Friday , December 14 2018
Home / উপ-সম্পাদকীয় / বল্গাহীন কথাবার্তা বলা হচ্ছে

বল্গাহীন কথাবার্তা বলা হচ্ছে

তৈমূর আলম খন্দকার  :   দীর্ঘদিন যাবৎ মননশীল উন্নয়ন, মানবাধিকার, সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন, মিথ্যার বিরুদ্ধাচারণের বিপরীতে সত্যের জয়লাভ প্রভৃতি সংবাদ দেশের মানুষ শুনতে পায়নি। তবে ইট-বালু-সিমেন্টের অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, সেতু প্রভৃতির উন্নয়নমূলক ফিরিস্তির সংবাদতো সরকারি প্রচার মাধ্যমে তারা লাগাতার শুনে আসছে। প্রশ্ন হলো, গণমানুষের বাঁচার অধিকার, নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা, ব্যক্তির পরিবর্তে আইনের শাসন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের সংবাদ কোথায়? পত্রিকা খুললেই আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ব্রিজের নিচে বা ধান ক্ষেতে পড়ে থাকা লাশ আর লাশ, ঘটনা ঘটে নাই, এমন ঘটনা সাজিয়ে গায়েবি মামলা, নিজ সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা, পরকীয়ার কারণে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী বা স্ত্রী কর্তৃক স্বামী খুনের ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সংবাদেই পত্রিকায় স্থান সংকুলন হয় না, পাশে তো রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ রয়েছেই।
রাষ্ট্রীয়ভাবে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলেও সংবিধানের পাতায় ছাপার অক্ষরে যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়ে গেছে, সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার যতটুকু বেঁচে আছে তা শুধু সরকারি ঘরনার বুদ্ধিজীবীদের মুখে মুখে। আমেরিকা মানবাধিকারকে ধ্বংস করে যেমন মানবাধিকারের জয়গান গায়, ঠিক তেমনি সরকার ও সরকারি ঘরনার মুখে মুখে রয়েছে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের কথা, অথচ ক্ষমতাসীনদের মুখে তো দূরের কথা বকধর্মী বুদ্ধিজীবীদের মুখে ভুলেও রাষ্ট্রীয় বৈরিতার কোন কথা উল্লেখিত হয় না। উনবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী উরপবু আইনের শাসনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো। উরপবু বলেছেন যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় (Rule of Law) তিনটি উপাদানের প্রয়োজন। যথা- (১) That there should be no sanction without breach, meaning that nobody should be punished by the state unless they had broken a law, (2) That one law should govern everyone, including both ordinary citizens and state officials & (3) That the rights of the individual were not secured by a written constitution, but by the decisions of judges in ordinary law.
অর্থাৎ (১) আইন ভঙ্গ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্র কর্তৃক কাউকে সাজা দেয়া যাবে না, (২) একই পদ্ধতিতে সাধারণ জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার প্রতি সমভাবে আইন প্রয়োগ হবে ও (৩) ব্যক্তি অর্থাৎ নাগরিকের অধিকার যেখানে সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত হয়নি সেখানে আদালতের রায়ে সে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কিন্তু উক্ত রাষ্ট্র বিজ্ঞানীর সংজ্ঞা মতে, বাংলাদেশে ‘আইনের শাসন’ আজ কোথায়?
অনেক প্রতিকূল ও দুঃসংবাদের পর একটি ছবি ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে সেপ্টেম্বর/২০১৮ দ্বিতীয় সপ্তাহে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভাইসচ্যাঞ্চেলর আহূত সভায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতির কোলাকুলি। সত্যই একটি ব্যতিক্রম দৃশ্য। যেখানে প্রতিপক্ষ সংগঠনের ছাত্রদের খুন করা ছাড়াও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ভোগ-দখলে ছাড় না দেয়ার প্রত্যয়ে নিজেরা দল, উপদলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি করে সেখানে রাজনৈতিক মূল প্রতিপক্ষের সাথে কোলাকুলি দৃশ্য মনে অবশ্যই আশার সঞ্চার করে। হতে পারে এ কোলাকুলি আন্তরিক বা লোক দেখানো, তবুও ধন্যবাদ জানাই এ কারণে যে, ছাত্ররা প্রতিপক্ষ হয়েও নিজেরা একত্রে বসে সমস্যার সমাধানে ক্ষণিকের জন্য হলেও আলোচনা করতে পেরেছে। এর ফলাফল কী হবে তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। সময়ই প্রকাশ করবে এর প্রকৃত রূপ। তরুণ ছাত্রদের এ ঘটনার পূর্বে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সড়ক দুর্ঘটনা রোধের আন্দোলনে যে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটালো তাতেও জাতির ভবিষ্যতের বিবেচনায় সিলভার লাইন দেখতে পাই। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ ঐক্যবদ্ধতা নিয়ে হতাশ হয়ে যাই যখন দেখতে পাই যে, শুধুমাত্র ক্ষমতাকে অবৈধভাবে আকড়ে ধরে রাখার জন্য প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য, গায়েবি মামলা দিয়ে, পক্ষান্তরে মিথ্যার ঝুলি কাধে নিয়ে দেশব্যাপী রাষ্ট্রীয় খরচে ঘুরে ঘুরে মিথ্যা ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বেড়ানো হচ্ছে। এ মিথ্যার শেষ কোথায় জানি না।
কসাই ও চিকিৎসকের ছুরি চালানোর পদ্ধতি এক হতে পারে না। যাত্রামঞ্চের রাজামন্ত্রীর বক্তব্য ও বডি ল্যাংগুয়েজ এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে তাদের বক্তব্য ও বডি ল্যাংগুয়েজ এক হতে পারে না। এখন যা বক্তব্য চলছে তা প্রতিশোধপরায়ন ও উস্কানিমূলক। সরকারি দল অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ তার সাথে রয়েছে পুলিশ, র‌্যাব, ম্যাজিস্ট্রেট, মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেয়ার জন্য কোলকাতামনস্ক বুদ্দিজীবী আরও কত কী? আর বিরোধীদলের কাছে রয়েছে মামলার পাহাড়, যার নেতাকর্মীদের প্রতিদিনের সময় কাটে আদালতের বারান্দায়। সুবিধাভোগী ও সুবিধাসন্ধানী বুদ্দিজীবীদের ভাষায়, এটাই হলো ল্যাভেল প্লেইং ফিল্ড অর্থাৎ খেলার সমতল ভ‚মি(!)। নির্বাচন কমিশন আমলা দ্বারা গঠিত। ক্ষমতাসীনদের প্রতি কীভাবে নতজানু হয়ে থাকতে হবে তা ব্রিটিশ যা শিক্ষা দিয়েছে স্বাধীন দেশে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সে পদ্ধতিতেই চলছে, নতজানু থাকা অর্থাৎ ‘জি, হুজুর, জাহাপনা’ বলতে তারা অজ্ঞান এবং এটাই তারা বেদবাক্য মনে করে, এতে জাতির আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটুক বা না ঘটুক তাতে আমলাদের কিছু আসে যায় না, শুধুমাত্র প্রমোশন ও বিশাল বিত্তের মালিক হওয়ার জন্য সুবিধাজনক পদে একটি পোস্টিং হলেই তার চলে।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব একটি নীতি থাকা বাঞ্চনীয়, নতুবা সে রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাগ্য নির্ভর হয়ে পড়ে দান-দক্ষিণার উপর, নিজস্ব প্রতিভা বা মেধার কোন মূল্যায়ন থাকে না। রাজধর্মের বিচ্যুতি ঘটায় অনেক রাজত্বের অবসান ঘটেছে, যেমনটি ঘটেছিল পাকিস্তানের বেলায়। কেউ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন ক্ষমতাকে ছলে বলে কৌশলে অর্থাৎ রাজধর্মকে বৃদ্ধাগুলি প্রদর্শন করে হলেও নিজ সিংহাসনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু গোটা সমাজ যখন সুবিধাভোগের অন্বেষণে থাকে, প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিরাপদ অবস্থানে রাখতে চায়, অন্যের বা প্রতিবেশীর কষ্টকে নিজের কষ্ট বা দুর্ভোগ মনে করে না তখনই মনে হয় জাতির বিবেকে জং ধরছে।
মানুষের বিবেকে যখন পচন ধরে তখন চক্ষুলজ্জাও উঠে যায়, যার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নির্লজ্জ কথাবার্তা। যারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছেন তারাই নাকি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এ কথা বলা মানে বিরোধী জোট যেন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে না পারে। তফসিল ঘোষণার পূর্বেই সরকার নির্বাচনী প্রচারণায় পুরোদমে নেমে গেছে সরকারি গাড়ি, বাড়ি ও অর্থ ব্যবহার করে। পুলিশ প্রশাসনকেও ব্যবহার করা হচ্ছে অনৈতিকভাবে অথচ এ বিষয়ে নির্বাক রয়েছে নির্বাচন কমিশন।

Check Also

পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে

মোহাম্মদ আবু তাহের  :   সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হলেও মানুষের আচরণ ও অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *