Home / উপ-সম্পাদকীয় / কয়লা উধাও : দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে

কয়লা উধাও : দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে

সম্পাদকীয়  :  বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কোল ইয়ার্ড থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে গেছে। এর বাজার মূল্য ২২৭ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ কয়লা কিভাবে বেহদিস হয়ে গেলো, কেউ বলতে পারেনা। বিস্ময়কর ব্যাপার, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষকে যথাসময়ে জানায়নি, এমনকি কেমন করে কয়লা লাপাত্তা হয়ে গেলো সে সম্পর্কে কোনো তদন্ত বা অনুসন্ধানও করেনি। জানা গেছে, জ্বালানি বিভাগ ইতোমধ্যে কোম্পানীর এমডিসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। এমডি হাবিব উদ্দিন আহমেদ ও কোম্পানীর সচিব আবুল কাশেম প্রধানকে বদলি করা হয়েছে। মহাব্যবস্থাপক (মাইনিং) আবু তাহের মোহাম্মদ নূরুজ্জামান ও উপমহাব্যবস্থাপক (ষ্টোর) এ কে এম খাদেমুল ইসলামকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো: কামরুজ্জামানকে আহবায়ক করে তিন সদদ্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সৎ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের শীর্ষ পর্যায়ে পদায়ন বা অধিষ্ঠিত না করলে কি হয় বা হতে পারে, কোল ইয়ার্ড থেকে কয়লা বেখবর হয়ে যাওয়ার ঘটনা এর একটি জলন্ত প্রমাণ। কোম্পানীর শীর্ষ দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি। কোম্পানীর কাজকর্মে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বিভিন্ন পর্যায়ে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেননি। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, তারা উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকৃতই কি ঘটেছে তা উদঘাটনের পদক্ষেপ না নিয়ে বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করেছেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
একথা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লার ওপর নির্ভর করে সেখানে কয়লাভিত্তিক একমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনিটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে একটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৫ মেগাওয়াট। বাকী দুটি ইউনিটের প্রত্যেকের উৎপাদন ক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট করে। এই তিনটি ইউনিটের ক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে রাখতে প্রতিদিন কয়লার প্রয়োজন চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন। এ হিসাবে দেড় থেকে দু’লাখ টন কয়লা এক মাসের জন্য মজুদ রাখার নিয়ম। কোল ইয়ার্ড থেকে বর্ণিত পরিমাণ কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক জ্বালানিসংকটে পড়েছে। ওদিকে গত মে মাসে ১২১০-ডি নম্বর কূপে কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেছে মজুদ শেষে হয়ে যাওয়ায়। চলতি মাসে ১৩১২ নম্বর কূপ থেকে কয়লা উত্তোলনের কথা থাকলেও খনি শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও অন্যান্য কারণে তা সম্ভবপর হচ্ছে না। আগামী আরো কয়েক মাস এ জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চালু আছে কেবল ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষম ইউনিউটটি। এই ইউনিটটিতেও সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কয়লার সরবরাহ কম থাকায় বড়জোর অর্ধেক উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এখন কয়লার যে মজুদ আছে তাতে আর কয়েকদিন মাত্র চলতে পারে। এরপর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সম্পূর্ণই বন্ধ হয়ে যাবে। কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সচল রাখাও এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। সময় এখানে বড় ফ্যাক্টর, অর্থের বিষয়টি তো আছেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে। এমনিতেই উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতিরা সঙ্গে আরো কয়েকশ মেগাওয়াটের ঘাটতি যুক্ত হচ্ছে। ফলে ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এই শ্রাবণেও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় দেখা দিয়েছে খরা। ফলে ভোগান্তি যে চরমে উঠবে, তা না বললেও চলে। এখনই কৃষকরা শংকিত হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সংকটে। বিদ্যুৎ না পেলে সেচসংকট দেখা দেবে এবং তাতে উৎপাদন ব্যাহত হবে। এটা উল্লেখের অপেক্ষা রাখেনা, অন্যান্য এলাকা থেকে বিদ্যুৎ এনে সংকটের সুরাহা হবে, তেমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। কারণ, সব এলাকাতেই কমবেশি বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে।
আমরা এখানে একটা মেইন প্রতিক্রিয়া দেখছি। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির চালু কূপটির মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় উত্তোলন বন্ধ হওয়া এবং কয়লা ইয়ার্ড থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার পরিণতিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলে সৃষ্ট বিদ্যুৎ সংকট জনজীবন ও কৃষি উৎপাদনে বৈরি প্রভাব সৃষ্টির বাস্তবতা তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি অনাঙ্খিত ও দুর্ভাগ্যজনক। এ জন্য বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডই দায়ী। এর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা, অপরিনামদশির্তা, অযোগ্যতা ও দুর্নীতিই আসল কারণ। বিধান আছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা সরবরাহের পর বাড়তি কয়লা ইটভাটা, চা বাগান বা অন্য ব্যবহারকারীদের কাছে বেশি দামে বিক্রী করা যাবে। অভিযোগ আছে, উধাও হয়ে পাওয়া কয়লা বেশি দামে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। কোথায় কত টাকায় বিক্রী করা হয়েছে এবং সেই টাকা কোথায় কোথায় গেছে, সে প্রশ্ন সঙ্গতকারণেই ওঠে। এর জবাব কোম্পানীর শীর্ষ কর্মকর্তাদেরই দিতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, গঠিত তদন্ত কমিটি অনুপংখভাবে ঘটনাটির তদন্ত করবে। আমরা প্রকৃত তদন্ত দেখতে চাই, দায়সারা তদন্ত নয়। এই তদন্তে ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুন এবং তারা যত বড় পদাধিকারীই হোন, তাদের শনাক্ত করতে হবে। তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এই সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে খনি এলাকার নিরাপত্তা আরও জোরদার করার ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ১৩১২ নম্বর কূপ থেকে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া দ্রুতায়িত করতে হবে।

Check Also

রাজধানীর যানজটে ক্ষতি ও ভোগান্তি

সৈয়দ ইবনে রহমত  :    ঢাকার কোন রাস্তায় যানজট বেশি, এটা জানতে চাইলে এ শহরের বাসিন্দাদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *