Home / সাহিত্য / ভালবাসার আরেক নাম…..

ভালবাসার আরেক নাম…..

(১৪ পর্ব)
সাদিয়া আক্তার   :   দুঃখিত কাঙ্খিত নাম্বারটিতে এই মুহুর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্মৃতিকণাগুলো বিষাক্ত কীটের মতো হৃদয়কে এভাবে দংশন করছে কেন, বাবা? কেন তোমার হাসিমাখা মুখটি বারবার মনের আয়নায় রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠার পর ধীরে ধীরে শ্রাবণধারায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে? কোথায় হারিয়ে গেলে বাবা, কোথায় কোন সুদূর অচেনা দ্বীপে? তোমার দরাজ কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে দূরদিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে? তুমি না-ফেরার দেশে চলে গেলে? মিনু আপু, কি করেন? কে, ও অবন্তী! আসো। কি আর করবো বসে আছি। না! ছাদে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, মন খারাপ? একা কই, আমার বাবা আছে তো। বাবা! কেন ঔ আকাশে আমার বাবাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার সাথেই আমি চোখে চোখে কথা বলছি। বাবা, তো আমার চোখের ভাষা খুব বোঝে। জানো, ছোটবেলায় আমার মা যখন আমাকে বকা দিতো, তখন আমি মন খারাপ করে বসে থাকতাম। বাবাকে কিন্তু বলতাম না, তবুও বাবা জেনে যেতো আর বলতো আমার মা’মনির মনটা আজ খুব খারাপ। আমি বলতাম তুমি জানলে কি করে? বাবা বলতো তোমার চোখ দেখে। আমার চোখে বুঝি লেখা আছে? বলতো মানুষের কান-মুখ-মন মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু চোখ কখনও মিথ্যা বলতে পারে না। তেমনি তোমার চোখও বলে দিচ্ছে যে, তোমার মনটা খুব খারাপ।
জানো অবন্তী, এখন মনে হয় যে, এই পৃথিবীতে যার বাবা নেই , তার এই পৃথিবীতে কেউ নেই। আঙ্কেলের কথা খুব মনে পড়ছে? বাবা’র নাম্বারে ডায়াল করছিলাম। ডায়াল করছিলেন, কেন? তিনি না….. হুম, জানি বাবা ফোন ধরবে না। আর এও জানি তার নাম্বারে কল দিয়েও কোন লাভ নেই। বাবা’র সিমকার্ডটা আমার কাছে। তা’হলে? অভ্যাস! অনেক দিনের অভ্যাস তো তাই। জানো, আমি বাবা’র নাম্বারটা ডিলেট করিনি। ডিলেট করিনি কারণ, বাবা’র নামটা যখন দেখি, তখন মনে হয় বাবা আমার কাছে। আমি মাঝে মাঝে কল দিই আর নিজেকে বুঝায় বাবা’র ফোনের চার্জ নেই, তাই বন্ধ দেখাচ্ছে। ‘যে থাকে আঁখি পল্লবে তার সাথে কেন দেখা হবে, নয়নের জলে যার বাস সেতো নয়নে নয়নে, তার সাথে কেন দেখা হবে’। আপু, মানুষ মরণশীল, এই চিরসত্য আজ পর্যন্ত লঙ্ঘিত হয়নি। জীবন যখন থাকবে, তার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুও থাকবে। তবে কিছু কিছু মানুষ আছেন, যারা মৃত্যুকে জয় করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আপনার বাবাও একজন।
আমাদের সবাইকেই একদিন চলে যেতে হবে, শুধু আগে আর পরে। তাই বলে আমার বাবা’কেই কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হল? জানো, আমার যে মা সব সময় কথার ঝুড়ি নিয়ে বসতো তার মুখে আজ কোন কথাই নেই। আজ কতদিন যে মায়ের মুখে হাসি দেখি না, তুমি জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারবো না। মা আমার সব সময় চুপচাপ বসে থাকে, দেখলে মনে হয় যেন, মৃত্যুর প্রহর গুনছে। মা’র জন্য খুব কষ্ট হয়। আমি যদি আলাদিনের দৈত্যকে পেতাম আর তিনি যদি একটি ইচ্ছে পূরণ করার কথা বলতো? আমি আমার মা’র জন্য বাবা’কে ফেরত চাইতাম। আপু, আযান দিবে, চলেন রুমে যাই? চল।
মা-বাবা, তোমরা সবাই যখন এখানে আসো তাহলে আমি তোমাদের সবার সামনে কথাটা বলি? কি কথা, বল? আমি অপূর্বকে বিয়ে করতে পারবো না। কেন অপূর্ব কোন বেয়াদবি করেছে? না, অপূর্ব ছেলে হিসেবে খুব ভালো। তা’হলে? আমি একজনকে ভালবাসি। ভালবাসিস, কাকে, কোথায় থাকে, নাম কি? নাম আবির। চিটাগাংয়ে থাকে এবং আবির ওখানেই চাকরি করে। পড়াশোনা? চিটাগাং ইউনির্ভাসিটি থেকে এ্যকান্টিংয়ে পড়াশোনা করেছে। পরিচয় হলো কিভাবে? কথার মাধ্যমে। কথা! তোর রুমমেট? জ্বি। ওর কি হয়? কিছু হয় না। তাহলে? আবিরের ভাইয়ের সাথে বাসে কথার পরিচয়। ও বুঝেছি আর ওখান থেকে আবিরের উৎপত্তি, রাইট? জ্বি। খুবই ভালো কথা, আরো শুনে ভালো লাগলো যে, মেয়ে আমার প্রেম করছে। তা মা, প্রেম-ভালবাসা এই বয়সে হয়, আমিও আমার বিয়ের আগে অনেক মেয়ের সাথে প্রেম প্রেম খেলা খেলেছি। আর এখন তোমার মা’র সাথে চুটিয়ে সংসার করছি। তুমিও ওসব ভুলে অপূর্বর সাথে সংসার করো। ওকে? তা আমার দ্বারা সম্ভব না। কেন, তোর দ্বারা সম্ভব না? আমি আবিরকে কথা দিয়েছি। কথা দিয়েছিস, মাই ফুট! তোমার ও কথা মানছে কে? মিলাই, তুই রুমে যা।
ঢাকায় মেয়েকে পড়ালে, ভালো কলেজে পড়লে মন-মানসিকতা উন্নত হবে, মেয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। দেখলে তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ কত উজ্জ্বল হয়েছে? মিলাইয়ের মা, তুমি মিলাইকে সাবধান করে দাও, যেন আবিরকে ভুলে যায়। দুলাভাই, আপনি শান্ত হন আমি দেখছি। দেখো, কিন্তু পজেটিভ হয় যেন।
মিলাই, ভিতরে আসবো? আসো। তুই কি সিন্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিস যে, আবিরকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবি না? হ্যাঁ, মামা আর উপায় থাকলে আমি অপূর্বকে বিয়ে করতাম। মা মিলাই শোন, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মানুষ একই সরলরেখায় চলতে পারে না বা চলা সম্ভবও হয় না। জীবন পথে চলতে গেলে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, কখনও সরলরেখায় কখনও বা বক্ররেখায় চলতে হয়। মানুষ এই ভুল গুলো কখনো জেনে-বুঝে করে আবার কখনো মনের অজানতে হয়ে যায়। জীবনে যদি তুমি ভুল না করো তাহলে তুমি নিজেকে চিনবে কি করে? আর মানুষ মাত্রই ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মামা, আমি আবিরকে খুব ভালবাসি। খুব ভালবাসার জন্যই মানুষ অন্য লিঙ্গকে ভালবাসে এমনকি তার নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালবাসে। মামা, আবিরকে ছাড়া অন্য কাউকেই আমার বিয়ে করা সম্ভব না আর আমি আবিরকে কথা দিয়েছি, ওকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।
মিলাই, আমাকে একটা কথা বলতো? কি কথা মামা? বর্ষাকালে কি হয়? কি হয় আবার বৃষ্টি। হুম, বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে, শীতকালে শীত পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই তো? হুম। বৃষ্টির সময়ে যারা সচেতন তারা কিন্তু সবসময় ছাতা নিয়ে বের হয়। তারা জানে পথে যেকোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। আর যারা অসচেতন, তারা ছাতাহীন ভাবে রাস্তায় বের হয়। তাই রাস্তায় বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায়, নোংরা পানিতে পা ডুবে যায়। তারপর তারা বাসায় এসে কি করে? ডেটল মিশ্রিত পানি দিয়ে পা-হাত ধুয়ে ফেলে। তোর বয়সও ঠিক বর্ষাকালের বৃষ্টি আসার মতো। যেকোন সময়ে প্রেমে পড়তে পারিস। আর এই বয়সে প্রেম-ভালবাসার আদান-প্রদান হবে, স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে তোকে খেয়াল রাখতে হবে, তুই কার সাথে নিজেকে জড়াচ্ছিস। মামা, এত কিছু ভেবে কি প্রেম-ভালবাসা করা যায়? তাই যদি না করা যাই, তাহলে সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার কি? তুইও অসচেতনভাবে প্রেমে পড়ে গেছিস। তুমি তাহলে বলতে চাচ্ছো, বাসায় এসে ডেটল দিয়ে পা ধুয়ে ফেলার মতো অপূর্বকে বিয়ে করি? একদম রাইট। মামা, তা হবার না। দেখ মিলাই, তোকে বন্ধুর মতো করে বুঝালাম। শুনলে ভালো না শুনলে অভিভাবকের মতো বিয়ে দিয়ে দিবো। ভেবে দেখ কি করবি।
মামা, গাছের ফুল শুকাবে বলে সুদীর্ঘ স্থায়ী শোলার ফুলের তোড়া বেধে,যারা ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখে, তাদের সঙ্গে আমার মত মেলে না। আমার সমস্ত জীবনে ভালবাসার কেউ নেই, কেউ কখনো থাকবে না, মনে হলে বুক যেন শুকিয়ে ওঠে। ভয় হয়, অন্তরের এ দুবর্লতা হয়তো আমি মরণকাল পর্যন্ত জয় করতে পারবো না। তোকে আরো কিছুক্ষণ সময় দিলাম ভেবে দেখার জন্য। চলি।
আপা, বল? মিলাই কি বললো? ওর মতিগতি আমার ভালো লাগলো না। দুলাভাই, কি করবেন? অপূর্বদের সাথে কথা বলে দেখো তো, কার-পরশু বিয়েতে কোন সমস্যা আছে কি না? কাল-পরশু! বুঝলাম না। মিলাইকে অপূর্বর সাথে কাল অথবা পরশুই বিয়ে দিতে হবে, তা না হলে যেকোন অঘটন ঘটাতে পারে। মিলাইয়ের বাবা, ঔ আবির ছেলের একটু খোঁজ-খবর নিলে হয় না? কি বলছো? সোনার চাঁন জামাই পেয়েছো, এখন আবির-ভাবিরকে নিয়ে ভাবতে হবে না। মেয়ে যদি অশান্তি করে? মেয়ের বাবাও কম অশান্তি করতে জানে না। বেশি কথা বললে মা-মেয়ে দু’জনকেই মেরে পুতে ফেলবো। যাও, আদুরের মেয়েকে বোঝাও। আমি আবিরকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবো। মনে হচ্ছে ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড়িয়ে আছে, আবিরকে বিয়ে না করলে ফাঁসি দেওয়া হবে। দুলাভাই, বিয়াই সাহেবের সাথে কথা বললাম, তাদের কোন সমস্যা নেই। তা’হলে পরশুদিনই সব ব্যবস্থা করি, কি বল? তাই ভালো হবে।
হ্যাঁলো! আবির? হুম, বল কি খবর? তুমি মানুষ? কেন সন্দেহ হচ্ছে? মজা করো না। মজা তো তুমি করছো। এবার বলো কি খবর? আমার কাল বিয়ে। কার বিয়ে? আমার। কিন্তু আমার যতটুকু মনে পড়ে, তোমার সাথে তো আমার ডির্ভোস হয়নি। তাহলে বিয়েটা করছো করি করে, বল দেখি? বাবা-মা জোর করে দিয়ে দিচ্ছে, তোমার কথা বলেছি, শুনছে না। আমি এখন কি করবো? যদি মন চাই চলে আসো, এক কাপড়ে। চলে, মানে পালিয়ে? না না, তুমি জানিও আসতে পারো, তবে জানিয়ে আসলে আসতে দেবে কি? সন্দেহ আছে। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমিও তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। তাহলে উপায়? উপায় আছে। কি? তুমি আজ রাতেই আমার কাছে চলে আসো। কিভাবে? আমি প্লেনের টিকেট কেটে তোমাকে ফোন দিচ্ছি, কখন বের হতে হবে বলছি। আবির, ফোন দিও না, এসএমএস করবে, সবাই তোমার কথা জেনে গেছে। ওকে? ওকে।

আবির, আমার প্লেনে বসতে খুব ভয় লাগছিল আর নিচেই তো আমি তাকাতেই পারিনি। যাক আর একটা অভিজ্ঞতা হয়ে গেলো। হুম। এবার দেখো, জীবন কাকে বলে। মানে! আ’রে কিছু না। আবির, হুট করে চলে তো আসলাম, এখন কি হবে? স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন যে, জীবন থেকে পালিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। জীবনে সমস্যা থাকবেই, পারো তো নিজে সমাধান করো, নয়তো সময়ের হাতে ছেড়ে দাও। যদি সমাধান করতে পারো ভালো, তা না হলে সময়ের হাতে ছেড়ে দাও। আর মিলাই, এখানে আমার একসপ্তাহ লাগবে কাজ শেষ করতে, ততদিন আমরা এখানেই থাকবো। আমার খুব ভয় করছে। এখন ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই, আমরা স্বামী-স্ত্রী। তারপরও বাবা-মা’রা যদি চলে আসে? আসলে আসবে। এত চিন্তা করছো কেন, আমি তো আছি? তুমি আছো বলেই তো, আমি বেঁচে আছি। মিলাই, কিছু খেয়ে নাও। আমি খাবো না। তা বললে কি হয়, আসো, আমি খাইয়ে দিই। আবির, তুমি এত ভালো কেন? খারাপ হতে বলছো, আছো তো দেখবে আমি কত ভালো। অপেক্ষায় আছি। চল, একটু ঘুমিয়ে নেও। আমার ঘুম আসছে না, তুমি ঘুমাও। ঘুম আসছে না? স্বাভাবিক। আসো, আমার বুকে মাথা দিয়ে শোও, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, আরাম লাগবে।

Check Also

অনলাইনে পড়া যাবে বাংলা একাডেমির বই

‘সবার জন্য জ্ঞান’- এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছে বাংলা একাডেমির অনলাইন গ্রন্থাগার। মঙ্গলবার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *