Monday , December 17 2018
Home / উপ-সম্পাদকীয় / নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন (দুই)

নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন (দুই)

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক   :     যেহেতু মাস খানেকের মধ্যেই পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা, সেহেতু নির্বাচন নিয়ে আলাপ-আলোচনা পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি যেই পয়েন্ট-টি হাইলাইট করতে চাচ্ছি বা উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরতে চাচ্ছি সেটা হলো এই যে, পার্লামেন্ট নির্বাচন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটির ভালোমন্দ দিক নিয়ে সময় হাতে নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করা ভালো। যতটুকু সময় আছে ততটুকুকেও কাজে লাগানো উচিত। আজকের আলোচনা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা প্রসঙ্গেই মাত্র। এবং এর সঙ্গে আলোচনা করতে চাই, নির্বাচনকালে মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনীর দায়িত্ব বা কর্ম নিয়ে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার্য দিন :
বর্তমানে বাংলাদেশে পার্লামেন্টারী নির্বাচন একদিনে অনুষ্ঠিত হয়। একদিনে অনুষ্ঠান করার পরিবর্তে একাধিক দিনে অনুষ্ঠান করা যায় কিনা, বা একাধিক দিনে অনুষ্ঠান করা উচিত কিন্তু সেটিও একটি সময়োপযোগী আলোচনার বিষয়। কিন্তু সেটা আজকের এই কলামে নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে পার্লামেন্টারী নির্বাচনে পোলিং স্টেশন তথা পোলিং সেন্টারের সংখ্যা ছাব্বিশ হাজারের বেশি। সাধারণত প্রাইমারি স্কুল বা হাই স্কুল বা কোনো মাদ্রাসা ইত্যাদিতে পোলিং সেন্টার বা ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। কারণ, এই জায়গাগুলোতে আসা-যাওয়া সহজ, মানুষ চেনে এবং যথেষ্ট কামরা থাকায় বিভিন্ন বুথ পরিচালনা করা যায়। প্রত্যেক পোলিং সেন্টারে নির্বাচনী কেন্দ্রে দুই-তিনজন অস্ত্রধারী পুলিশ, দুই-তিনজন অস্ত্রধারী আনসার এবং অনধিক বারোজন বিনা অস্ত্রধারী আনসার থাকে; বেশিরভাগ পুরুষ কিছু, সংখ্যক মহিলা আনসার। তারা আসে নির্বাচনের দুইদিন বা তিনদিন আগে। তাদেরকে এমবডিমেন্ট করা হয় এবং নির্বাচনের ১দিন বা ২দিন পরই তাদেরকে ডিএমবিডমেন্ট করা হয়।
সেনাবাহিনী ও বিজিবি :
সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে ২০১৪ সালেল অভিজ্ঞতা বাদ দিচ্ছি। ১৯৭৩ সালের মার্চের নির্বাচন থেকে ২০০৮ এর ডিসেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত, সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে যেই রেওয়াজ ছিল সেটি এখানে আলোচনা করছি। দেশব্যাপী বা দেশের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন মেয়াদের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়, আবার দেশব্যাপী একই মেয়াদের জন্যও মোতায়েন করা যায়। দেশের কোনো কোনো অংশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় পাঁচ বা সাত বা নয় বা দশ বা বারো বা পনেরো এইরূপ মেয়াদের জন্য থেকে নয় দিনের জন্য। এই ছবিটি দেশের শতকরা ৭০ ভাগ নির্বাচনী কেন্দ্রের জন্য প্রযোজ্য। সেনাবাহিনীর কাজ প্রসঙ্গে এই কলামে একটু পরেই আলোচনা আছে। বাকি আনুমানিক ৩০ ভাগ নির্বাচনী কেন্দ্রকে আমরা বলতে পারি ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়নপূর্বক কয়েকজন বেশি পুলিশ বা আনসার মোতায়েন করে। নির্বাচনী কেন্দ্রে সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ডিউটি করে না। মহানগরীগুলোতে বিডিআর নির্বাচনী কেন্দ্রে প্রত্যক্ষ ডিউটি করলেও অন্যত্র প্রত্যক্ষ ডিউটি করে না। দেশের প্রতিটি থানায় বা উপজেলায় আলাদাভাবে সেনাবাহিনী বা বিজিবি (সাবেক বিডিআর) মোতায়েন করা হয়।
থানার সংখ্যা ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের বিবরণ :
থানা শব্দের পরিবর্তে উপজেলা শব্দটিও পড়া যায়। বাংলাদেশের মানচিত্র ঘাটলে আপনারা দেখবেন, ১২০টি থানা বা উপজেলা আছে যেইগুলো সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত তথা তাদের সঙ্গেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এছাড়াও সমুদ্রবেষ্টিত বা দ্বীপাঞ্চলীয় থানা আছে ৫-৬টি; যেগুলোতে নির্বাচনকালে নৌবাহিনী পাঠানো হয়। বর্ডারিং থানাগুলোতে সাধারণত সেনাবাহিনী পাঠানো হয় না, বরং বিজিবি পাঠানো হয়। বিজিবি পাঠানো বললে ভুল হবে, বিজিবি, সীমান্ত এলাকায় সারা বছরই ডিউটি করছে। সুতরাং বিজিবি পাঠানো মানে ঢাকা বা সংশ্লিষ্ট সেক্টর থেকে অতিরিক্ত কিছু বিজিবি সৈন্য পাঠানো যাতে করে বিওপিগুলো একদম সৈন্যবিহীন না হয় বা বর্ডার পেট্রোলিং একদম বন্ধ হয়ে না যায়। বর্ডারিং থানাগুলোতে সেনাবাহিনী পাঠানো হয় না ইচ্ছাকৃতভাবে যাতে সীমান্তবর্তী এলাকাতে সেনাবাহিনীকে চলাচল করতে না হয়। দেশের অন্যান্য সকল থানায় সেনাবাহিনী পাঠানো হয়। কোনো জায়গায় ৩০জন, কোনো জায়গায় ৪০জন ও কোনো জায়গায় ৫০জন এরকমভাবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল ইত্যাদি নগর বা মহানগরে সেনাবাহিনী বা বিজিবি উভয়ই মোতায়েন করা হয়। বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি এই সকল বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পড়ে। দেশে আইন শৃংখলা রক্ষা তথা স্বাভাবিক সকল কর্মকাÐের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপর। বেসামরিক প্রশাসন তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করার জন্য দেশের বিদ্যমান আইনের অধীনেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
সেনা মোতায়েন দর্শন বা তত্ত¡:
পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত, প্রচলিত বা অনুসরণ করা যে থিওরী বা তত্তে¡র ভিত্তিতে সেনাবাহিনী নির্বাচনকালে দায়িত্ব পালন করে আসছে সেটি হলো, ‘বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় কর্তব্য পালন’ তথা ইংরেজি পরিভাষায় ‘ডিউটিজ ইন এইড অফ সিভিল পাওয়ার।’ মূল লক্ষ্য দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে পরোক্ষ যথা: শো অফ ফোর্স বা শক্তি প্রদর্শন-এর দ্বারা অশান্তিসৃষ্টিকারী মানুষের মনে বা বিশেষত: সন্ত্রাসীগণের মনে ‘ডিটারেন্স’ বা গÐগোল না করার মানসিকতা সৃষ্টি করা; অপরপক্ষে শান্তিপ্রিয় জনগণের মনে আস্থার সৃষ্টি করা। অপরটি হচ্ছে প্রত্যক্ষ যথা: নিরপেক্ষ মনোভাব নিয়ে দুষ্কৃতিকারী দমন বা দুষ্কৃতকারী অধ্যুষিত এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার বা অপরাধী গ্রেফতার ইত্যাদি। সেনবাহিনীর সেনাদল কোনো থানা বা উপজেলায় মোতায়েন হওয়ার পর বেশিরভাগ সময় যানবাহনে করে এবং কোনো কোনো সময় পায়ে হেঁটে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। এটিই তাদের অন্যতম কাজ। যদি নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন কোনো ম্যাজিস্ট্রেট আনুষ্ঠানিকভাবে বলে যে, কোনো এক জায়গায় গÐগোল হচ্ছে যেটি দমন করার জন্য সেনাবাহিনী প্রয়োজন তাহলেই মাত্র ঐ সেনাদল কাজে লাগে, তা না হলে ঐ শো অফ ফোর্সেই তাদের কার্যকলাপ সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের অনেক থানায় বা উপজেলায়, এখন ২০১৮ সালে এসেও যোগাযোগের ব্যবস্থা এমন যে, ঐগুলোর অভ্যন্তরে চলাচলের বিশেষ কোনো উন্নত ব্যবস্থা নেই। চলাচলের জন্য অতিরিক্ত কোনো যানবাহনও নেই; ঐসকল দুর্গম জায়গায় চান্দের গাড়ি বা ভ্যান গাড়ি বা গরুর গাড়ি বা নসিমন-ভটভটি বা ট্রাক্টর ছাড়া অন্য কোনো বাহন নেই। আরও কিছু থানা আছে যেগুলো এতটাই নদীমাতৃক যে, সেখানে কোনো সড়কই নেই এবং চলাচলের একমাত্র উপযুক্ত বাহন স্পিড বোট, শ্যালো ইঞ্জিন চালিত দেশি নৌকা বা লঞ্চ ইত্যাদি। যানবাহনের অপ্রতুলতার কারণে, যানবাহন চলাচলের সড়কের অভাবের কারণে এবং সৈন্য সংখ্যার স্বল্পতার কারণে একটি থানায় মোতায়েন করা সেনা দল বা বিজিবি দলের পক্ষে সবময়ই একটি স্থানে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়, কোনো কোনো সময় দুইটি স্থানে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় এবং কদাচিৎ তিনটি বা তার অধিক স্থানে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়। কতজন সৈনিক একটি থানায় বা উপজেলায় সাধারণত মোতায়েন হয় এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় যে, নিম্নে ২৫ থেকে ঊর্ধ্বে ৮০জন পর্যন্ত যেতে পারে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য হচ্ছে, বিদ্যমান আইনে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যতিত সেনাদল কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। অতএব ম্যাজিস্ট্রেটে অপ্রতুলতা সেনাবাহিনীর কার্যক্ষমতা বিকাশে একটি সীমাবদ্ধতা। বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও বা শান্তিশৃংখলা ভঙ্গ হলেও তথা, মারামারি-কাটাকাটি-গÐগোল ইত্যাদি লাগলেও যদি ম্যাজিস্ট্রেট সেনাবাহিনীকে না ডাকেন, তাহলে সেনাবাহিনী কোনো কাজের জন্য এগিয়ে আসবে না। এটাই এই মুহূর্ত পর্যন্ত প্রচলিত রেওয়াজ। কিন্তু সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেটগণ যে সকল পরিস্থিতি নির্মোহ দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেবেন এর গ্যারান্টি কে দেবে? অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ একটি কেন্দ্রের নাম মঙ্গলগ্রহ। মঙ্গলগ্রহ কেন্দ্রের আধাকিলোমিটার দূরে পরিকল্পিত গÐগোল লাগানো হলো, পরিকল্পিতভাবে বোমাবাজী করা হল, পরিকল্পিতভাবে নিরিহ মানুষকে পিটানো হলো, ভোট কেন্দ্রের লাইনের মধ্য থেকে প্রতিপক্ষের মানুষকে উঠিয়ে নেওয়া হলো, হৈ হৈ রৈ রৈ আওয়াজ উঠলো, কিন্তু পুলিশ কিছু করলো না। তখন সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেট কী করবেন? অথবা মারামারি কাটাকাটি মোটামুটি হয়ে যাওয়ার নিপীড়িত-নির্যাতিত দুর্বল পক্ষ স্থান ত্যাগ করার পর, আর্মিকে খবর দেওয়া হলো; আর্মি কী করবে? অতএব, আমার আবেদন হচ্ছে যে, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ফাঁক-ফোঁকর রাখা যাবে না। যেহেতু গত দশ বছরের রাজনৈতিক অপশাসনের কারণে মানুষ মনে করে পুলিশ বাহিনীতে রাজনীতিকরণ হয়েছে, তাহলে ওই পুলিশের উপর আস্থা না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচনের এক মাস আগে, নতুন কোনো পুলিশ বাহিনী তো আমাদের জন্য পয়দা হবে না; বিদ্যমান বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর আওতাতেই আমাদেরকে কাজ করতে হবে, চলতে ফিরতে হবে। বাস্তবে বেশিরভাগ পুলিশ নির্মোহ দৃষ্টিতে কাজ করে বা করবে বলে মানুষের আশা। অল্প কিছু সংখ্যক পুলিশের মধ্যেই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। এইরূপ ভঙ্গুর ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে, মানুষের একমাত্র আস্থার স্থান হচ্ছে সেনাবহিনী।
শো অফ ফোর্স তত্ব এবং বর্তমান মানসিকতা :
উপরে বর্ণিত ‘শো অফ ফোর্স’ বা ডিটারেন্স তত্ত¡টি এখন কতটা বাস্তবসম্মত সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ। আমার মূল্যায়নে, সেনাবাহিনীকে শুধু দেখেই ভয় পাওয়ার দিন চলে গেছে। কোনো উপজেলায় বা থানায় সেনাদল স্বশরীরে কোন্ জায়গায় অবস্থান করছে, ঐ সেনাদলের কাছে কী যানবাহন আছে, থানা বা উপজেলার অভ্যন্তরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে ঐ সেনাদলের তা তাদের একটি অংশের কত সময় লাগবে ইত্যাদি কোনো গোপন জিনিস নয়। এ সকল তথ্য বা মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে, একটি সেনাদল কোনো একটি থানায় মোতায়েনরত অবস্থায় কী কী কাজ করতে পারবে বা কী কী করতে পারবে না, সেটি বুদ্ধিমান জনগণ বিশেষত রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা অতি সহজেই হিসাব-নিকাশ করে ফেলতে পারে। সম্মানিত পাঠক, খেয়াল করুন আমি যেই শব্দযুগল ব্যবহার করেছি সেটি হলো রাজনৈতিক সন্ত্রাসী। এইজন্যই বললাম যে, ‘শো অব ফোর্স’ তত্তে¡র কার্যকারিতা এখন অতি সীমিত। বিশেষত, একদিন-দুইদিন একটি এলাকাতে ঘুরে আসলেই, রাজনৈতিক সন্ত্রাসীগণ ঐ এলাকা ছেড়ে পালাবে, এমন নাও হতে পারে। তাহলে কী করণীয়? সেনাবাহিনীকে এমন একটি সময় হাতে রেখে মোতায়েন করতে হবে, যেন সেনাবাহিনীর দল যাদেরকে সেনাবাহিনীর পরিভাষায়, সেকশন বা প্লাটুন বা কোম্পানী বলে, ঐরূপ দলগুলো যেন তাদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নিবিড়ভাবে চেনে এবং ঐ এলাকার আইনশৃংখলা পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি নিবিড় জ্ঞান অর্জন করে। সেজন্যই ‘বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় সেনা মোতায়েনের বিধি তথা ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ আংশিকভাবে বদল করার সময় এসেছে; তথা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।
জাতির খেদমতে সেনাবাহিনী :
এই কলামেরই উপরের অংশে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দর্শন বা তত্ত¡ আলোচনা করেছি। সেটি হলো স্বাভাবিক অবস্থায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সরকারের হুকুমে, বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনকে বিভিন্ন নিয়মে সহায়তা করে; বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক দায়িত্ব পালন করে। এখন থেকে নয়-দশ বছর আগে, মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে একটি ভালো কাজ হয়েছিল। কাজটি করেছিল তৎকালীন নির্বাচন কমিশন। কাজটি ছিল ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়ন করে জনগণের হাতে পৌছিয়ে দেওয়া। দেড় বছরের কম সময়ের মধ্যে সমগ্র ভোটারের হাতে একটি করে কার্ড পৌছানোর বিরাট দায়িত্বটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল সেনাবাহিনীর সদস্যগণের সম্পৃক্ততার কারণে। ভুলত্রুটি ছিল; কিন্তু কাজটি ছিল দারুন। যখনই ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা হয়, জনগণের খেদমতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। দুর্গম এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পুরো সেনাবাহিনীকে না জড়ালেও, সেনাবাহিনীর বিশেষ বিশেষ অংশকে জড়ানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহ দমন, শান্তি আনয়ন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন, জনগণকে অব্যাহত নিরাপত্তা প্রদান, সকল উন্নয়ন কর্মকাÐের নিরাপত্তা প্রদান ইত্যাদি কাজ সেনাবাহিনী করেই যাচ্ছে। পাঁচ-সাত বছর আগে সাভারের রানা প্লাজায় যে মারাত্মক দুর্ঘটনা হয়েছিল, সেই সময় সেনাবাহিনীর স্থানীয় অংশ উদ্ধার তৎপরতায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। জড়িত থাকবে না কেন? বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া। জন্মলগ্নেই স্বাধীনতার জ্বলন্ত শিখা তাদের চেতনায়-কল্পনায়-মানসপটে ভাস্বর হয়েছিল এবং আজ অবধি ভাস্বর আছে। জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলার প্রথম দীক্ষা, প্রথম অনুশীলন ছিল ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেটি ছিল গণযুদ্ধ, সেটি ছিল জনযুদ্ধ, সেটি ছিল রণাঙ্গণের যুদ্ধ। জনগণকে সাথে নিয়ে জনগণের জন্যই খেদমত তথা দেশসেবার অভিজ্ঞতা ১৯৭১ সাল থেকেই উজ্জ্বল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক-সদস্যগণ গ্রাম বাংলার ছেলেমেয়ে। বাংলাদেশের শিক্ষিত ১৮-২০-২২ বছরের তরুণগণের মধ্য থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসারগণের উৎপত্তি। অতএব, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের খেদমতের জন্য উদগ্রীব থাকবে, এটিই স্বাভাবিক।
খেদমতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেনাবাহিনী কর্তৃক জনগণের খেদমতে নিবেদিত কর্ম অনেক প্রকারের। দু’একটি উদাহরণ উপরের অনুচ্ছেদে দিয়েছি। সবচেয়ে বড় উদাহরণটি হচ্ছে, শান্তিকালীন সময়ে জাতীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের খেদমতে সর্বদাই নিয়োজিত ও নিবেদিত হয়েছে।
সেনা মোতায়েন: অতীত ও বর্তমানের সম্পর্ক
সেনা মোতায়েনের পদ্ধতি নিয়ে বা সেনা মোতায়েনের ব্যাপকতা নিয়ে বা সেনা মোতায়েনের নিবিড়তা নিয়ে এখন আলোচনা করছি। ঐটুক লিখেই আজকের কলামটি শেষ করবো। তথ্য প্রযুক্তির যুগে, ডিজিটাল যুগে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, অতীতের সবকিছুই হুবহু প্রয়োগ করা যাবে না, এটি যেমন সত্য, সাথে সাথে এটিও সত্য যে, যে কোনো চিকিৎসা বা যে কোনো ব্যবহারের বা যে কোনো আচরণের বা যে কোনো মূল্যায়নের মৌলিক নীতি বা মূলনীতি অতীতে যা থাকে, বর্তমানেও সেটির অনেকটাই বহাল থাকবে বা প্রাসঙ্গিক থাকবে। অর্থাৎ মৌলিক নীতি বা মূলনীতি হঠাৎ করেই পরিবর্তন হয় না। এই প্রেক্ষাপটেই আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমার পক্ষ থেকে নির্মোহ মূল্যায়নে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, অন্যতম শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসনীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন ছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের আমলে, ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে, জেনারেল স্টাফ ব্রাঞ্চের অধীনস্থ, মিলিটারী অপারেশন্স ডাইরেক্টরেইটের পুরানো ফাইলপত্র ঘেঁটে ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে অথবা ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে প্রকাশ করা বা ইস্যু করা নির্বাচন সংক্রান্ত পলিসি লেটার ঘাঁটলে, এটি বোঝা যাবে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কতটুকু আন্তরিকভাবে ওই নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করার জন্য অগ্রগামী ছিল। ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ জানুয়ারি ১৯৯১ বা ফেব্রুয়ারি ১৯৯১-এর কোনো সময় তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ন-সচিব আব্দুল হামিদ চৌধুরীর তত্ত¡াবধানে, বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশ করা বা জারি করা নির্বাচন সংক্রান্ত পরিপত্র আবিষ্কার করে যদি ঘাঁটা যায়, তাহলেও পাঠকগণের নিকট এটা অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রচুর আন্তরিকতার সঙ্গে পরিকল্পনা করেছিল এবং তাগাদা দিয়েছিল।
সকল কর্মের লক্ষ্যবস্তু: জনগণকে সুযোগ প্রদান :
এই কলামের পাঠক বা চিন্তাশীল সকল সচেতন নাগরিকের নিকট আমার আবেদন থেকেই যাবে যে, তাঁরা যেন একটি কথা বিবেচনা করেন। কথাটি হলো এই: কোন রাজনৈতিক দল জিতবে বা কোন রাজনৈতিক দল হারবে সেটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় নয়; বিবেচ্য বিষয় হলো সকল যোগ্য ভোটার যেন অবাধে নিজের ভোট নিজে দিতে পারে এবং সেই ভোটের ফলাফল যেন প্রভাবান্বিত না হয় বা ভোট গণনায় বা ফলাফল প্রকাশে যেন কারচুপি না হয়।
লক্ষ্যবস্তু অর্জনে করণীয় : আমাদের অবজেক্টিভ বা লক্ষ্যবস্তু নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর, আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে এই অবজেক্টিভ বা লক্ষ্যবস্তু অর্জনের নিমিত্তে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি, তার মধ্যে একটি হলো, সরকার যেন নির্বাচন কমিশনের উপর, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর অযাচিতভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি তার মধ্যে আর একটি হলো, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা। সেনাবাহিনী মোতায়েনের উদ্দেশ্য, অশান্তি সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদেরকে এলাকা থেকে দূরে রাখা, হোন্ডা বাহিনী, গুÐা বাহিনীকে এলাকা থেকে দূরে রাখা, রাজনৈতিক মাস্তানদেরকে এলাকা থেকে দূরে রাখা, আইন-শৃংখলা পরিবেশের উন্নতি করা এবং এই সকল কর্মকাÐের সম্মিলিত ফলস্বরূপ মানুষের মনে এই আস্থা দেওয়া যে, মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে, ভোট দিতে পারবে এবং ফলাফলে ভেজাল হবে না। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর মোতাবেক, ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখ থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। কিন্তু সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর কোন দায়িত্বটি পালন করবে সেটি সম্বন্ধে যেন স্পষ্ট ঘোষণা থাকে। আমাদের আবেদন, যারাই গÐগোল সৃষ্টি করতে পারে তাদেরকে আগে থেকেই গ্রেফতার করার বন্দোবস্ত লাগবে। গ্রেফতার কে করবে? সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষভাবে? নাকি, সেনাবাহিনী করাবে পুলিশের মাধ্যমে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের উপর নির্ভব্র করে মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনীর উপর জনগণ কতটুকু আস্থাবান হবে বা হবে না।
কিছু সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে নিতে হবে, এখন নয় নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি কীরকম হয়, পুলিশ বাহিনীর আইজি মহোদয় কী বলেন বা কী নির্দেশ দেন, র‌্যাব বাহিনীর মহাপরিচালক কী বলেন বা কী নির্দেশ দেন, জনগণের মধ্য থেকে গুম হয়ে যাওয়া, গ্রেফতার হয়ে যাওয়া, ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ইত্যাদির ফ্রিকোয়েন্সি বা হার কীরকম থাকে, ইত্যাদি সবকিছুর উপরেই নির্ভর করবে সেনা মোতায়েনের ব্যাপ্তি ও নিবিড়তা। ইতিমধ্যে পত্রিকায় লিখেই চলেছি, চৌদ্দ-পনেরো মাস আগেও লিখেছি। অদূর বা নিকট ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা না করে আমার কথাগুলো আমি বলে যাচ্ছি। যে সকল সম্মানিত পাঠক, যে সকল আগ্রহী পাঠক, যে সকল পরিশ্রমী তরুণ কথাগুলোকে সংরক্ষণ করবেন, তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা থাকলেও চূড়ান্ত উপকারিতা পাবেন সংরক্ষণকারী নিজে। কারণ, সবসময় সব কথা বের হয় না। ব্যাখ্যা দিব না শুধু মন্তব্যটিই করলাম: ‘বর্ষাকালে তুফান ছাড়া বৃষ্টি পাওয়া যায়, কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বর অথবা মার্চ-এপ্রিল মাসে বৃষ্টি আসে সিডর আইলা নার্গিস ইত্যাদির সঙ্গে।’

Check Also

এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যুবশক্তির গুরুত্ব

মো. ওসমান গনি  :   টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের নতুন চ্যালেঞ্জ এখন আমাদের সামনে। ইতোমধ্যেই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *