Home / অর্থনীতি / ইসিআর ব্যবহার নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি যে কারণে

ইসিআর ব্যবহার নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি যে কারণে

অর্থনীতি ডেস্ক :   আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আএমএফ) পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তায় সরকারের তৈরি করা ভ্যাট আইনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনা। এজন্য সরকার তৈরি করেছিল ভ্যাট আইন। দ্রুত ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে আইএমএফ’র চাপ ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সরকার ভ্যাট আইনটি কার্যকর করতে পারেনি। বারবার পিছিয়ে যায় নতুন ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। ২০১৭ সালে শেষবারের আপত্তির কারণে দুই বছরের জন্য ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন স্থগিত করে সরকার। কিন্তু কী কারণে ব্যবসায়ীরা এই ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল?

খোজ নিয়ে জানা গেছে, এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইসিআর (ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার) মেশিনের ব্যবহার নিশ্চিত করা। ব্যবসায়ীদের আপত্তি ছিল এখানেই। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর মেশিন ব্যবহারের ফলে তারা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাটের টাকা আত্মসাত করতে পারবেন না। কারণ ভ্যাট আদায় করলে তা ইসিআরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। ইসিআরে তৈরি করা মেমো ক্রেতাকে দিতে হবে যা পরবর্তীতে হিসাব মতো রাজস্ব বিভাগে জমা দিতে হবে। ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন, পণ্যমূল্যের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাটের টাকা ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে মুনাফা হিসেবে নিজেরাই ভোগ করবেন।

পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভ্যাটের আওতায় আসা দোকানগুলোতে ইসিআর মেশিন বসিয়ে দেয়। তখন দোকান মালিকরা সব লেনদেনে ইসিআর ব্যবহার করতেন না। ইসিআর ব্যবহার করলেও লেনদেনের ১০টা করতেন ইসিআরে, আর ৯০ টা করতেন হাতে লেখা ক্যাশ মেমোতে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ক্রেতার সঙ্গে লেনদেনের কোনও রেকর্ডই রাখেননি ব্যবসায়ী। ক্রেতা ভ্যাট পরিশোধ করলেও তাকে কোনও ক্যাশ মেমো দেওয়া হতো না। ক্রেতা ক্যাশ মেমো চাইলে হাতে লেখা ক্যাশ মেমো দিতেন। সেখানে ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাটের টাকা উল্লেখ থাকতো না। এই বিষয়টি রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে ধরা পড়লে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়তেন কোনও কোনও ব্যবসায়ী। এক্ষেত্রে অনেক সময় রাজস্ব কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটেছে। ব্যবসায়ীরা একে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ‘নাজেহাল’ বা ‘হয়রানি’ বলে জনমত সৃষ্টির চেষ্টাও করেছেন।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তীতে ইসিআরের পরিবর্তে প্যাকেজ ভ্যাটের প্রস্তাব করেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব মতো এনবিআরের পক্ষ থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় আনা হয়। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সারা বছরের বেচাকেনাকে সমন্বয় করে বছরে কত টাকা ভ্যাট হতে পারে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার মাধ্যমেই প্যাকেজ ভ্যাট ঠিক করা হতো। ব্যবসায়ীদের বছরে একবার সেই প্যাকেজ ভ্যাটের অর্থ এনবিআরে জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়। এক্ষেত্রেও ঘটে বিপত্তি। ব্যবসায়ীরা সারা বছরের প্রকৃত লেনদেন গোপন করে বেচাকেনা কম দেখাতেন রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে যাতে প্যাকেজ ভ্যাটের পরিমাণ কম নির্ধারণ করা হয়। এতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যে দোকানে সারা বছর ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা বেচাকেনা হয়- এ রকম একটি দোকানে সারা বছরের বেচাকেনা দেখানো হয়েছে মাত্র ২০ লাখ টাকা। ফলে ২০ লাখ টাকার ওপর প্যাকেজ ভ্যাট নির্ধারণ করে দেওয়া হতো।

পরবর্তীতে এ ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন সরকারের রাজস্ব বিভাগের কিছু কর্মকর্তা যারা এনবিআরের পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করতেন। এর সঙ্গে এনবিআরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও ইন্ধন ছিল বলে জানা গেছে। তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকৃত লেনদেন আড়াল করে ঘুষের বিনিময়ে সারা বছরের বেচাকেনা কম দেখিয়ে প্যাকেজ ভ্যাট নির্ধারণ করে দিতেন। এর ফলে যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা তা থেকে বঞ্চিত হতো সরকার। আর এতে ব্যবসায়ী ও অসাধু কর্মকর্তা দুজনই লাভবান হতো। এ কারণেও ব্যবসায়ীরা ইসিআর মেশিনের বিরোধিতা করেছেন।

জানা গেছে, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে ভ্যাট আইনের কোথাও কোনও প্রকার হাতে লেখা ক্যাশ মেমোর গ্রহণযোগ্যতা রাখা হয়নি। যেহেতু ভ্যাট দেবেন ক্রেতা, সে কারণে একজন ক্রেতা পণ্য কেনার পর দাম পরিশোধের সঙ্গে ভ্যাটও পরিশোধ করবেন যা ক্যাশ মেমোতে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে তিনি জানবেন সরকারি কোষাগারে কত টাকা তিনি ভ্যাট বাবদ জমা দিলেন। পরবর্তীতে কোনও এক সময় ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তা হিসাব মতো সংগ্রহ করবেন সরকারের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা। তাই ইসিআরে মেমো করা হলে পণ্যের দামের সঙ্গে নেওয়া ভ্যাটের টাকা সরকারের তহবিলে জমা না দিয়ে উপায় নাই। ইসিআরে রেকর্ড হওয়া টাকা আত্মসাতের সুযোগও নাই বা থাকবে না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা চাচ্ছিলেন যাতে কোনোভাবে ইসিআর মেশিনে ভ্যাট আদায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা ইসিআর মেশিনের বিরোধিতা করিনি, বিরোধিতা করেছি সিস্টেমের। কারণ, সে সময় যেভাবে এনবিআরের লোকজন দোকানে দোকানে গিয়ে ইসিআর মেশিন বসিয়ে দিয়ে আসছিলেন পরবর্তীতে দেখা গেছে, দোকানিরা বেচাকেনা করা লেনদেনের ১০ শতাংশ ইসিআরে লিপিবদ্ধ করেন না। টেবিলের ওপর দিয়ে ১০টি আর টেবিলের নিচ দিয়ে ৯০টি বেচাকেনার লেনদেন করেন। পরবর্তীতে প্যাকেজ ভ্যাটের ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তারা যুক্ত হয়ে গেলেন। গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর এমন আচরণে পুরো ব্যবসায়ী সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণেই আমরা ইসিআরের বিকল্প আনার কথা বলেছি।’

উল্লেখ্য, আইএমএফ’র কাছ থেকে পাওয়া দুই বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে ভ্যাট আইন তৈরি করেছিল সরকার। পরবর্তীতে এই ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফ বারবার চাপ দিয়ে আসছিল।

Check Also

হাইকোর্টে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান

ঢাকার ডাক ডেস্ক  :    বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় অকৃতকার্য নিম্নমানের পণ্য বাজার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *