Home / বিশেষ প্রতিবেদন / প্রশ্ন ফাঁসের ‘তাত্ত্বিক নেতা’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক

প্রশ্ন ফাঁসের ‘তাত্ত্বিক নেতা’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক

 ঢাকার ডাক ডেস্ক : ছাত্রজীবন থেকেই প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষায় জালিয়াতিতে জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক আবু জাফর মজুমদার ওরফে রুবেল। তার প্রধান সহযোগী আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও সাবেক উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পুলকেশ দাস ওরফে বাচ্চু। তাদের ডিভাইস দিয়ে সহযোগিতা করতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র কার্জন।

পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে সুকৌশলে প্রশ্ন ফাঁস পরবর্তীতে ‘ওয়ান স্টপ সেলে’ উপস্থিত থেকে প্রশ্নপত্রের সমাধান দিত বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু জাফর মজুমদার। এ কাজ করে কোটি টাকা কামিয়েছেন তিনি।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- সোনালী ব্যাংকের আইটি অফিসার অসিম কুমার দাস, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার মো. সোহেল আকন্দ ও পূবালী ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম ওরফে সুমন, মো. জহিরুল ইসলাম, সাদ্দাতুর রহমান ওরফে সোহান, নাদিমুল ইসলাম, মো. এনামুল হক ওরফে শিশির, শেখ তারিকুজ্জামান, অর্ণব চক্রবর্তী ও আরিফুর রহমান ওরফে শাহিন।

তাদের কাছ থেকে ক্ষুদে ব্যাটারি, ইয়ারফোন, মোবাইল ফোনের ন্যায় কথা বলার সিমযুক্ত মাস্টারকার্ড জব্দ করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য পেতে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড চাওয়া হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিন (শনিবার) তারা বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী পলাতক বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু জাফর মজুমদার রুবেল, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা পুলকেশ ওরফে বাচ্চু এবং ডিভাইস সরবরাহকারী কার্জনকে গ্রেফতারে জোর চেষ্টা চলছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের প্রধান বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক আবু জাফর মজুমদার। পুলকেশ দাস বাচ্চু নামে এক সাবেক উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও কার্জনসহ আরও কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করে আসছিলেন তিনি। কয়েক বছর ধরে প্রশ্ন ফাঁস করে চক্রটি কয়েক কোটি টাকা আয় করেছে।

‘ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের তাত্ত্বিক লিডার আবু জাফর মজুমদার। তিনি তাৎক্ষণিক সংগৃহীত প্রশ্নপত্রের অংক, বিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞানের সমাধান দিতেন। কখনও তিনি প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ওয়ান স্টপ সেন্টারে এসে সমাধান দিতেন। কখনও বা সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার কিংবা মোবাইলফোনের মাধ্যমে সমাধান দিতেন।’

‘মেধাবী হলেও ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষায় জালিয়াতি করে নিজে চাকরি বাগিয়েছেন। শুধু তিনিই নন একইভাবে তারই সহযোগী ও সহপাঠী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের ছাত্র পুলকেস দাসের চাকরিও দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি বাগিয়ে নেন সোনালী ব্যাংকের আইটি অফিসার অসিম কুমার দাস, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার মো. সোহেল আকন্দ ও পূবালী ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম ওরফে সুমন। তাদের এসব কাজে ডিভাইস সরবরাহ করেছেন কার্জন। তিনি দেশত্যাগের চেষ্টায় রয়েছেন বলেও আমাদের কাছে তথ্য আছে। খুব শিগগিরই তারা ধরা পড়বেন’- এমন আশা প্রকাশ করেন মশিউর রহমান।

ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সরকারি চাকরির আড়ালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন আবু জাফর মজুমদার। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন তিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসে তারা এটিএম কার্ড আকৃতির একটি ছোট ‘স্মার্ট ডিভাইস’ ব্যবহার করত, যা সংগ্রহ করেছিলেন কার্জন।

ডিএমপির গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের যুগ্ম-কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক আবু জাফর মজুমদার ওরফে রুবেল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ‘মাস্টার-মাইন্ড’। তার নেতৃত্বে যে চক্রটি গড়ে উঠেছে, তাতে অন্তত ২০ সদস্য রয়েছে।”

‘গত ৭-৮ বছর ধরে এ চক্র প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছে। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে শতাধিক ব্যক্তিকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে এ চক্রের সদস্যরা।’

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ওই প্রশ্নের উত্তরপত্র তৈরি করে পরীক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য চক্রটি ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’ গড়ে তুলেছিল জানিয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের এডিসি গোলাম সাকলাইন বলেন, ‘পান্থপথে এ চক্রের একটি ওয়ান স্টপ সেন্টার রয়েছে। সেখানে বসেই ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের উত্তরপত্র তৈরি করা হতো। এখান থেকে আবার এসব উত্তরপত্র শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সরবরাহ হতো। সব কাজেই হাত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক জাফরের।’

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা প্রশ্ন ফাঁস কিংবা পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কিনা, সে ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। ডিবি পুলিশ আমাদের এ ব্যাপারে এখনও কিছু জানায়নি। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে এবং সত্যতার ভিত্তিতে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।’

Check Also

আসছে রমজান, মজুদদাররা সাবধান

ঢাকার ডাক  ডেস্ক :  রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র মাহে রমজান এখন দোরগোড়ায়। পাপ ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *