Wednesday , December 11 2019
Home / উপ-সম্পাদকীয় / অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে নারীর অবস্থান

অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে নারীর অবস্থান

সালাম সালেহ উদদীন  :   বলা হয়ে থাকে, সামাজিক জীবন ব্যক্তির কাছে এক আশীর্বাদ, এর পূর্ণতা লাভ করে সামাজিক সুস্থতা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। সমাজব্যবস্থা এমনই হওয়া উচিত, যাতে ব্যক্তির স্বপ্ন ভঙ্গ না হয়। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করছে। যার প্রধান শিকার এখন নারী। তাদের ধর্ষণ গণ-ধর্ষণ করা হচ্ছে, মারা হচ্ছে পুড়িয়ে।

আমাদের নারীরা আজ স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশেই বিপন্ন ও নিরাপত্তাহীন। নারী নির্যাতন এত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে শত চেষ্টা করেও নারীদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নারী নির্যাতন কিংবা অবমাননার শিকার হচ্ছে। নারী কেবল নির্যাতন আর অবমাননার শিকারই হচ্ছে না, তাকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ করা হচ্ছে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর কায়দায় নৃশংসভাবে হত্যা করাও হচ্ছে। এ নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা ও বর্বরোচিত কর্মকান্ড কোনো গণতান্ত্রিক এবং সভ্যসমাজের চিত্র হতে পারে না। উপরন্তু বর্বর সমাজের চিত্রই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সমাজে যৌতুক নিয়ে সবচেয়ে বেশি নির্যাতন হত্যার শিকার হয় নারীরা। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, চাহিদা মতো ৭০ হাজার টাকা যৌতুক দিতে না পারায় স্বামী, শাশুড়ি, দেবর মিলে ঘরের দরোজা বন্ধ করে শরীরে কেরোসিন ঢেলে গৃহবধূর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। একপর্যায়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নানি শাশুড়ি যখন তাকে উদ্ধার করে তখন তার শরীরের অধিকাংশ ঝলসে গেছে। এই অবস্থায় পাঁচ দিন রেখে দেয়া হয় শিরিনা আক্তার নামের এই গৃহবধূকে। তাকে জরুরি চিকিৎসা না দিয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দেয়া হয়। অবশেষে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় দিনমজুর বাবা মেয়েকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তার শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। এই ঘটনায় পাঁচজনকে আসামি করে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে অশ্লীল ছবি তুলে বস্ন্যাকমেইলের পর অর্থ না পেয়ে দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়ন এলাকায়। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে ওই ছাত্রীর বাবা এক নারীসহ অজ্ঞাত আরও চারজনের বিরুদ্ধে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেছেন। ফেনির নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর এই দুটো ঘটনা ঘটলো।

দেশের সচেতন ও বিবেকবান মানুষ এমন নিষ্ঠুর ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এমন ঘটনা কেবল বর্বর সমাজেই ঘটতে পারে। যৌতুক আইনি প্রক্রিয়ায় বন্ধের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক সংস্কার ও আন্দোলন। এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে সমাজের প্রতিটি সচেতন ও বিবেকবান মানুষকে। যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে সর্বত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। লোভ-লালসার জগৎ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হবে। যারা যৌতুকের দাবিতে নির্মম ও জঘন্য অপরাধে মেতে উঠছে তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে রাষ্ট্রকেই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যৌতুকের কারণে ভেঙে যাচ্ছে প্রতিবছর লাখো সংসার। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ। যৌতুকের কারণে স্বামী তার স্ত্রীকে নানাভাবে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন করছে। যৌতুকের কারণে হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। দেশের অনেক নারীই যৌতুকের বলি হয়ে হারাচ্ছে জীবন। অনেক সময় বিয়েতে যৌতুকের বিষয়টি উত্থাপিত হয় না। কিছুদিন যেতে না যেতেই শুরু হয় যৌতুকের জন্য প্রথমে চাপ সৃষ্টি এবং পরে অমানবিক নির্যাতন, সব শেষে ঘটে হত্যার ঘটনা। আবার অনেকেই মিথ্যা মামলাও করে থাকে অর্থপ্রাপ্তি ও হয়রানির উদ্দেশ্যে। মনে রাখতে হবে যৌতুকমুক্ত এক সুন্দর ও সুস্থির সমাজ গড়ে তুলতে না পারলে নারীদের রক্ষা করা যাবে না। যৌতুকের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার সময় এসেছে। এ ধরনের সামাজিক অবিচার ও বর্বরতা দূর করতে কঠোর আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, সমাজের স্বাভাবিক ও সুস্থ গতিপ্রবাহ রক্ষা করার দায়িত্ব কার, সরকার, স্থানীয় সরকার, সমাজপতি নাকি সমাজের সচেতন মানুষের। সমাজ পুনর্নির্মাণের দায়িত্বই বা কার? আপতদৃষ্টিতে এই সব প্রশ্ন সহজ মনে হলেও এর সমাধান বেশ জটিল। সমাজে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করে, বিচিত্র এদের মানসিকতা ও রুচি। এদের কোনো সমান্তরাল ছাউনির মধ্যে আনা কঠিন। তবে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা, সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনাসহ নানা পদক্ষেপ নিতে হবে সম্মিলিতভাবে। সমাজ রক্ষা করা না গেলে পরিবার রক্ষা করা যাবে না, ব্যক্তিকে রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে সমাজ পরিবর্তনের উপাদানগুলো ব্যাখ্যা করা জরুরি। সমাজ পরিবর্তন মানে সামাজিক কাঠামো ও সমাজের মানুষের কার্যাবলি এবং আচরণের পরিবর্তন। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন। মনে রাখতে হবে বিশৃঙ্খল বর্বর ও অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে বসবাস করে উন্নত রুচি ও সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া যায় না। আমরা চাই পরিকল্পিত ও বিন্যস্ত সমাজ। নীতিবোধ ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সমাজ গঠনের প্রধান শক্তি, যা আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছি। যার কারণে আমাদের মেয়েরা যত্রতত্র ধর্ষণ ও গণ-ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তাদের শরীর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, কোনো রকম প্রতিকারহীনভাবে।

বলা হয়ে থাকে, সামাজিক জীবন ব্যক্তির কাছে এক আশীর্বাদ, এর পূর্ণতা লাভ করে সামাজিক সুস্থতা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। সমাজব্যবস্থা এমনই হওয়া উচিত, যাতে ব্যক্তির স্বপ্ন ভঙ্গ না হয়। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করছে। যার প্রধান শিকার এখন নারী। তাদের ধর্ষণ গণ-ধর্ষণ করা হচ্ছে, মারা হচ্ছে পুড়িয়ে।

হেন কোনো অপরাধ নেই, যা সমাজে সংঘটিত হচ্ছে না। স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে, মা-বাবা নিজ সন্তানকে, ভাই ভাইকে অবলীলায় হত্যা করছে। প্রেমের কারণে অর্থ সম্পত্তির লোভে সমাজে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে হতাশা, নিঃসঙ্গতা, বঞ্চনা, অবিশ্বাস আর অপ্রাপ্তিতে সমাজে আত্মহননের ঘটনাও বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে ছেলে খুন করছে বাবা-মাকে, স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার নিমিত্তে নিজের সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করছে। পারিবারিক বন্ধন স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, আত্মার টান সবই যেন আজ স্বার্থ আর লোভের কাছে তুচ্ছ। আসলে আমরা আজ যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, এমনকি যে রাষ্ট্রে বাস করছি সে রাষ্ট্রও নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আমরা নানারকম সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। পা পিছলে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে- সর্বক্ষেত্রেই অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি, যা একজন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে আমরা স্বাধীন ও একটি গণতান্ত্রিক দেশে কল্পনা করতে পারছি না। এ অবক্ষয় ইদানীং আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পারিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়। যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কি আমাদের খোলা নেই? আমাদের নারীদের জীবন নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে দুলছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে যেন পুরোপুরি অন্ধকার। যারা সমাজকে, রাষ্ট্রকে পদে পদে কলুষিত করছে, সমাজকে ভারসাম্যহীন ও দূষিত করে তুলছে, সমাজের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। চারদিকে যে সামাজিক অবক্ষয় চলছে, চলছে তারুণ্যের অবক্ষয়- এর কি কোনো প্রতিষেধক নেই? আমাদের তরুণরা আজ হতাশ এবং দিশেহারা। লেখাপড়া শিখেও তারা চাকরি পাচ্ছে না। ফলে অনেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ খুন-ধর্ষণের মতো, ডাকাতির মতো অমানবিক এবং সমাজবিরোধী কাজেও জড়িয়ে পড়ছে। কেউবা হয়ে পড়ছে নানা ধরনের মাদকে আসক্ত। অনেকেই আবার সন্ত্রাসীদের গডফাদারদের লোভনীয় হাতছানিতে সাড়া দিয়ে সন্ত্রাসে লিপ্ত হচ্ছে। কেউ কেউ করছে নারীদের ধর্ষণ গণ-ধর্ষণ। প্রশ্ন হচ্ছে তাদের এই অধঃপতনের জন্য দায়ী কে? দায়ী আমরাই। আমরাই তাদের সুপথে পরিচালিত করতে পারছি না। এর পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখল ও দলীয়করণের ব্যাপারটি তো দেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে কে আমাদের পরিত্রাণ দেবে এবং কে-ই বা আমাদের পথ দেখাবে? নৈতিক শিক্ষার প্রথম ও প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে পরিবার।

পরিবারের সদস্যরা যদি নৈতিক হয় তা হলে সন্তানরাও নৈতিক হয়ে উঠবে। এমন সমাজ কি আমরা চেয়েছিলাম? চারদিকের অবস্থা দেখে আমাদের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে। ঘুমহীন রাত কাটাতে হচ্ছে। সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কারণেই মূলত এমনটি হচ্ছে। রাষ্ট্রের মধ্যে শৃঙ্খলা না থাকলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে এটাই স্বাভাবিক, যার কারণে সামাজিক অবক্ষয় এত চরমে পৌঁছেছে। নানা ছলে, প্রতারণায় এমনকি প্রকাশ্যে পরিবারের ভেতর ঢুকে পড়ছে দুর্বৃত্তরা। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা করছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের ভয়াবহ চিত্র ভয়ঙ্করভাবে উদ্বেগজনক। মানুষ অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যান্ত্রিক ও নিষ্ঠুর হয়ে গেছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধ লোপ তাদের পেয়েছে। অন্যায়টাকেই তারা স্বাভাবিক মনে করছে। সামাজিক সুস্থতা আনয়নের পাশাপাশি নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য এ ধরনের অবক্ষয়কে প্রতিরোধ করতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে। এ জন্য ব্যাপকভাবে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

Check Also

ভেজাল রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

মীর আব্দুল আলীম  :    প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘কচু ছাড়া সব কিছুতেই এখন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *