Thursday , August 22 2019
Home / উপ-সম্পাদকীয় / সড়কে মৃতু্যর মিছিল থামাতে হবে

সড়কে মৃতু্যর মিছিল থামাতে হবে

মুহাম্মাদ রিয়াজ উদ্দিন   :     শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সড়ক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি যাত্রী সাধারণ তথা সবাইকে সচেতন হতে হবে।

বাংলাদেশে অকালে মৃতু্যর একটি কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতি বছরই কয়েক হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। আর যারা বেঁচে গিয়ে আহত হন তাদের দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়। ঈদের আগে ও পরে কয়েকদিনের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় অর্ধশতাধিক। আহত হয়েছেন শতাধিক। কোনোভাবেই সড়কের এ মৃতু্যর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য তদন্ত হয়, তদন্ত প্রতিরোধে নানা পরামর্শ থাকে। কিন্তু দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপগুলো কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক কিংবা ফিটনেসবিহীন গাড়ি দায়ী নয়। এর জন্য আমাদের মতো জনসাধারণেরও দায় আছে বৈকি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের জন্য যতই বাধা নিষেধ থাকুক না কেন আমাদের বাড়ি ফিরতেই হবে। ঈদ কিংবা যে কোনো উৎসবে শহর ছেড়ে আমাদের গ্রামে যেতেই হবে। লঞ্চ, ট্রেন কিংবা বাস- অতিরিক্ত যাত্রী হয়েও আমাদের গন্তব্যে যেতে হবে। এই যে ‘যেতেই হবে’ এ প্রবণতা থেকে যতদিন বের হওয়া যাবে না, ততদিন দুর্ঘটনা বন্ধের কোনো সম্ভাবনা নেই। ঈদ কিংবা উৎসবের পরে হলেও পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেনই জীবনের মূল্য না বুঝে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হবে? কিংবা আহত হয়ে কষ্টের জীবনযাপন করতে হবে? প্রতিবছরই ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহার ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরার স্রোত লক্ষণীয়। ট্রাকে দাঁড়িয়েও বাড়ি যেতে হবে। বাড়ি যেতে যে জীবনের ঝুঁকি থাকে সে বিষয়ে কারো মাথা ব্যথা থাকে না। এ ক্ষেত্রে যাত্রী সাধারণের সচেতনতা অনেক জরুরি। যে পরিবহনে ৪২ জন যাত্রী বহনে সক্ষম সেখানে কেনইবা আমরা ৫০ জন উঠব? যে লঞ্চের ধারণক্ষমতা ৭০০ সেখানে কেনইবা আমরা ১০০০ যাত্রী উঠব? আর ট্রেনের ছাদে চড়ে গন্তব্যে বাড়ি ফেরা- এ তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অবশ্য এবার ঈদে ট্রেনে যাত্রী হয়ে বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ কঠোর ছিল। তাই ট্রেনের ছাদে যাত্রী হয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি। এর পরও দুর্ঘটনার ঘটলে তার জন্য দায় নিশ্চয়ই ওই যাত্রীর ওপর বর্তায়।

ঈদ পূর্ববর্তী ২ জুন সড়ক দুর্ঘটনায় সারাদেশে ২২ জন নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ৩ জুন ১০ জন, ৪ জুন ৮ জন, ৫ জুন তথা ঈদের দিনেও ১৫ জনের নিহতের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম থেকে ৩১ মে পর্যন্ত (পাঁচ মাস) জাতীয় মহাসড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসহ সারাদেশে ১ হাজার ৭৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৯০ জন নিহত ও ৩ হাজার ৫৪৩ জন আহত হয়েছেন। বেসরকারি একটি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের এ তথ্য তুলে ধরা হয়। আর ঈদের পরে নিহত হয়েছে প্রায় ১০০ জন। আহত হয়েছে শত শত।

এই জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যে ১০টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো-

১. চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ২. দৈনিক চুক্তিতে চালক, কন্ডাক্টর বা হেল্পারের কাছে গাড়ি ভাড়া দেয়া, ৩. অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ ৪. সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতা, ৫. বিধি লঙ্ঘন করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং, ৬. দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো, ৭. ত্রম্নটিপূর্ণ গাড়ি চলালচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, ৮. জনবহুল এলাকাসহ দূরপালস্নার সড়কে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, ৯. সড়কে-মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি এবং ১০. স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। এই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেই সহজেই অনুমেয় যে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মূলত কারা। যে গাড়ি সড়কে কিংবা মহাসড়কে যাত্রী বহনের কোনো অনুমতি নেই সেই গাড়িগুলো দেদারছে চলছে খোদ ট্রাফিক পুলিশের সামনেই। গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারায় সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলছে। পণ্যবাহী যানেও যাত্রী বহন করা হয় পুলিশের সঙ্গে ম্যানেজ করে। আইন বিধি তোয়াক্কা না করেই যে যার মতো করে গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। আর এর পরিণামে মুতু্যর মধ্যে অকালেই ঝরে পড়তে হয় এ দেশের খেটে খাওয়া জন সাধারণের।

আমরা যতই গাড়ির ড্রাইভার, হেলপার কিংবা গাড়ির মালিক পক্ষকে যতই দোষারোপ করি না কেন, দুর্ঘটনার জন্য আমরা তথা যাত্রীরাই দায়ী। আমাদের আরো সচেতনতার বিকল্প নেই। একদিন পরে গেলেও উৎসবে যদি শামিল হতে পারি তাহলে হুড়াহুড়ি করে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে জীবনটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কোনো অর্থ হয় না। ঈদে বাড়ি ফিরতে গিয়ে যারা প্রাণ হারালেন, যারা আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন তাদের কথা ভাবার চেষ্টা করি। তাদের কথা ভেবেও আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। আমাদের জীবনের মূল্যটা অন্তত দিতে হবে। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি’ এ স্স্নোগান গাড়ির ভেতর লেখা দেখা যায়। এ স্নোগানের মর্মার্থ যতদিন আমরা অনুধাবন করতে পারব না ততদিন সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।

শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সড়ক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি যাত্রী সাধারণ তথা সবাইকে সচেতন হতে হবে।

Check Also

বাংলাদেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বপ্ন এবং আমাদের করণীয়

মোহাম্মদ আবদুল গফুর  :   শেখ মুজিবকে আমি প্রথম দেখি ১৯৪৮ সালে। আমি তখন ফরিদপুর ময়েজুদ্দিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *