Tuesday , November 20 2018
Home / সাহিত্য / আমি মেয়ে…….

আমি মেয়ে…….

(৬ষ্ঠ পর্ব)
সাদিয়া আক্তার : মা! মা.. কি হলো কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে? আম্মু তোমাকে কিছু বলেছে? হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমাদেরকে ছাড়া থাকতে পারবো না। পারবি, মা। আমরা তোকে এখনই বিয়ে দিতে চাই না। তোকে পড়ালেখা করাতে চাই আর তোকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। আমরা যে কষ্ট করেছি বা পাচ্ছি, চাই না তোকেও একই ব্যথা স্পর্শ করুক। আর তাই তো তোকে .. তাই আমাকে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকতে হবে। মা’রে বাস্তবতা বড়ই কঠিন। জীবনের তো কিছ্ইু দেখিসনি, এ তো শুরু মাত্র। আর মনে রাখবি চলতি পথে জীবনের উত্থান-পতন হবে, বাধা-বিপত্তি আসবে নিজেকে কখনো ভেঙ্গে পড়তে দিবি না। মনকে সব সময় বাস্তবতাকে মেনে নিতে সাহায্য করবি। চলতি পথে কত কিছু যে দেখতে হবে। ললিতা, তুই চিন্তা করিস না। আমরা গিয়ে তোকে দেখে আসবো। আমি তোমাদেরকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তাও চেষ্টা করিস। মা, আমি একটু চুমকিদের বাড়িতে গেলাম। যা, তবে তাড়াতাড়ি চলে আসিস। ঠিক আছে।

আ’রে ললিতা তুই এই সময়ে? কেন আমি আসতে পারি না? কি বলিস, আসবি না কেন, অবশ্যই আসবি তোর জন্য আমার বাড়ির দরজা সবসময় খোলা। তা বল এই সময়ে কেন? চল নদীর ধারে যাই। তোর কি মন খারাপ, ললিতা? না’রে। সত্যি করে বল না, তোর কি হয়েছে? কাশফুল গুলো কি দারুন! তাই না, চুমকি? এখানে বসি রে। বস এটা তো তোর খুব প্রিয় জায়গা। হ’রে। কিন্তু এখন আর থাকবে না। কেন রে? চুমকি, কাল থেকে তোর সাথে হয়তো আর আমার দেখা হবে না। আমরা মনে হয় আর এক সাথে স্কুলে যেতে পারবো না। কেন? আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি। কি বলিস? হুম। কিন্তু কেন? এখানে থাকলে খালুজান আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিবে আর আমি এখন বিয়ে-টিয়ে করবো না। আমি পড়াশোনা করতে চাই, তাই আম্মু আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছে।
ঢাকায় থাকবি কাদের কাছে? আম্মুর বন্ধুর বাড়িতে। ও, তাহলে আমাদের সাথে আর দেখা হবে না? ধুর! পাগলি দেখা হবে না কেন? আমি তো টেস্ট পরীক্ষা দিতে আসবো। অবশ্য এসএসসি পরীক্ষা ঢাকায় হবে। আর তোর মোবাইল নম্বর তো আমার কাছে আছে, কথা বলে নিবো। ঠিক আছে তুই যা ভালো বুঝিস। তোর ক্ষতি হোক, সেটা আমি চাই না। আমি জানি তো। চুমকি, আমার একটা কাজ করে দিবি? কি কাজ? এই চিঠিটা ধীমানকে দিবি। তুই কাল স্কুলে গিয়ে নিজের হাতে দিস। আমি তো কাল ভোরে চলে যাচ্ছি। মানে! তোর সাথে আজই আমার শেষ দেখা? খুব খারাপ তুই। রাগ করছিস কেন? না রাগ করছি না। শোন, ধীমান কি বলে আমাকে বলবি। বেচারা খুব কষ্ট পাবে রে। তুই পাবি না? কি জানি, তবে স্কুলে যাওয়ার সময় তোকে খুব মিস করবো। পাশে না পেলে খুব খারাপ লাগবে। জানিস তো কিছু সম্পর্ক থাকে যা সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। ললিতা, তোর আমাদের জন্য খারাপ লাগবে না? তোরা আমার চোখের আড়াল হবি ঠিকই কিন্তু মনের আড়াল হতে পারবি না। আর তোরা হলি আমার আত্মা, আত্মা ছাড়া জীবন বাঁচে না’রে।
রহিমা, আসি আপা। বলুন? বলছি ললিতা কোথায়? ও তো চুমকিদের বাড়িতে গিয়েছে। মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছে, না’রে? কি করবেন আপা, এখানে থাকলে তো ভাইজান ওকে বিয়ে দিয়ে দিবে। তোর ভাইজান যদি আমার কথা শুনতো। মানুষটা যে কবে বুঝবে। তবে আপা, সৌরভ ভাইয়ের কাছে ললিতা খুব ভালো থাকবে। সৌরভ ভাই তো খুব ভালো মানুষ। রহিমা, জানিস সৌরভ এখনো বিয়ে করেনি, ও নাকি আমার জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারবে না বলে বিয়ে করেনি। তাই! হুম। আপা, আপনি সৌরভ ভাইকে বিয়ে করলেন না কেন? সে অনেক কাহিনী রে। একটু বলেন না? রহিমা, সৌরভ, তানভীর আর আমি এক সাথে পড়তাম। তিনজনে খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। সৌরভ আর আমি কখন যে, দুজন দুজনাকে ভালবেসে ফেলে বুঝতে পারিনি। ভুল একটাই আমরা তানভীরকে জানাইনি। সৌরভ যখন তানভীরকে জানাতে গেল, তখন তানভীর সৌরভকে বললো যে, আমাকে খুব ভালবাসে এবং আমাকে না পেলে তানভীর সুইসাইড করবে। তাই শুনে সৌরভ যেমন খুব কষ্ট পেয়েছিল, তেমনি ভয়ও পেয়েছিল। তারপর থেকে দেখি সৌরভ আমার সাথে কম মিশে এবং কথাও কম বলে।
আমি সৌরভকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন এমন করছো? ও বলেছিলো কি জানিস? আমি তোমাকে কোনদিন ভালবাসিনি। শুধু টাইমপাস করেছি। আমি অন্য একজনকে পাগলের মতো ভালবাসি। আমি বিয়ে করলে তাকেই বিয়ে করবো, তোমাকে না। তাই বলে সেই যে, সৌরভ চলে গেলো ছয়মাসের মধ্যে ওকে আর দেখা পেলাম না। এদিকে তানভীর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং বাড়ির সবাই রাজি হয়ে যায়। জানিস, সৌরভ নাকি বাবা’র কাছে এসে বলে গেছিলো যে, আমি তানভীরকে খুব ভালবাসি এবং তানভীরকে বিয়ে করতে চাই, তাই ওকে বাবা’র কাছে পাঠায়েছি। তারপরে তানভীর আর সৌরভ বাবা’র কাছে এসে বিয়ের কথা বলে আর বাবা রাজি হয়ে যায়। হঠাৎ করেই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লো আর তখনি আমাকে তানভীরের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। আপনার কাছে কিছু শুনলো না? শুধু বলেছিল যে, তানভীরের সাথে তোমার বিয়ে কাল। আমি অনেক কথা বলেছিলাম কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি। সৌরভের সাথে কথা বলার সুযোগই পেলাম না। সৌরভও আমার সাথে কথা বললো না। ভাইজান জানতো যে, সৌরভ ভাই আর আপনার সম্পর্কেও কথা? হুম, তানভীর সব জেনেই এই কাজ করেছে। সৌরভ তানভীরকে খুব ভালবাসতো আর তানভীর সুইসাইড করবে শুনে ভয় পেয়ে গেছিলো। আপনি জানলেন কি করে যে, ভাই সবকিছু জানে? সৌরভ আমাদের বাড়িতে আসে আর আমরা যে দরজা বন্ধ করে গল্প করছিলাম তা আমার ননদ দেখে এবং তানভীর আসলে ওকে বলে দেয়। তখন আমাকে নিয়ে সন্দেহ করে আর সব কথা বলে দেয়।
আপনি কিছু বলেননি? শুধু বলেছিলাম তুমি কেন এমন করলে? একটা কথায় বলে তোমাকে আমি ভালবাসি তাই। ভালবাসে কিন্তু আবার সন্দেহ করলো কেন? ছেলেদের ন্যাচার, ওরা যেমন খুব কাছে টানতে পারে, পারে আবার তেমনিভাবে দূরে ঠেলতে। আপা, আপনি সৌরভ ভাইকে ভালবাসেন? বাসি, খুব ভালবাসি। আবার তেমনিভাবে তানভীরকেও ভালবাসি। এ আবার কেমন কথা, দুজনকেই ভালবাসেন? হুম। সৌরভকে শুধু নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসি আর তানভীরকে স্বার্থপরের মতো ভালবাসি। এখন তানভীরকে ভাল না বাসলে আমি আমার সন্তানদেরকে মানুষ করতে পারবো না। ছেলে তো জানেই না বাবা-মা’র মাঝে কত গ্যাপ। আর মেয়েটা তো জানতেই পারলো আমরা তার বাবা-মা। তাই সবার চোখে ভালো থাকার জন্যই তানভীরকে ভালবাসি। আর এখন যদি তানভীরকে চলে যাই তাহলে ছেলে-মেয়ে দুজনের উপরেই প্রভাব পড়বে। আমি আর কাহিনী করতে চাই না। যেভাবে আছে, সেইভাবেই থাক। সৌরভ ভাইকে সবকিছু বলেছেন? হুম। কিছু বললো? শুধু আফসোস করলো। কি আর করার আছে। জীবন তো আর কারোর জন্যই থেমে নেই,কোন না কোন ভাবে চলে যাচ্ছে। মেয়ের জন্য কি রান্না করা যায় বলতো? ও তো ইলিশ মাছ খেতে ভালোবাসে। তাই কর।
চুমকি, বল না। কি বলবো? আমার কাজটা করে দিবি কিনা না? তোর কোন কাজটা আজ পর্যন্ত আমি করে দিইনি? তুই সেটা আগে বল? ওকে বাবা ওকে আমি বুঝে গেছি। ভেরি গুড। কি কাজ রে? তুই কাল এই চিঠিটা ধীমানকে দিবি। চিঠি! কি লেখেছিস রে? প্রেমপত্র? আ’রে না, কিছু না বলা কথা। আমি দেখতে পারি? না’রে বান্ধুবী। ওকে। আর এটা তোর জন্য। আমার জন্যও চিঠি! হুম । দেখি। এই এখন পড়বি না, বাড়ি গিয়ে পড়বি। ওলে বাবা। ঠিক আছে। চলরে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আবার কবে যে এই ধানসিঁড়ি তীরে ফিরে আসবো, কবে এই নদীর তীরে হাতে হাত ধরে হাটবো, কবে এ পাখিদের কলরবে আমি মুখরিত হবো, আবার কবে আমি ভোরের শিশিরে আমার দুটি পা’কে স্নান করাবো, আবার কবে সকালের সূর্যের রশ্মিকে সারাদিনের জন্য স্বাগতম জানাবো। আমি কিছুই জানি না। জানি না নিয়তি আমার সাথে কোন খেলায় মেতে উঠবে। ললিতা, এভাবে বলিস না প্লিজ। দেখিস আল্লাহ তোর মঙ্গল করবে। হয়তো বা।

ধীমান, কি ব্যাপার চুমকি যে! তা তোমার বান্ধুবীকে দেখছি না যে, কি সমস্যা? ধীমান, শোনো। বলো। চুমকি তোমার কি মন খারাপ? এটা তোমার জন্য। কি? খুলেই দেখো। ডায়রী আর কলম! আমার জন্য। কে দিলো বলো তো? ডায়রীর পেজ ওল্টালে একটা চিঠি পাবে আর ঔ চিঠিতে তোমার কেন এর উত্তর দেওয়া আছে।

প্রিয় বন্ধু,
পত্রের শুরুতে তোমাকে জানাই পৃথিবীর সকল ভালো বন্ধুদের শুভকামনা ও ভালবাসা আর সেই সাথে জানাই রক্তে রাঙা লাল গোলাপের শুভেচ্ছা। জানি তুমি খুব ভালো আছো তারপরেও আমার বলা দরকার, তুমি কেমন আছো? নিশ্চয় তোমার ইশ্বরের কৃপায় আর সকলের আর্শীবাদে খুব ভালো আছো। আর তুমি সব সময় ভালো থাকো, সুস্থ থাকো সেই আর্শীবাদই করি। হয়তো বা ভাবছো আমি কেমন আছি জানতে পারলে তোমার ভালো হতো, তাহলে বলি আমিও ভালো আছি, জানো তো আমি খারাপ থাকি না।
পরসংবাদ : ধীমান, আজকের পর থেকে ললিতা নামের কোন মেয়ের কাছে তোমাকে আর অপমানিত হতে হবে না। হতে হবে না স্যারের কাছে অপমানিত। তোমাকে আজ থেকে আমি আর বিরক্ত করবো না। তোমাকে ছেড়ে, বলতে পারো তোমাদেরকে ছেড়ে আমি চলে গেলাম। জানি না আর ফিরে আসবো কিনা। তবে মনে রেখো সব চলে যাওয়া কিন্তু চলে যাওয়া না। হয়তো তোমাদের সাথে সশরীরে থাকবো না কিন্তু তোমাদের হৃদয়ের গোপন সিন্দুকে আমি গুচ্ছিত থাকবো, বলে আমার বিশ্বাস। আর তোমরা আমার আত্মার আত্মা। ধীমান, তুমি খুব আশ্চর্য হচ্ছো তাই না? যখন জানলাম যে, তোমাকে মানে তোমাদেরকে ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে, তখন আমিও তোমার মতো খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম। হ্যাঁ, আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি। ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করবো। বাড়িতে খুব সমস্যা হচ্ছিলো তাই চলে যেতে বাধ্য হলাম। তা না হলে তোমাকে ছেড়ে ললিতা কোথাও যেতো না। আজ তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি, আজ যদি না বলতে পারি তাহলে আর বলা হবে না। ধীমান, কবে কখন কিভাবে যে তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি আমি নিজেও জানি না। অপরাধ নিয়েও না, ভালবাসার অধিকার সবার আছে। আমি কিন্তু অধিকারের জন্য ভালবাসিনি, তোমাকে খুব ভালবাসি তাই ভালবেসেছি। আমি জানি তুমি আমাকে ভালবাসো না আর বাসবেও না, তাতে কি আমি তো বাসি আর তাতেই আমার হয়ে যাবে। আমি ভালবেসে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি, তোমাকে ভালবাসা দিয়েছি, তুমি আমার চিরকালের মতো গুটিয়ে রাখা ডানা খুলে দিয়েছো, আমাকে উড়তে শিখিয়েছো আর কোন শব্দ আসছে না, তোমাকে খুব ভালবাসি। প্রেমিক হয়ে ভালবাসা গ্রহণ করিও না, বন্ধু হয়ে ভালবাসা নিও।
আর কিছু মাথায় আসছে বন্ধু ভাল থেকো। আর যদি আমার কথা একটি বারের জন্যও মনে পড়ে তাহলে এই ডায়রীতে লিখে রেখো। একটি বার হলেও ভেবো ললিতা নামের আমার একটা বন্ধু ছিলো। তাহলে আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে বন্ধু। সত্যি কথা কি জানো ধীমান, আমি কস্মিনকালেও ভাবিনি যে, তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার এত কষ্ট হবে। বুঝতে পারিনি তুমি আমার এত আপন। সত্যি ভালবাসা বুঝি এমনি হয়, তবে আমার ভালবাসা আমার জীবনে নিরবে এসেছে, নিরবেই থেকে যাবে। তোমাকে আর বিরক্ত করছি না। আমি আর লিখতেও পারছি না, লিখতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ভাল থেকো বন্ধু।

Check Also

আমি মেয়ে…….

পর্ব-৩ সাদিয়া আক্তার    :   এই ললিতা, ললিতা? ললিতা, ধীমান তোকে ডাকছে। কে? ধীমান! বাবা! …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *