দায়িত্বশীল কর্তাদের তেমন কোনো ভূমিকা দেখছি না।

কৃষক মারা যাক, তাতে সমাজের কী আসে যায়, এমন ধরনের চিন্তা-চেতনায় মনে হয় আমরা আছি। কৃষকের জন্য কোনো ত্যাগ, সাহায্য, অনুদান, ভর্তুকি দিতে আমাদের কর্তাদের খুবই কষ্ট হয় বলে মনে হয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা কৃষকদের জন্য বরাদ্দ ও প্রাপ্তিতে ভোগান্তির শেষ থাকে না। তাহলে কী আমরা আমাদের পূর্বপুরুষ, পূর্বপরিচয় ভুলে যেতে বসছি। যাদের ত্যাগ ও শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে আমি ও আমার সমাজ প্রতিষ্ঠিত তাদের এ করুণ দুর্বিষহ অমানবিক জীবনে আমাদের কী কারও কোনো দায়িত্ব নেই? তাদের বেলায় আমাদের চোখ-কানকে বোবা করে ফেলছি? মনে হয় আমরা এখন কৃষক আর কৃষকের ছেলে-সন্তানের পরিচয় দিতে চাই না। আমরা এখন হয়ে পড়ছি আধুনিক যুগের আধুনিক মানুষ। বাংলাদেশ যাদের জন্য স্বাধীন হয়েছিল, যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ছিল সে ওয়াদা আর প্রতিশ্রম্নতি বেমালুম রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা ভুলে বসেছে। সত্যিকার অর্থে যদি তাই হয় তাহলে এ দেশ বেশি দিন টিকবে না। কারণ প্রকৃতভাবে দেশের মালিক যারা তারাই যদি সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে না পারে তাহলে তাদের অভিশাপে গোটা জাতি অভিশপ্ত হবে।

দেশ, মাটি, মানুষ আর গ্রামকে সুন্দর ও সঠিকভাবে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই কৃষি ও কৃষকদের অধিকার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সমাজের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো তাদের সম্মান দিতে হবে। কৃষিকে উৎসাহিত ও উৎপাদন দ্বিগুণ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

Check Also

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কর্মসূচি সমাজ পরিবর্তনে আজও শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মতবাদ

ডা. এস এ মালেক  :    মাসব্যাপী জাতীয় শোক দিবসের সমাপনী দিবসে গণভবনে ছাত্রলীগ আয়োজিত সমাবেশে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *