Home / উপ-সম্পাদকীয় / অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আগে উদ্যোগী হতে হবে

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আগে উদ্যোগী হতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ   :      আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনৈতিক শক্তির দেশ। এ সম্ভাবনা স্বপ্ন বা কল্পনা নয়। বিগত কয়েক বছর ধরেই এ সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। অর্থনীতিতে ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে দ্রæত গতিতে এগুচ্ছে এবং উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা বেগবান হয়েছে, এ গতি বজায় থাকলে সম্ভাবনার বাস্তবায়ন হতে বেশি দেরি লাগবে না। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি তাই নির্দেশ করছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন করা। কারণ একদিকে উন্নয়ন হবে, আরেক দিকে দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করে খেয়ে ফেলবে, তা হতে পারে না। বলা যায়, দুর্নীতিই দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইঁদুর হয়ে আছে। ইঁদুর যেমন একটু একটু করে কৃষকের ফসল ধ্বংস করে দেয়, তেমনি দুর্নীতিও উন্নয়নকে ধ্বংস করে অর্থনীতির গতি পেছনে টেনে ধরে। বাস্তবতা এই যে, দুর্নীতিবাজরা জনগণের অর্থ বিনা পরিশ্রমে নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলছে, নয়তো পাচার করে দিচ্ছে। এই যে কৃষক মাঠের পর মাঠ ধান ফলিয়ে বাম্পার উৎপাদন করছে, ধানের শীষের ডগায় ডগায় তাদের মমতা আর শ্রম ও ঘাম লেপটে রয়েছে, তাদের এই উদ্যম, উদ্যোগ এবং শ্রমে গড়ে ওঠা সম্পদই কিছু লুটেরা বিনাশ্রমে লুটে নিচ্ছে। আর শ্রমজীবী, কর্মজীবী, উদ্যমী, উদ্যোগী মানুষগুলোর উদ্যোগ হতাশায় পরিণত হচ্ছে।
দুই.
দেশের ছোট-বড় অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতে যেসব মানুষ জড়িয়ে আছে, তাদের উদ্যম ও স্পৃহা অনন্য উচ্চতার দিকে ধাবিত। যে যেভাবে পারছে তাদের উদ্যম কাজে লাগাচ্ছে। বেশ কয়েক বছর আগে জাতিসংঘের ইউএনএফপি’র জনসংখ্যা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন অন্যের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। প্রতি তিনজনে মানুষের দুজনই উপার্জন করে। এই অবস্থা আরও ৩০ বছর চলবে। বাংলাদেশের জন্য এ এক অসাধারণ অগ্রগতি। বাংলাদেশ সম্ভাবনা থেকে সমৃদ্ধির পথে দ্রæত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ গতি যদি অব্যাহত থাকে তবে ইউএনএফপি ৩০ বছরের যে ভবিষ্যতদ্বাণী করেছে, তা এক দশকেই পূরণ করা সম্ভব। প্রতি তিনজনের মধ্যে তিনজনই উপার্জনক্ষম বা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে। এ সম্ভাবনার পথ মসৃন করে দিতে পারে সরকারের যথাযথ কর্মপরিকল্পনা, সুশাসন এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ। দুঃখের বিষয়, দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে সুষ্ঠু রাজনীতি মূল নিয়ামকশক্তি হওয়ার কথা, তা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণ শ্রেণীকে নিজেকে উপার্জনক্ষম হতে হবে। বাবা-মায়ের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। বিয়ে-সাদীর খরচ আর বাবা-মায়ের উপর চাপিয়ে না দিয়ে নিজেদের খরচে বিয়ে করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ইউএনএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা এখন ১৫ কোটি ৮৫ লাখের উপর। এর শতকরা ৩০ ভাগই তরুণ। অর্থাৎ ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৬ লাখ। তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করবে এবং নেতৃত্ব দেবে। এদের শিক্ষা ও সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে। মানব কল্যাণ ও জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে। জাতিসংঘসহ বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিভিন্ন সূচক নিয়ে প্রায় নিয়মিতই আশাবাদ প্রকাশ করে চলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের নীতিনির্ধারকরা এই সূচকের তাৎপর্য কতটা উপলব্ধি ও ধারণ করতে পারছেন এবং তদানুযায়ী কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছেন? বলা বাহুল্য, ক্ষমতালোভী এবং ক্ষমতাভোগী-এই শ্রেণী দেশের সম্ভাবনার গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এর ফলে তরুণ শ্রেণীর মধ্যে বিভিন্ন উপায়ে হতাশার প্রকাশ ঘটছে। শিক্ষিত তরুণ শ্রেণী তাদের হতাশার কথা ব্যক্ত করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দেশের উন্নয়ন ও সম্ভাবনার বিষয়টি পুরোপুরি উপলব্ধি না করে নীতিনির্ধারকদের অনেকে আখের গোছানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় অনেক মেধাবী তরুণ হতাশ হয়ে দেশ ছাড়ছে। তারা বুঝতে পারছে, সম্ভাবনা যতই থাকুক নীতিনির্ধারকরা যদি তা উপলব্ধি করে সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে কাজে লাগাতে উদ্যোগী না হন, তবে খুব বেশি দূর এগুনো যাবে না। যারা দেশ ছাড়ছে না, তারা অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও স্ব স্ব অবস্থান থেকে উদ্যোগী হয়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এসব মানুষের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবী, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক থেকে শুরু করে গৃহকর্মী, বাবুর্চি, দর্জি, ইলেকট্রিশিয়ান, ম্যাকানিক, গার্ড, মালি, মুচি পর্যন্ত অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। কমিউনিটি সোস্যাল অ্যান্ড পার্সনাল সার্ভিসেস প্রভাইডার্স (সিএসপিএস) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখানো হয়েছে, এসব পেশায় নিয়োজিতরা দেশের জিডিপি’র ১০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের এই যে অসামান্য অবদান তা এতদিন অন্তরালেই ছিল। কেউ ভাবেইনি এসব মানুষ নীরবে-নিভৃতে দেশের অর্থনীতিতে কত বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। এসব মানুষের কর্মকাÐের ক্ষেত্রে সরকার বা রাজনীতির অবদান কতটুকু, তা বোধকরি বুঝিয়ে বলার অবকাশ নেই। বরং অপরাজনীতির সংস্কৃতি তাদের কর্মকাÐে বিঘœ ঘটাচ্ছে, দুর্ভোগ প্রলম্বিত করছে। তাদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করছে, অনেককে বেকারে পরিণত করছে। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে দেশের তরুণদের যে অসীম প্রচেষ্টা এবং জীবনবাজি রেখে যে তারা স্বাবলম্বী হতে চায়, তার বড় উদাহরণ হচ্ছে, অবৈধপথে বিদেশে পাড়ি জামানো। পাড়ি জমাতে গিয়ে তারা ধরা পড়ছে। তবুও তাদের যাওয়া থামানো যাচ্ছে না। তাদের এই পাড়ি জমানোকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু কেন তারা এ অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন? বেছে নিচ্ছেন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য। তরুণদের এই অদম্য স্পৃহাকে কাজে লাগাতে সরকার কি আরও ব্যাপক উদ্যোগ নিতে পারে না? বৈধভাবে বিদেশ যাত্রার পথটি সুগম করতে পারে না?
তিন.
বাংলাদেশের মূল সম্পদই হচ্ছে মানুষ। এমন সম্পদ খুব কম দেশেই রয়েছে। বলাবাহুল্য, মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ছাড়া কোনো দেশের কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে মানবসম্পদের এই অভাব তীব্র হওয়ায় তারা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে মানুষ আমদানি করে থাকে। বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এক নির্বাহী আদেশে অভিবাসন নীতি পুনর্বিন্যাস করে ৫০ লাখ অভিবাসীকে নাগরিকত্ব দিয়েছিলেন। এর মূল উদ্দেশ, বিপুল সংখ্যক মানবসম্পদকে কাজে লাগানো। কারণ এসব অভিবাসী একটি ঘন্টাও নষ্ট না করে কাজ করে চলেছে। স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ায় এসব অভিবাসী এখন মুক্ত পরিবেশে নিঃসংকোচে তাদের শ্রম দিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই গতিশীল করছে না, নিজেদের দেশের অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশী রয়েছে। ওবামার অভিবাসন নীতি পুনর্বিন্যাসের আওতায় তাদের অনেকেই সুবিধা পেয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের প্রতি যেমন যতœশীল, তেমনি তাদের মানবসম্পদ ব্যবহারের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে। এর বিপরীতে আমাদের মানবসম্পদের অভাব নেই। এই বিশাল মানবসম্পদ কাজে লাগানোর জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন, তা আমাদের সরকারগুলো কখনোই নিতে পারেনি। বিপুল মানুষকে বোঝা হিসেবে মনে করার প্রবণতা তাদের মধ্যে রয়েছে। অথচ সুযোগ পেলে আমাদের দেশের মানুষ কী করতে পারে, তার উদাহরণ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ৮০-৯০ লাখ বাংলাদেশী পরিশ্রম করে দেখিয়ে দিচ্ছে। তারা একটি ঘন্টাও অপচয় না করে, কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দেশে প্রেরণ করছে। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি শিল্প তৈরি পোশাকের চেয়েও বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত থেকে বছরে আয়ের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। তবে কাঁচামাল, সুতা, রং ইত্যাদি আমদানি করতে গিয়ে এই আয়ের প্রায় ৪০ ভাগ খরচ হয়ে যায়। ফলে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে প্রকৃত আয় হয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রবাসী রেমিটেন্স খাতটি এখন নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন। প্রবাসে শ্রমিক পাঠানোর সবচেয়ে বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্য। সেখানের ৫০-৬০ লাখ শ্রমিক রয়েছে। সেখানে তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেকে অবৈধ হওয়ায় শূন্য হাতে দেশে ফিরছে। অর্থাৎ যে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কদর সবচেয়ে বেশি, সেখানের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যন্সের রিজার্ভ বৃদ্ধি নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারকরা যে কৃতিত্ব দাবী করেন, তার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মানবসম্পদের অসীম সম্ভাবনার খাতটি কেন ক্রমেই দুর্দশার মধ্যে পতিত হচ্ছে, এদিকে তারা তেমন একটা নজর দিচ্ছেন না। প্রাবাসী শ্রমিক ও কর্মজীবীরা যেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্রেরই দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী উল্টো কাজ করছে। তারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিগত দশ বছরে দেশ থেকে এক লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের বিপুল অংকের অর্থ জমা রয়েছে। এ নিয়ে উন্নত দেশগুলোর কোন কোন কূটনীতিককে মজা করে বলতে শোনা যায়, ‘পুওর কান্ট্রি রিচ পিপল’। তারা এ কথার পেছনে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের কিছু মানুষের অমার্জনীয় দুর্নীতির বিষয়টিকে তুলে ধরেন। আবার যারা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখেন তারা বাংলাদেশের মানবসম্পদকে ইতিবাচক মূল্যায়ন করে বলেন, ‘পুওর কান্ট্রি বাট রিচ ইন পিপল’। অর্থাৎ সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে যদি এই মানবসম্পদকে কাজে লাগানো যায়, তবে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। বলাবাহুল্য, আমাদের দেশে এ দুটোর সংকট রয়েছে। এখানে রাজনীতি ও ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত উন্নয়ন। রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই লক্ষ্য সাধারণ মানুষের অজানা নয়। জানে এবং বোঝে বলেই চলামন অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির মাঝেও তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে অনবরত উদ্যোগ ও শ্রম দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যে একটি সম্ভাবনার দেশ তা নতুন কিছু নয় এবং কোন কালেই সম্পদ ও সমৃদ্ধির কমতি ছিল না। এ কারণেই শত শত বছর ধরে বিভিন্ন শাসনামলে বাংলাদেশ যে পরিমাণ লুটতরাজের শিকার হয়েছে, বিশ্বের আর কোন দেশ এত লুটতরাজের শিকার হয়নি। সম্পদ আছে বলেই লুটের শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে। তা নাহলে সুইস ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা জমে কি করে! লাখ কোটি অর্থ পাচার হয় কীভাবে! যদি এই লুটের শিকার না হতো তবে বাংলাদেশের অবস্থান আজ কোথায় থাকত, তা কেবল কল্পনারই বিষয়। আজ যে সম্ভাবনা শব্দটি উচ্চারণ করা হচ্ছে, তা কি বাহুল্য মনে হতো না? দুঃখের বিষয়, যে লুটতরাজ এবং শোষণের করালগ্রাস থেকে এদেশের মানুষ বারবার যুদ্ধ করেছে এবং জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করছে লুটের শিকার থেকে আজও মুক্ত হতে পারেনি। লুটেরা অপসংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি। যারা রাজনীতি করেন তাদের উপলব্ধির ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের সুযোগে দুর্বৃত্ত শ্রেণী দ্বারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ এবং লুটের অপসংস্কৃতি চালিয়ে যাচ্ছে।
চার.
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশের যেকোনো সমস্যা সমাধানে রাজনীতিবিদদেরই এগিয়ে আসতে হয়। তারাই ক্ষমতায় কিংবা বিরোধী দলে থাকেন। দেশের কল্যাণ-অকল্যাণের চিন্তা তাদেরই করতে হয়। দেশের সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সম্ভাবনা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবেÑএ বিষয়টি যদি নীতিনির্ধাকরা মনেপ্রাণে উপলব্ধি ও ধারণ করতে পারেন, তবে এমনিতেই রাজনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটবে এবং তা গণমুখী হয়ে উঠবে। সম্ভাবনার যত বাধা তা দূর হয়ে যাবে। এজন্য বাংলাদেশের যেসব সম্ভাবনার সূচক সাম্প্রতিক সময়ে চি‎িহ্নত ও উল্লেখ করা হয়েছে এবং হচ্ছে, এ সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী রাখতে সরকারকে পরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। যে ৪ কোটি ৭৬ লাখ বা তার বেশি তরুণের উপর দেশের ভবিষ্যত ও নেতৃত্ব নির্ভর করছে, তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। তাদের দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনকে অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হবে। শিক্ষা যাতে তাদের উদ্ভাবনী ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি এবং তা কার্যকর করে তুলতে পারে, এ বিষয়ে জোর দিতে হবে। এ কাজটি করতে পারলে এ তরুণরাই বাংলাদেশের সকল সম্ভাবনার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে এবং তা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করতে সক্ষম হবে। তারা যাতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণের শিকার না হয়, এ ব্যাপারে রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব নিতে হবে। দেশের সম্ভাবনা যাতে কোন রাজনৈতিক দলের একক সম্ভাবনায় পরিণত না হয় বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক চেতনায় পরিণত হয়, এজন্য সকলকেই ঐক্যমত পোষণ করতে হবে। দেশ ও জনগণের উন্নয়নই হতে হবে রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। কেবল সম্ভাবনার কথা বলে আত্মতৃপ্তিতে ভুগলে চলবে না, সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে।

Check Also

মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতি

মোঃ আখতারুজ্জামান: হঠাৎ করেই গুলির শব্দে ফুটবল খেলা ছেড়ে দিয়ে পালানো, কেমন একটা থমথমে যেন ভাব। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *