Wednesday , November 21 2018
Home / উপ-সম্পাদকীয় / বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আল্লাহতায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আল্লাহতায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক  :   মহররম মাসকে স্বাগতম। আশা করি এই কলামের পাঠকগণ, ১০ মহররমের তাৎপর্য নিয়ে, কারবালার ঘটনার তাৎপর্য নিয়ে অবশ্যই চিন্তা করবেন, লেখালেখি করবেন, আলাপ-আলোচনা করবেন। আমার নিজের অফিসেও সোমবার ১০ সেপ্টেম্বর বাদ মাগরিব, আমরা কয়েকজন বসে এই একই বিষয়ে আলোচনা করেছি। বিদ্যমান পরিবেশ পরিস্থিতিতে, বৃহত্তর আয়োজন হয়নি।
হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে কিছু না কিছু বলা বা লেখা উচিত। তাই কলামের বড় অংশটিতে কিছু ধর্মীয় বক্তব্য থাকবে। কিন্তু বক্তব্যটি আমার মনগড়া নয় বা আমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়; বক্তব্যটি কুরআনে বর্ণিত ঘটনাভিত্তিক। পবিত্র কুরআনের ১৮ নম্বর সূরা ‘সূরা কাহ্ফ’ এর আয়াত ৬০ থেকে ৮২ দ্রষ্টব্য। পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত একটি ঘটনাকে আমি সাধারণ পাঠক সমাজের সামনে উপস্থাপন করছি এবং সাধারণ সামাজিক-সাংসারিক-ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক ধর্মভিত্তিক সর্বআঙ্গিকের বাক্যের সমর্থনে। সেই সর্বআঙ্গিকের বাক্যটি কী? বাক্যটি হলো এই যে, মহান আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন, একজন মানুষ বা সমষ্টিগত মানুষের জন্য মঙ্গলজনক কোন কমিটি বা কোন কর্মটি মঙ্গলজনক নয়। মহান আল্লাহ তায়ালা দয়াপরবশত এই সুনির্দিষ্ট জ্ঞানটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মানুষকে অবশ্যই দান বা প্রদান করতেই পারেন। অতি সাম্প্রতিকালে, রাজনৈতিক কর্মী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নিকট শুভাকাক্সক্ষীগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন থাকে, অনেকটা এরকম ভাষায়: ভাই দেশে কী হতে যাচ্ছে অথবা, ভাই দেশের খবর কী ইত্যাদি। এর উত্তরে একজন মানুষ তথা রাজনৈতিক কর্মী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম কতটুকুই বা বলতে পারবে? কারণ, বাস্তবেই তো কী হবে বা কী হবে না সেটা মানুষ কল্পনা করতে পারে বা পরিকল্পনা করতে পারে কিন্তু হুবহু বা সঠিক উত্তরটি জানেন একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা। তাই এই মৌলিক বাক্যটির মর্মের উপর ভিত্তি করেই আজকের কলাম।
একটি সুপরিচিত তাফসীরগ্রন্থের কথা বলছি। বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তিগণ কর্তৃক তথা বিভিন্ন সময়কালের আলেম, মুফতি তথা মোফাসসেরগণ কর্তৃক কৃত, পবিত্র কুরআনের অনেকগুলো তাফসির ঘাঁটার সুযোগ বা অবকাশ আমার নিকট আছে; এর জন্য মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। তবে তফসিরে বর্ণিত কথাগুলো বা তফসিরের ভাষ্য বোঝার জন্য আমার মেধা সবসময় যথেষ্ট নয়। সবগুলো তাফসিরই অতি সহজ নয়। সহজেই বোধগম্য অন্যতম তাফসিরের নাম হলো ‘তাফসির মাআরেফুল কুরআন’। এই তাফসিরটির সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে বাংলা করেছেন (বর্তমানে মরহুম) বিখ্যাত ইসলামী পন্ডিত ও অত্যন্ত সুপরিচিত মাসিক মদীনা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। এ প্রসঙ্গে একটু প্রেক্ষাপট নিচের অনুচ্ছেদে উল্লেখ করছি।
সুপরিচিত তাফসির গ্রন্থটির প্রেক্ষাপট হলো, আজ থেকে ৩৯ বছর আগে যখন হিজরি চতুর্দশ শতাব্দী শুরু হয়েছিল। শুরু হওয়ার দু’চার বছর আগেই, তৎকালীন সৌদি আরবের শাসনকর্তা, বাদশাহ ফাহদ ইবনে আব্দুল আজিজ, সৌদি আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশের জ্ঞানী-গুণিদের পরামর্শে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। প্রকল্পটি ছিল দুনিয়ার সকল ভাষাষির জনগোষ্ঠীর নিকট পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ কপি ও তৎসহ তাঁদের নিজস্ব ভাষায় পবিত্র কুরআনের সঠিক অনুবাদ সহজলভ্য করা। প্রকল্পটি দুঃসাহসী ছিলো এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে, পবিত্র মদীনা নগরীতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স’। সৌদি সরকারকে সহায়তা করেছিল অন্যতম বিশ্ব মুসলিম সংস্থা যার নাম ছিল ‘রাবেতাতুল আলম আল-ইসলামী’। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম অঞ্চলের অধিবাসী মুসলিম জনসংখ্যা কোনো অবস্থাতেই পনেরো কোটির কম ছিল না, এখন থেকে ৪০ বছর আগে। বাংলাভাষী এ বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সহজবোধ্য সংক্ষিপ্ত তাফসিরগ্রন্থ প্রকাশ করার লক্ষ্যে বাদশাহ ফাহদ কোরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স ও রাবেতার কেন্দ্রীয় উপদেষ্টাগণ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রাহ.) রচিত এবং বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা মাওলানা মুহিউদ্দীন খান কর্তৃক অনূদিত ‘তফসীরে মাআরেফুল কোরআন’ গ্রন্থটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। রাবেতার অঙ্গসংস্থা ‘এদারাতুল-কোরআন’ আট খন্ডে সমাপ্ত বিরাট তফসির গ্রন্থটি সংক্ষিপ্তকরণ ও সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করে উক্ত তফসিরের বাংলা অনুবাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের উপর। তিনি অনেক পরিশ্রম করে তফসিরখানা সংক্ষেপিত করে বাংলা ভাষাভাষী সর্বস্তরের পাঠকগণের জন্য সহজবোধ্য করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক এ মহতি উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে যোগ্য প্রতিফল দান করুন। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান কর্তৃক কৃত ও সংক্ষিপ্ত এক খন্ডের তফসির গ্রন্থটি ১৪৯৪ পৃষ্ঠার; অত্যন্ত উন্নতমানের ছাপা, অত্যন্ত উন্নতমানের মুদ্রণ, অত্যন্ত উন্নতমানের কাগজ এবং অত্যন্তমানের বাঁধাই। সেই সংক্ষিপ্ত বাংলায় অনূদিত তফসিরে মাআরেফুল কোরআন-এর ৮১১ থেকে ৮১৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। নিচের অনুচ্ছেদগুলোতে আমি যা লিখলাম তার বৃহদাংশই সেখান থেকে হুবহু উদ্ধৃত, শুধুমাত্র দু’চারটা শব্দ যোগ-বিয়োগ হয়েছে। সেখান থেকেই হুবহু উদ্ধৃত করছি।
খিজির (আ.) ও মুসা (আ.) এর সাক্ষাতের প্রেক্ষাপট ছিল। পুরো ঘটনাটি হযরত উবাই ইবনে কা’বের রেওয়ায়েতে বর্ণিত। বর্ণনা মোতাবেক: রাসুলুল্লাহ (সা.), মুসা (আ.) এবং খিজির (আ.) এর মধ্যকার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঘটনাটি নিম্নরূপ। একদিন হযরত মুসা (আ.) বনী-ঈসরাইলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি মুসা (আ.)কে প্রশ্ন করলেন: সব মানুষের মধ্যে অধিক জ্ঞানী কে? হযরত মুসা (আ.)-এর জানামতে তাঁর চাইতে অধিক জ্ঞানী ওই সময়কালে আর কেউ ছিলেন না। তাই প্রশ্নকারীর উত্তরে মুসা (আ.) বললেন: আমি সবার চাইতে অধিক জ্ঞানী। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর নৈকট্যশীল বান্দাহদেরকে বিশেষভাবে গড়ে তোলেন; তাই মুসা (আ.)এর জবাব তিনি পছন্দ করলেন না। এখানে বিষয়টি আল্লহ তায়ালার উপর ছেড়ে দেওয়াটাই ছিল উত্তম আদব। অর্থাৎ, এ কথা বলে দেওয়া উচিত ছিল যে, আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন, কে অধিক জ্ঞানী। মুসা (আ.) উত্তর দেওয়ার পরপরই, ওই উত্তরের কারণে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসা (আ.) এর প্রতি অহি নাযিল হলো যে, দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে অবস্থানকারী আমার এক বান্দাহ আপনার চাইতে অধিক জ্ঞানী। এ কথা শুনে মুসা (আ.), আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানালেন যে, তিনি অধিক জ্ঞানী হলে তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান লাভের জন্য আমার সফর করা উচিত। তাই বললেন, ইয়া আল্লাহ, আমাকে তাঁর ঠিকানা বলে দিন। আল্লাহ তায়ালা বললেন, থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে নিন এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলের দিকে সফর করুন। যেখানে পৌঁছার পর মাছটি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে, সেখানেই আমার এই বান্দার সাক্ষাৎ পাবেন। এখানে আমি কলাম লেখক, স্থান বাঁচানোর জন্য, কিছু ঘটনা বাদ দিয়ে ওই ধাপে চলে গেলাম যেই ধাপে ওই জ্ঞানী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়ে গেল। যেই জ্ঞানী ব্যক্তির সঙ্গে মুসা (আ.)-এর সাক্ষাৎ হলো তিনি ছিলেন খিযির (আ.)।
সাক্ষাৎ হওয়ার পর তিনটি ঘটনা ঘটে। যথাবিহিত সালাম বিনিময়ের পর মুসা (আ.) বললেন, আমি আপনার কাছ থেকে ওই বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে এসেছি যা আল্লাহ তায়ালা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত খিজির (আ.) বললেন, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না হে মুসা, আমাকে আল্লাহ তায়ালা এমন এক জ্ঞান দান করেছেন যা আপনার কাছে নেই; পক্ষান্তরে আপনাকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা আমি জানি না। মুসা (আ.) বললেন ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আমি কোনো কাজে আপনার বিরোধিতা করবো না। হযরত খিজির (আ.) বললেন, যদি আপনি আমার সাথে থাকতেই চান, তবে কোনো বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজে তার স্বরূপ বলে দেই। অতঃপর ঘটে গেল তিনটি ঘটনা। প্রথম ঘটনা। মুসা (আ.) এবং খিজির (আ.) সমুদ্রের পাড় ধরে চলতে লাগলেন। ঘটনাক্রমে একটি নৌকা এসে তাঁরা নৌকায় আরোহনের ব্যাপারে কথাবার্তা বললেন। নৌকার মাঝিরা হযরত খিজির (আ.)কে চিনে ফেললো এবং কোনোরকম পারিশ্রমিক ছাড়াই তাঁদেরকে নৌকায় তুলে নিলো। নৌকায় চড়েই খিজির (আ.) কুড়ালের সাহায্যে নৌকার একটি তক্তা তুলে ফেললেন। এই কর্ম দেখে, হযরত মুসা (আ.) অস্থির হলেন এবং প্রশ্ন করলেন: তারা কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিয়েছে। আপনি কি এরই প্রতিদানে তাদের নৌকা ভেঙে দিলেন যাতে সবাই ডুবে যায়? আপনি তো একটি অতি মন্দ কাজ করলেন! উত্তরে খিজির (আ.) বললেন, আমি পূর্বেই বলেছিলাম আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। তখন মুসা (আ.) পেশ করলেন: আমি আমার ওয়াদার কথা ভুলে গিয়েছিলাম; আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না। অতঃপর উভয়ে নৌকা থেকে নেমে সমুদ্রের কূল ধরে চলতে লাগলেন। দ্বিতীয় ঘটনা। হঠাৎ খিজির (আ.) একটি বালককে অন্যান্য বালকের সঙ্গে খেলা করতে দেখলেন। খিজির (আ.) স্বহস্তে বালকটির মস্তক তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন তথা বালকটি নিহত হলো। এই কর্ম দেখে হযরত মুসা (আ.) অস্থির হলেন এবং প্রশ্ন করলেন, আপনি একটি নিষ্পাপ প্রাণকে বিনা অপরাধে হত্যা করেছেন। এটা একটা বিরাট গোনাহের কাজ করলেন। খিজির (আ.) বললেন, আমি তো পূর্বেই বলেছিলাম আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। মুসা (আ.) দেখলেন বা অনুধাবন করলেন যে, এই ব্যাপারটি পূর্বাপেক্ষা গুরুতর। তাই মুসা (আ.) বললেন: এরপর যদি কোনো প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমাকে পৃথক করে দেবেন। আমার ওযর-আপত্তি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অতঃপর উভয়েই আবার চলতে লাগলেন। তৃতীয় ঘটনা। এক গ্রামের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা গ্রামবাসীদের কাছে খাবার চাইলেন। গ্রামবাসী সোজাসুজি অস্বীকার করে দিলো। হযরত খিজির (আ.) এই গ্রামে একটি প্রাচীরকে পতন্মুখ (অর্থাৎ একটি দেওয়াল প্রায় পড়ে যাচ্ছে পড়ে যাচ্ছে অবস্থা) দেখতে পেলেন। তিনি নিজ হাতে প্রাচীরটিকে সোজা করে দিলেন। মুসা (আ.) বিস্মিত হয়ে বললেন, আমরা তাদের কাছে খাবার চাইলে তারা দিতে অস্বীকার করলো অথচ আপনি তাদের এতবড় কাজ করে দিলেন; ইচ্ছা করলে এর পারিশ্রমিক তাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারতেন। খিজির (আ.), মুসা (আ.)কে লক্ষ করে বললেন এখন শর্ত পূর্ণ হয়ে গেছে; এটাই আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময়।
তিনটি ঘটনারই ব্যাখ্যা ছিল। এরপর খিজির (আ.) উপরে উল্লিখিত তিনটি ঘটনার প্রেক্ষাপট বা কারণ বা তাৎপর্য মুসা (আ.) এর নিকট বর্ণনা করলেন, যদিও সেগুলো এখানে আলোচনায় আনছি না; কলামকে সংক্ষিপ্ত রাখার জন্য। খিজির (আ.) উপসংহার টানলেন এই বলে যে, এই হচ্ছে সেইসব ঘটনার স্বরূপ যেগুলো দেখে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ঘটনার বর্ণনা করে বলেন, হযরত মুসা (আ.) এর প্রথম আপত্তি ভুলক্রমে, দ্বিতীয় আপত্তি শর্ত হিসেবে এবং তৃতীয় আপত্তি ইচ্ছাক্রমে হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্ণনা অব্যাহত রেখে বলেছিলেন, প্রথম ঘটনার পর উভয়ে যখন নৌকায় ছিলেন এবং নিজেদের মধ্যে আলাপ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তখন একটি পাখি এসে নৌকার এক প্রান্তে বসেছিল এবং সমুদ্র থেকে ঠোঁট দিয়ে এক চষ্ণু (তথা এক চুমুক) পানি তুলে নিয়েছিল। ওইটা দেখে খিজির (আ.) মুসা (আ.)কে বলেছিলেন: আমি খিজিরের জ্ঞান এবং আপনি মুসার জ্ঞান উভয়ে মিলে আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের মোকাবিলায় এমন তুলনায় হয় না, যেমনটি এই পাখির চষ্ণুর পানির সাথে রয়েছে সমুদেওর পানির। এই কলামের লেখক (ইবরাহিম) অন্যত্র থকে ব্যাখ্যা ধার করে এখানে উপস্থাপন করছেন। সমুদ্রের পানি থেকে এক চুমুক পানি পাখিটি ঠোঁটে নিল; সমুদ্রে যত পানি তার তুলনায় বা অনুপাতে এক চুমুক পানির অবস্থান নির্ণয় করা যেমন মানুষের জন্য অসম্ভব, তেমনই মহান আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের সাথে, মানুষের জ্ঞান উদাহরণস্বরূপ খিজির (আ.) ও মুসা (আ.) এর সম্মিলিত জ্ঞানের আনুপাতিক সম্পর্কও ওই এক চষ্ণু পানির মতো।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভবিষ্যৎ ও আমার প্রার্থনা হলো, রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, রাজনৈতিক কর্মীগণ চেষ্টা করতে থাকবেন, পরিকল্পনা করতে থাকবেন, কর্মসূচি প্রণয়ন করতে থাকবেন। বর্তমানে ক্ষমতায় যারা আছেন তাদের লক্ষ্য আরও এক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা; এবং এই চাওয়ার স্বপক্ষে তারা যুক্তি উপস্থাপন করেই যাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট ব্যতীত অন্য সকল দল, যারা রাজপথের বিরোধী দল, তারা চান বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা পরিবর্তন হোক এবং এই চাওয়ার স্বপক্ষে এই বিরোধী শিবিরেরও যুক্তি আছে। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অনুকূলে যুক্তি উপস্থাপন করেই যাচ্ছেন; বিরোধী শিবিরও যুক্তি উপস্থাপন করেই যাচ্ছেন। উভয় শিবিরের মতে তথা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শিবিরের মতে (আমার ব্যক্তিগত মত এই কলামে উপস্থাপন করছি না) ক্ষমতায় থেকে যাওয়া বা ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়া, বাংলাদেশের মঙ্গলের জন্যই প্রয়োজন। জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, দুনিয়াবি নিয়মে, আমরা যার যার চাহিদা উপস্থাপন করবো এবং নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবো; সরকারি ক্ষমতাসীন শিবির বা জনগণের বক্তব্য উপস্থাপনকারী রাজপথের বিরোধী শিবির। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কী ঘটনা কী অবস্থা বা কী অবস্থান বরাদ্দ করে রেখেছেন, সেটা আমরা জানি না। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগের বেশি, মুসলিম উম্মাহর অংশ। বাংলাদেশের মানুষ, দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক সমাজের অংশ। অতএব বাংলাদেশের মানুষের ভালোমন্দ, সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার এবং বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর সম্পর্ক থাকতেই পারে। অতএব দুনিয়াবি সকল চেষ্টার পাশাপাশি, আন্দোলনের পাশাপাশি, রাজনৈতিক সকল চেষ্টার অতিরিক্ত, আমরা মহান আল্লাহর নিকটও প্রার্থনা করতেই থাকবো, বাংলাদেশের কল্যাণ বা মঙ্গলের জন্য, বাংলাদেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য, জুলুম ও বৈষম্যবিহীন সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার জন্য। বাংলাদেশের মানুষের জন্য, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির জন্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জন্য, বাংলাদেশ শাসনকারী ক্ষমতাসীন স¤প্রদায়ের জন্য, বাংলাদেশের মজলুম জনতার জন্য, যেটা ভালো বা যেটাই মঙ্গলজনক, যেটাই কল্যাণকর, সেটাই যেন আল্লাহ তায়লা দান করেন; এটাই আমাদের প্রার্থনা। মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত সকল জ্ঞানের মালিক। এইরূপ উদাহরণ যেহেতু আছে যে, অতীতে তিনি বিশেষ বিশেষ বান্দাহকে বিশেষ জ্ঞান দিয়েছেন, সেহেতু আমরা উৎসাহিতবোধ করতেই পারি যে, তিনি বর্তমানেও তাঁর কোনো না কোনো প্রিয় বান্দাহকে এইরূপ বিশেষ জ্ঞান দিতেও পারেন; অবশ্যই আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে তথা গোপনে তথা আমাদের অগোচরে তথা অপ্রকাশিতভাবে এবং ওইরূপ প্রিয় বান্দাহ বাংলাদেশের মানুষকে যেন সঠিক পথনির্দেশনা দিতে পারেন, তার সুযোগ-অবকাশ-পরিবেশ আমরা মহান আল্লাহর নিকট থেকেই কামনা করছি। আর কোনো নবী আসবেন না; কিন্তু নবীগণের আত্মিক বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানভিত্তিক উত্তরসূরী মুসলিম উম্মাহর মাঝে বা সমাজে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন এটাই বাস্তবতা। সৎকর্মশীল বা সালেহীন বান্দাহগণ আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন এটাই বাস্তবতা। আমি কোনোমতেই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবো না কোনোকিছু, কিন্তু কোনো একজন বিপদগ্রস্ত বান্দাহ তথা কোনো একটি বিপদগ্রস্ত বান্দাহর সমষ্টি, মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করতেই পারেন; আমরা সেই সাহায্য কামনা করছি।

Check Also

মানবস্বাস্থ্যের উপর পরিবেশ দূষণের প্রভাব

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার  :     পরিবেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মাটি, পানি ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *