Wednesday , November 21 2018
Home / উপ-সম্পাদকীয় / নদীভাঙনে নিশ্চিহ্ন জনপদ এবং উন্নয়ন ও বন্ধুত্বের ফানুস

নদীভাঙনে নিশ্চিহ্ন জনপদ এবং উন্নয়ন ও বন্ধুত্বের ফানুস

জামালউদ্দিন বারী  :   আমরা অর্থনৈতিক কারণে যতই প্রকৃতির উপর যথেচ্ছ নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করছি প্রকৃতি যেন ততই আমাদের উপর বিরূপ ও নির্মম হয়ে উঠছে। গত বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিকবার প্রলম্বিত বন্যা ও পানিবদ্ধতা শিকার হয়েছিল লাখ লাখ পরিবার। এবার বন্যা ও নদীভাঙ্গন যেন আগের চেয়েও ভয়ালরূপে আবির্ভূত হতে চলেছে। গত এক সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিনে ক্যারোলিনা উপক‚লে হ্যারিকেন ফ্লোরেন্স, ফিলিপাইন উপক‚লে টাইফুন মাংখুতসহ সামুদ্রিক ঘর্ণীঝড় ও জলোচ্ছাসের আঘাতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ঘুর্ণীঝড় ফ্লোরেন্সের আঘাতে ক্যারোলিনাতে কয়েকলাখ মানুষ পানি ও বিদ্যুতের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। এর আগে ঘূর্ণীঝড় ক্যাটেরিনার আঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝড় আঘাত হেনেছিল প্রায় একযুগ আগে, ঘূর্ণীঝড় সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপক‚লের অনেক অঞ্চল এখনো সেই আঘাতের ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ঘর্ণীঝড় সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত শত শত কিলোমিটার উপক‚লীয় বেড়িবাঁধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণবাঁধের অনেক স্থান মেরামত করে এখনো পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। প্রতিবছর দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে জনগণের রাজস্ব থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। শহরের রাস্তার উপর উড়ালসেতু, মেঘনা, যমুনার পর পদ্মার উপর সেতু নির্মিত হচ্ছে। অথচ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, বাস্তু, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের মত বিষয়গুলো সম্পৃক্ত হওয়ার পরও নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যেখানে উন্নত বিশ্বও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ট্রপিক্যাল ঝড়-জলোচ্ছাসের মত দুর্যোগ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মত দেশ সিডর-আইলার মত সামুদ্রিক ঝড়ের ক্ষত দু’য়েক মাস বা বছরে মেরামত করে ফেলবে এমন দাবী অবান্তর। তবে যেখানে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের আকার লক্ষকোটি টাকা, সেখানে একযুগেও ঘূর্ণীঝড় সিডর-আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা যাবেনা, এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে অগ্রাধিকার নির্ধারণে সরকারের সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা স্পষ্ট। গত দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী ভাঙ্গনের কবলে শত শত হেক্টর কৃষিজমি, আবাসিক এলাকা, রাস্তা, বাজার, স্কুল-মাদরাসা, হাসপাতালসত হাজার হাজার বাড়িঘর, স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা সদরের বিশাল অংশ ইতিমধ্যে পদ্মার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে নড়িয়া উপজেলার অস্তিত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মূলধারার মিডিয়ায় নড়িয়ার ভাঙ্গন কবলিত এলাকার দৃশ্যপট এবং বাস্তুহারা, সর্বস্বহারা মানুষের হাহাকার যেন দেশের সব মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবারের জুম্মার জামাতে পদ্মার ভাঙ্গন কবলিত নড়িয়ার মানুষের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ দোয়া মুনাজাত করা হয়েছে। এ সপ্তাহে দেশের প্রায় সবক’টি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং তা অব্যাহত গতিতে বেড়ে চলেছে। নড়িয়া ছাড়াও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পদ্মা-যমুনাসহ উত্তরে আরো বেশ কয়েকটি নদীর ভাঙ্গনে প্রতিদিনই শত শত পরিবার বাস্তুহীন হয়ে পড়ছে। এ যেন এক দুর্ঘলঙ্ঘ যুদ্ধাবস্থা, পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে দোয়া মুনাজাত করা ছাড়া এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের যেন আর কোন পথ নেই। অথচ এই পরিস্থিতির প্রায় পুরোটাই মানব সৃষ্ট। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে ভাটি বাংলার ভাগ্যাহত মানুষ এখন উজানের ভারতীয়দের চানক্যবাদী ভ‚-রাজনীতির নির্মম শিকার।

ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবের সুত্র ধরে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা গত চার দশক ধরে একটি ন্যায়ভিত্তিক পানিচুক্তির পাশাপাশি অববাহিকাভিত্তিক পানি ও নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু দেশের অস্তিত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত এমন একটি প্রকল্পের প্রতি দেশের শাসকশ্রেনী ও রাজনীতিবিদদের যেন তেমন কোন আগ্রহ নেই, পরিকল্পনাও নেই। সত্তুরের দশকে দেশের প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, গণমানুষের নেতা মাওলানা ভাষানী ফারাক্কা লংমার্চের ডাক দিয়ে দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের অস্তিত্বের দাবীতে এমন একটি গণআন্দোলন গড়ে তোলার মত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আগে ও পরে আর কোন রাজনীতিবিদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্ষমতার রাজনীতির ধারক-বাহকরা প্রকাশ্য অপ্রকাশ্যভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদের সাথে আপস করেই যেন ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চায়। এ কারণেই দেশের ইতিহাসে ভারতের সাথে বন্ধুত্ব(!)কে একতরফা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সময়টিতে বাংলাদেশের মানুষ অভিন্ন নদীর পানিতে সবচেয়ে বেশী প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছে। গত এক দশকে দেশের নদনদীগুলো যেন মৌসুমী জলাধারে পরিণত হয়েছে। শুকনো বা খরিপ মওসুমে নদী অববাহিকার কৃষকরা ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি না পেয়ে জমি অনাবাদি রাখতে বাধ্য হয়। আবার বর্ষায় পাহাড়ি বর্ষণ ও হিমালয়ের বরফগলা অতিরিক্ত পানিতে ফারাক্কা ও তিস্তার উজানে সয়লাব হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে কোন পূর্ব সর্তকতা ছাড়াই ফারাক্কা ও গজলডোবা বাঁধের সব ¯øুইসগেট খুলে দিয়ে এ দেশের নদীপাড়ের জনপদ ভাসিয়ে দিয়ে কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলা হয়। যতই দিন যাচ্ছে নদীপাড়ের মানুষের জীবনের এই বৈপরীত্য প্রভাব বেড়েই চলেছে। একসাথে সবগুলো নদীর বাঁধ খুলে দিয়ে ভারত নিজের কোন কোন অঞ্চলের মানুষকে সম্ভাব্য বন্যা থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশকে চরমভাবে বিপদগ্রস্ত করে তুলতে মোটেও কুণ্ঠিত নয়। এর জন্য তাদেরকে কখনো, কারো কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়না। অথচ অভিন্ন বা আন্তর্জাতিক নদীর পানির উপর ভাটির দেশের অধিকার সবচেয়ে বেশী। আন্তর্জাতিক নদীতে একতরফা বাঁধ নির্মান, পানি প্রত্যাহার করে মরুভ’মিতে পরিনত করা এবং যথেচ্ছভাবে বাঁধের গেট খুলে দিয়ে ভাটির দেশের মানুষকে ডুবিয়ে মারার এমন বহুরূপী কীর্তিকলাপ বিশ্বের আর কোন ভ‚-রাজনৈতিক অঞ্চলে ঘটেনা। অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ যেন বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ও নিকৃষ্ট উদাহরণ। একদিকে বন্ধুত্বের প্রগাঢ় সম্পর্কের দাবী, অন্যদিকে পানির ন্যায্য দাবীকে অগ্রাহ্য করে কখনো শুকিয়ে মারা, কখনো ডুবিয়ে মারার নির্মম তৎপরতার পুনরাবৃত্তি চলছেই।
বিংশ শতকে বৈশ্বিক বাণিজ্য, রাজনীতি, ক‚টনীতি, অর্থনীতি তথা বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পেট্টোলিয়াম ও জ্বালানী নিরাপত্তাকে ঘিরে। ইতিমধ্যে পারমানবিক জ্বালানীসহ ও পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানীর নানাবিধ বিকল্প আবিস্কৃত ও ব্যবহৃত হওয়ায় পেট্টোলিয়াম নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ অনেকটাই কমে এসেছে। তবে সুপেয় পানির কোন বিকল্প না থাকায় বিশ্বের মিঠাপানির উৎসগুলো ঘিরে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্যবাদী চিন্তা ও পরিকল্পনা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একোবিংশ শতকের শুরুতেই বিশ্বের অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চলতি শতকের মাঝামাঝিতে বিশ্বের দেশে দেশে পানি নিয়ে দ্বন্দ-সংঘাত চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যদিও পানির সংকট ও পানির দ্বন্দ কোন নতুন বিষয় নয়। গত হাজার বছর ধরেই এই সংকট মোকাবেলা করছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মানুষ। পানি নিয়ে আঞ্চলিক দ্ব›দ্ব প্রকট হয়ে উঠার আগেই দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক বা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হাজার হাজার পানিচুক্তি হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান অবধি বিশ্বের নদনদীর পানিবন্টনের জন্য সাড়ে তিন হাজারের বেশী পানিচুক্তি হয়েছে বলে জানা যায়। দেশে দেশে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দ্বন্দ থাকলেও পানির মত একটি সার্বজনীন ইস্যুকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিনত করার উদাহরণ খুব বেশী নেই। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা অনেক বড় ভ‚মিকা পালন করেছে। ভারত ও পাকিস্তান বরাবরই পরস্পর বৈরীভাবাপন্ন বা শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হলেও ষাটের দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন সিন্ধু নদীর পানিবন্টন চুক্তি হয়েছে। এরপর দুই দেশ অন্তত তিনবার যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হলেও সিন্ধুর পানিচুক্তি নিয়ে কখনো বড় ধরনের ব্যত্যয়ের অভিযোগ শোনা যায়নি। কখনো কখনো ভারতের পক্ষ থেকে সিন্ধুর পানি আটকে দেয়ার হুমকি দেয়া হলেও পাকিস্তানের পাল্টা হুমকি এবং বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরদারি ত্বরিৎ হস্তক্ষেপে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। শক্তি ও সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা এবং শর্তহীন বন্ধুত্বের অলীক সম্পর্ক জাতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অভিন্ন নদীর পানি বন্টনে ভারতের দায়দায়িত্বহীন অনীহা ও স্বেচ্ছাচারের পরও বাংলাদেশের শাসকদের নিরবতা ও শর্তহীন বন্ধুত্বের স্বীকৃতি জাতিকে এক বড় বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নদনদী, আমাদের কৃষিব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বাণিজ্যবৈষম্য, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তার মত বিষয়গুলোর পাশাপাশি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভারতের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের শিকার হয়ে পড়লেও আমাদের শাসকদের নিরবতা জাতিকে প্রতিকারহীন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আগামীতে সুপেয় পানির জন্য বড় ধরনের সংকটে পড়বে এমন আশঙ্কা নিরসনে পক্ষগুলোর মধ্যে চুক্তি ও সমঝোতার প্রয়াসও অব্যাহত আছে। তবে দেশের শত শত নদনদী একসময় শুকিয়ে মরুময় হয়ে পড়া এবং জনপদের কৃষকদের মধ্যে সেচের পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি হওয়া এবং বর্ষায় নদীর দু’কূল ছাপানো প্লাবণ ও প্রলয়ঙ্করী ভাঙ্গনে হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন বাস্তুহীন মানুষের দুর্দশা যেন বাংলাদেশের এসব মানুষকে সিরিয়া লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ কবলিত মানুষের ভাগ্য বরণ করতে হচ্ছে।
বর্তমান শাসকদল গত ১০ বছর ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশ চালাচ্ছে। ভারতের শাসকদল কংগ্রেসের সাথে আওয়ামীলীগের ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতা বর্তমান বিজেপি সরকারের সময়ও অক্ষুন্ন রয়েছে। এখানে বাংলাদেশ সরকার শুধুই দাতার ভ’মিকায়, ভারত গ্রহীতা। গত এক দশকে বাংলাদেশে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়নি। তবে বাংলাদেশ না চাইলেও তুলনামূলক উচ্চ সুদ এবং ভারসাম্যহীন শর্তে তিন দফায় বাংলাদেশকে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চুক্তি হয়েছে। এ সময়ে ভারতের অনুকুলে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য দ্বিগুণের বেশী বেড়েছে। সেই সাথে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে ভারতের বৈদেশিক রেমিটেন্স আয়ের তিন নম্বর দেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের গাছেরটা খাচ্ছে, তলারটাও কুড়াচ্ছে ভারত। এমনকি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় চারাগাছটিও নিজের করে নিতে তৎপর ভারতীয়রা। সর্বশেষ গত সোমবার মন্ত্রী পরিষদ ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমান হচ্ছে, আমদানী-রফতানী বাণিজ্যে বাংলাদেশের বন্দরের সক্ষমতা, অক্ষমতা যা’ই থাক, প্রতিবেশী বড় দেশকে সুবিধা দিয়ে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তথাকথিত বন্ধুত্বের সুবিধা অক্ষুন্ন রাখতে চায় সরকার। এটা এমন সময় ঘটছে, যখন ভারতের বিজেপি সরকার বাংলা ভাষাভাষি মুসলমানদের বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে। এটা বন্ধুত্ব না বৈরীতা? আর আমরা তাদেরকে বন্দরগুলো খুলে দিয়ে বন্ধুত্ব ফলাচ্ছি! গত কিছুদিন আগে ভারতে বন্যার সতর্ক সংকেত পাঠিয়েছিল চীন। পাহাড়ি ঢলের কারণে গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের উজানে তিব্বতের সাংপো নদীতে পানিবৃদ্ধির চাপ ভাটির দেশ ভারতে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। অনেক বছর আগে চীন ইয়ারলং সাংপো পানিবিদ্যুত প্রকল্প গ্রহণ করলেও সাংপো নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে দেয়নি। তবে পানি প্রত্যাহারের প্রকল্প অব্যাহত আছে। এমনকি তিব্বতের এ অঞ্চল থেকে পাইপ দিয়ে পানি নিয়ে হাজার কিলোমিটার দূরের তাকিলা মাকান মরুভ‚মিতে মরুদ্যান করার পরিকল্পনা করছে চীন। বাঁধ দিয়ে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পানি আটকে দিয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে মরুভ‚মি করে ফেলা এবং সময়মত বাঁধের গেট খুলে বাংলাদেশ ভাসিয়ে দেয়ার মত চীন যদি ভারতের অনুরূপ উজানে বড় বাঁধ ও আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প গ্রহণ করে তাহলে ভারতের অবস্থাও এক সময় বাংলাদেশের মত হবে। গত মাসে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বন্যার সময় বে কিছু বন্যার্ত পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার খবর গণমাধ্যমে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। কেরালায় শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষের প্রানহানী ঘটেছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যতে বাধ্য হয়েছে। এখন বাংলাদেশের শরিয়তপুর সিরাজগঞ্জসহ উত্তর-মধ্যাঞ্চলের পদ্মা-যমুনা বিধৌত জেলাগুলোতে যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে তা জনজীবনের জন্য সাধারণ বন্যার চেয়ে অনেক অনেক বেশী বিদ্ধংসী। গতমাসে যমুনার ভাঙ্গনে সিরাজগঞ্জের শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একটি গ্রামে যদি একটি বা দুটি বিদ্যালয় থাকে তাহলে মানুষের ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কত তা সহজেই অনুমেয়। কিছুদিন আগেও নদীর যে অংশে হাটুপানি ছিল আজ ভারতের বাঁধগুলো খুলে দেয়ার পর সে সব নদীর প্রবাহ প্রলয়ঙ্করী হয়ে উঠেছে। শত শত গ্রাম নদীতে বিলীন হওয়ার পর নড়িয়া উপজেলার অস্তিত্বই নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। মাদারিপুর, শরিয়তপুর, সিরাজগঞ্জের আরো বেশকিছু এলাকায় ভয়াবহ ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। ঘরবাড়ি, খেতের ফসল ও জমিজিরাত হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার নি:স্ব হওয়ার বাস্তবতা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির উপর অনেক বড় আঘাত হয়ে দাঁড়াতে পারে। নদীর উপর সেতু নির্মান যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাতে কোন সন্দেহ নাই। তবে নদীতীরের জনপদ এবং ফসলের মাঠ রক্ষা করা সেতু নির্মানের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সরকার নদী ও জনপদ রক্ষার চেয়ে সেতু নির্মানের মাধ্যমে উন্নয়নের মডেল দেখাতে চাইছে। জাতির সামনে এটি এক বড় শুভঙ্করের ফাঁকি। তবে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে যে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তা’ অনেক বড় ইতিবাচক ঘটনা। এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মানের পরিকল্পনা অন্তভর্’ক্ত রয়েছে। ফারাক্কার প্রভাব মোকাবেলায় ষাটের দশকেই গঙ্গা বাঁধ নির্মানের পরিকল্পনা নিয়েছিল তদানিন্তন পাকিস্তান সরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফারাক্কা চালু হলে এই বাঁধের প্রয়োজনীয়তা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও ভারতের প্রচ্ছন্ন বিরোধিতার কারণে তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। যেখানে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তিই সম্ভব হচ্ছেনা, সেখানে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব-দ্বীপ প্রকল্প বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নির্বাচনের আগে সরকার অতিব গুরুত্বপূর্ণ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা জাতির সামনে হাজির করলেও আগামীতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক বাংলাদেশের নদনদী, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অনিবার্য বিপর্যয় থেকে রক্ষার তাগিদেই গঙ্গা ব্যারাজসহ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারত, চীনসহ আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ও অববাহিকাভিত্তিক নদীব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

Check Also

মানবস্বাস্থ্যের উপর পরিবেশ দূষণের প্রভাব

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার  :     পরিবেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মাটি, পানি ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *